শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদযাপন

305

লন্ডন,২০ ফেব্রুয়ারি: শাহ আবদুল করিম জন্ম শত বর্ষ সিলেটে আলাদা আলাদাভাবে কর্মসূচীগ্রহণ করে দুটি কমিটি উদযাপন করে। একটির আহবায়ক ছিলেন কবি শুভেন্দু ইমাম ও অন্য কমিটির আহবায়ক ছিলেন অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। দুটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের সংবাদ পরিবেশন করা হলো।

‘শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উৎসব’ কমিটি
ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট লেখক ড তপোধীর ভট্টাচার্য বলেছেন, শাহ আবদুল করিমের গান শুনে শুধু মাথা নাড়ালেই চলবে না, গানের অনেক গভীরে প্রবেশ করতে হবে। বাউল সম্রাট তার গানে সমষ্টির কথা বলেছেন। দেশ-কাল তার কথা না ভাবলেও তিনি দেশ-কালের কথা বলে গেছেন।
বাউল সম্রাট ‘শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উৎসব’ উদ্বোধন করে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
সোমবার 15.02.2016 বিকেল পৌণে ৫টায় সিলেটের রিকাবীবাজারে কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদযাপন পর্ষদের উদ্যোগে এবং প্রথম আলোর সহযোগিতায় আয়োজিত এ উৎসবের উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধন শেষে আলোচনা পর্বে সভাপতিত্ব করেন শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক কবি শুভেন্দু ইমাম। আলোচনায় অংশ নেন সিলেট মেট্টোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড মো সালেহ উদ্দিন, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, ভারতের সাহিত্যিক স্বপ্না ভট্টাচার্য, কবি তুষার কর ও করিম-তনয় শাহ নূরজালাল। স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রথম আলোর সিলেট প্রতিনিধি সুমনকুমার দাশ। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন আবৃত্তিকার নাজমা পারভীন।
আলোচনা পর্বের শুরুতে সৃজনশীল পোষাকের দোকান ‘স্লাগান’ এর জন্মশতবর্ষ টি-শার্ট, উৎসব স্মারক ও ষড়ঋতুর তৈরি করিমের গান দিয়ে ‘মা’ শীর্ষক ব্যাগ উন্মোচন করা হয়।
আলোচনার পর ১০০টি মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে প্রয়াত বাউল সম্রাটের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করা হয়।
এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। শুরুতেই ছিল প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের ‘গান ও গল্প’ শীর্ষক এক ঘণ্টার পরিবেশনা। এরপর ছিল শাহ আবদুল করিমের লেখা প্রচলিত ও অপ্রচলিত গান পরিবেশন। এতে বিশিষ্ট শিল্পীরা অংশ নেন।

করিমের গান আমার মায়ের কাছেও পৌঁছেছে: মৌসুমী ভৌমিক

পশ্চিম বাংলার অনেক শিল্পী করিমের গান গাইলেও গানের ভণিতা ব্যবহার করেন না এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুই বাংলার জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক বলেন, ‘অনেক গান লেখককে ছাপিয়ে যায়। যে গান শিল্পীকে ছাপিয়ে যায় সেটাই স্থায়িত্ব পায়। রবী ঠাকুরের গানে তো কোনো ভণিতা নেই। তাই বলে কি রবী ঠাকুরের গান টিকে থাকেনি। আমার মা শাহ আবদুল করিমের আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, এই গানটা জানেন। কিন্তু গানটি কে লিখেছেন তা জানেন না। কিন্তু করিমের গান তো আমার মায়ের কাছেও পৌঁছেছে।’

সোমবার রাতে সিলেট নগরীর কবি নজরুল মিলনায়তনে আয়োজিত শাহ আবদুল করিম জন্মশতবার্ষিকী উৎসবে এসব কথা বলেন তিনি।

সন্ধ্যায় ১০০টি মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে প্রয়াত বাউলের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করা হয়। এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। শুরুতেই ছিল মৌসুমী ভৌমিকের ‘গান ও গল্প’ শীর্ষক এক ঘণ্টার পরিবেশনা।

পরিবেশনার আগে এ শিল্পী বলেন , ‘একটা কথা প্রায় শোনা যায়, শুদ্ধভাবে গান গাওয়া, আর ভুলভাবে গাওয়া। গানের শুদ্ধতা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। কোনটা যে ঠিক শুদ্ধ তা আমি ঠিক বুঝি না। রবিঠাকুরের গানেও কোনটা শুদ্ধতা প্রসঙ্গে নিশ্চিত হওয়া যায় না। বাউল পদকর্তাদের গানের ক্ষেত্রে সেটা আরো অসম্ভব। বাউলরাও একটা গান অনেকভাবে গেয়ে থাকেন। একটা গানের ৪/৫টা ভার্সনও থাকে। গানে বিশুদ্ধতা বলে কিছু নেই’, বলেন মৌসুমি।

