তারাপুরে অবৈধ দখল স্থাপনা এখনও বহাল : আদালতের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি

49

বিলেতবাংলা ডেস্ক,২১ অক্টোবর: প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি তারাপুর অবৈধ দখলে নিয়ে স্থাপিত শত শত অবৈধ স্থাপনার একটিও উচ্ছেদ হয়নি। হাঁক ডাক করে দুই দফায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হলেও বিচ্ছিন্ন করা হয়নি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ। উৎখাত হয়নি অবৈধ দখলদাররাও।

মুলহোতা জালিয়াত রাগীব আলী সপরিবারে দেশান্তরী হলেও বহাল তবিয়তেই আছে তার অবৈধ সা¤্রাজ্য। এমনকি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করে আড়ালে নতুন নতুন স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারাপুরের সেবাইত ডা: পংকজ গুপ্ত।

তিনি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন নানা কৌশলে বিলম্বিত করা হচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের দ্বারা ম্যানেজ হয়ে রায় বাস্তবায়নে সময় ক্ষেপন, গড়িমসি করছে স্থানীয় প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, তারাপুরের অবৈধ স্থাপনার বাসিন্দারা উচ্চ আদালতে একটি পিটিশন করেছেন, যাতে তারা উচ্ছেদ না হন। এই পিটিশনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থাপনা উচ্ছেদের কোন উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছেনা।

অপরদিকে, উচ্চ আদালতের দেয়া ৬ মাসের মেয়াদ গত ১৯ জুলাই শেষ হয়েছে। এরপর অবৈধ দখল ও স্থাপনা উচ্ছেদে জেলা প্রশাসনের দেয়া গণবিজ্ঞপ্তির মেয়াদও গত ৩০ জুলাই শেষ হয়েছে। দু’দফার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখন নানামুখি কৌশল আঁটছেন অবৈধ দখলদার ও অবৈধ স্থাপনার বাসিন্দারা।

তারাপুরের সেবাইত পংকজ গুপ্তের আইনজীবি অ্যাডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্য্য বলেন, আমরা উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় আছি। রায়ের মাধ্যমে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ও সুপ্রীম কোর্টের আপিলেট ডিভিশনের যুগান্তকারী রায় বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এর আগে গত ১০ জুলাই চার্জশিট দাখিল হয় রাগীব আলী ও তার পুত্র আবদুল হাইয়ের জাল-জালিয়াতির ব্যাপারে। গত ১৩ অক্টোবর সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্যদিয়ে ওই মামলার বিচার শুরু হয়েছে। ভূমি মন্ত্রনালয়ের স্মারক জালিয়াতির অভিযোগে এই মামলা দায়ের হয়েছিল। এর আগে গত ১০ আগস্ট রাগীব আলীও তার ছেলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে পরদিন ১১ আগস্ট তারা ভারতে পালিয়ে যান। এ অবস্থায় দুই আসামির অনুপস্থিতিতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর মামলার অভিযোগ গঠন হয়।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, দেবতাই তারাপুরের সম্পত্তির মালিক। এ দেবতার সেবা অন্য ধর্মে বিশ্বাসীরা করতে পারেন না। ফলে ৯৯ বছরের লিজ প্রদান অবৈধ। নির্দেশনায় বলা হয়েছে- যেহেতু কথিত লিজ গ্রহীতা ও সেবায়েত বৈধ নন, তাই আগামী ৬ মাসের মধ্যে সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাউজিংসহ সব স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সুবিধাজনক ভালো একটি স্থানে স্থানান্তর করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের কোনো অসুবিধা না হয়। এর প্রয়োজনীয় সব খরচ রিট পিটিশনারদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থেকে নিতে হবে। এজন্য তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে হবে। তারাপুর চা বাগান থেকে মেডিকেল-হাসপাতাল, বাসা-বাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন, হাউজিং উচ্ছেদ করে সেখানে নতুন করে চা গাছ সৃজন করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে পূর্বাবস্থা। এছাড়া দাতা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হিন্দু দেবতা আগের স্থানে স্থাপন করতে হবে, যদি তা সরানো হয়ে থাকে। উচ্চ আদালতের এ রায় রিট পিটিশনার আবদুল হাইয়ের হাতে পৌঁছানের এক মাসের মধ্যে তারাপুর চা বাগান হিন্দু দেবতার প্রকৃত সেবায়েতের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এসব নির্দেশনা অনুযায়ী বাগানের মালিকানা হস্তান্তর ও স্থাপনা সরিয়ে নেয়া না হলে দেবতার সেবায়েত, পুলিশ প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশনকে যৌথভাবে উচ্ছেদ পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উচ্ছেদ সংক্রান্ত সব ব্যয় রিটপিটিশনার আবদুল হাই ও তার পিতা রাগীব আলীর কাছ থেকে আদায়ের জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হিন্দু দেবতার বৈধ সেবায়েতের অনুপস্থিতি থাকলে সিলেট শহরের ১০ জন যাজকের মতামত নিয়ে একজন সেবায়েত নিযুক্ত করার জন্য জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে। এসব নির্দেশনা পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে সিলেটের জেলা প্রশাসককে। রিটকারীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ আদেশ মানতে ব্যর্থ হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, রিটপিটিশনারদের বিরুদ্ধে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ও একই বছরের ২ নভেম্বর দায়েরকৃত জালিয়াতি মামলা দুটি দ্রুততার সঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার জন্য জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত।

উল্লেখ্য, জালিয়াতির মাধ্যমে ৪২২ দশমিক ৯৬ একর জায়গায় গড়ে ওঠা তারাপুর চা-বাগান ১৯৯০ সালে ভুয়া সেবায়েত সাজিয়ে অবৈধ দখলে নেন কথিত দানবীর রাগীব আলী। পরে রাগীব আলী নিজের নামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ ছাড়াও ৩৩৭ টি প্লট তৈরি করে বিক্রি করে দেন। এসব প্লটে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসন ও বিপণী বিতান। গত ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে হাইকোর্টের আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ তারাপুর চা-বাগান দখল করে গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ছয় মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। রায় বাস্তায়নের নির্দেশ দেয়া হয় সিলেটের জেলা প্রশাসনকে।