শেষরক্ষা হলো না সিটিসেলের

47

বিলেতবাংলা ডেস্ক,২১ অক্টোবর: বেসরকারি মুঠোফোন অপারেটর সিটিসেলের কার্যক্রম গতকাল বিকেলে বন্ধ করে​ দিয়েছে বিটিআরসি। এ সময়ে ভবনের সামনে ছিল র‍্যাবের কঠোর নিরাপত্তা। গতকাল সন্ধ্যায় তোলা ছবি l প্রথম আলোঅবশেষে বন্ধ হয়ে গেল দেশের প্রথম মুঠোফোন অপারেটর প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড। ১৯৯৩ সালে যাত্রা শুরু করা এ অপারেটরটি সিটিসেল নামেই বেশি পরিচিত। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৪৭৭ কোটি টাকা বকেয়া সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় অপারেটরটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

রাজধানীর মহাখালীতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সিটিসেলের প্রধান কার্যালয়ে বিটিআরসির একটি প্রতিনিধিদল গিয়ে অপারেটরটির প্রধান সুইচ বা অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। পরে গতকাল সন্ধ্যায় বিটিআরসি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, ‘বিটিআরসির বকেয়া পরিশোধ না করায় টেলিযোগাযোগ আইনের ৫৫(৩) ধারা অনুযায়ী সিটিসেলের তরঙ্গ স্থগিত করা হয়েছে। এই অবস্থা থেকে সিটিসেলের ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ নেই। পরবর্তী পদক্ষেপ হবে অপারেটরটির লাইসেন্স বাতিল।’

সিটিসেলের কাছে বিটিআরসির বকেয়ার পরিমাণ ৪৭৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর মধ্যে টুজি লাইসেন্সের তরঙ্গ বরাদ্দ ও নবায়ন ফি বাবদ পাওনা ২২৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া রাজস্ব ভাগাভাগি বাবদ ২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, বার্ষিক তরঙ্গ ফি ২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, সামাজিক সুরক্ষা তহবিলের ৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা, বার্ষিক লাইসেন্স ফি ১০ কোটি টাকা, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ৩৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা ও বিলম্ব ফি বাবদ ১৩৫ কোটি ৭ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।

সিটিসেল গ্রাহকদের বিকল্প সেবা নিতে এর আগে গত ৩১ জুলাই একটি গণবিজ্ঞপ্তি দেয় বিটিআরসি। এতে বিকল্প সেবা নিতে গ্রাহকদের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। এই সময়সীমা পরে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়। আর লাইসেন্স বাতিলের বিষয়ে গত ১৭ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিটিআরসি।

তবে বিটিআরসির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে গত ২২ আগস্ট হাইকোর্টে আবেদন করে সিটিসেল। সিটিসেলের আবেদন আমলে নিয়ে হাইকোর্ট গত ১৬ সেপ্টেম্বরের আগে অপারেটরটির কার্যক্রম বন্ধ না করতে বিটিআরসিকে আদেশ দেন। পরে হাইকোর্টের এ আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে বিটিআরসি। এ বিষয়ে গত ২৯ আগস্ট আপিল বিভাগের আদেশে বলা হয়, দুই কিস্তিতে সিটিসেলকে বকেয়া ৪৭৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।

আপিল বিভাগের আদেশ অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবরের মধ্যে সিটিসেলকে পরিশোধ করতে হতো ৩১৮ কোটি টাকা। কিন্তু ওই দিন সিটিসেল ১৪৪ কোটি টাকা বিটিআরসিতে জমা দেয়।

এ প্রসঙ্গে তারানা হালিম বলেন, গত বুধবারের মধ্যে সিটিসেলের বকেয়ার দুই-তৃতীয়াংশ ৩১৮ কোটি টাকা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা দিয়েছে মাত্র ১৩০ কোটি টাকা। তারা আদালতের আদেশ ভঙ্গ করেছে।

১৩০ কোটি জমা দেওয়ার পেছনে সিটিসেলের যুক্তি ছিল, লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহারের অনুমোদন থাকলেও তারা সারা দেশে ব্যবহার করতে পারে মাত্র ৬ দশমিক ৩ মেগাহার্টজ। আর শুধু ঢাকা অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ দশমিক ৫২ মেগাহার্টজ।

গ্রাহকদের বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বিকল্প সেবা নিতে গ্রাহকদের দুই দফা সময় দেওয়া হয়েছে। এরপরও যারা অপারেটরটির সঙ্গে আছে তাদের বিষয়ে আসলে তেমন কিছু করার নেই।’

সিটিসেলে বর্তমানে ৫৫ ভাগ শেয়ারের মালিক বিএনপি নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের মালিকানাধীন প্যাসিফিক মোটরস ও ফার ইস্ট টেলিকম। বাকি ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ শেয়ার সিঙ্গাপুরভিত্তিক টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সিংটেলের।

টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার জ্যেষ্ঠ গবেষক আবু সাইদ খান  বলেন, ‘যে কারণে সিটিসেলকে বন্ধ করা হলো, সরকারি মালিকানাধীন টেলিটকও একই অপরাধে অপরাধী। এটি টেলিযোগাযোগ খাতের সুশাসনের পরিচায়ক নয়।