তিনি আরও বলেন, ‘কোনভাবে গাওয়াকে আমরা শুদ্ধ বলব? কতেটা সরে গেলে তাকে বিচ্যুত বলব?’ এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে মৌসুমী বলেন, ‘অনেক রকমভাবে মানুষ গান গায়। একেকজন একেকভাবে গায়। তাতে তো অসুবিধার কিছু নেই।’

বক্তব্যের শুরুতেই মৌসুমী বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানে বলার মতো যোগ্য আমি নই। আপনারা আমার থেকে আবদুল করিম সম্পর্কে অনেক ভালো জানেন। আমি পশ্চিম বাংলা থেকে এসেছি। আমার উচ্চারণও ভিন্ন। এখানে আমি কিছু বললে তা আরোপিত শোনাবে। তা ছাড়া পূর্ববাংলা ও পশ্চিম বাংলার মধ্যে একটা দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্কও রয়েছে।’

উৎসবে তিনি প্রায় ৪৫ মিনিট করিমের গান ও সিলেট অঞ্চলের গান নিয়ে কথা বলেন। বক্তৃতার পাশাপাশি গানও শোনান পশ্চিমবাংলার এই বিখ্যাত শিল্পী। যিনি দীর্ঘদিন ধরে সিলেট অঞ্চলের গান নিয়ে গবেষণা করছেন।

গুণী এ শিল্পী বলেন, ‘আমার কোনো দেশ নেই। আমার কোনো ঘর নেই। সিলেটে আসলে এখানকার অনেকের ঘরই আমার নিজের ঘর মনে হয়।’

‘গান শুধু গাওয়া ও শোনা দিয়ে বোঝা যায় না। গান হলো একটা মূহূর্ত। অনেক উপাদানে এটি নির্মিত হয়। গানকে বুঝতে হলে সেই মূহূর্তটাকে বুঝতে হবে।’

করিমের এই গান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরাও অনেক সময় বলি, আগে খুব ভালো ছিলাম। আগেকার দিন অনেক ভালো ছিল। কোন আগেতে আমরা ভালো ছিলাম? আমার তো বিশ্বাস হয় না কোনো একটা আগেতে আমরা বিশেষ ভালো ছিলাম। দেশভাগের আগেও কি আমরা খুব ভালো ছিলাম? তাহলে দেশ ভাগ হলো কেন?’

‘করিম শাহকে বুঝতে হলে তার সময়, তার সমসাময়িক শিল্পী, সাহিত্যিক, কবিদেরও জানতে হবে, বুঝতে হবে। তাদের প্রেক্ষিতে করিম শাহকে চিনতে হবে’, বলেন মৌসুমী ভৌমিক।

অনুষ্ঠানে প্রবীণ লোকসংগীত শিল্পী সুষমা দাশ, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী লোকসংগীত শিল্পী হিমাংশু গোস্বামী, বাউল বশির উদ্দিন সরকার, বাউল সিরাজ উদ্দিন, বাউল বাবুল সরকার, বাউল শাহীনুর আলম সরকার, শিল্পী লাভলী দেব, অংশুমান দত্ত, শামীম আহমদ, মনিরা ইসলাম পাপ্পু, বিজন রায়, সৌরভ সোহেল, ধরনী দাস, লিংকন দাশ, প্রশান্ত কুমার দাস গান পরিবেশন করেন।

এর আগে বেলা ২টায় অডিটোরিয়ামে বাউল করিমের জীবনের বিভিন্ন সময়ে তোলা অর্ধশতাধিক আলোকচিত্র নিয়ে এক আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়। এ ছাড়া দুটি স্টলে বাউল করিমকে নিয়ে রচিত বই এবং আনিসুল হক ও হুমায়ূন আহমদের বই বিক্রির ব্যবস্থা ছিল।

এছাড়া অন্য কমিটি সিলেটে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী উৎসব আয়োজন করে।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বুধবার বিকেলে জেলা স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে শাহ আবদুল করিম জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় পর্ষদের উদ্যোগে ও সিলেট উৎসব কমিটির ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই উৎসব উদ্বোধন হয়।
এর আগে শতশিল্পী কণ্ঠে বাউল সম্রাটের ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ও ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়’-এ দুটি গান দিয়ে অতিথিদের স্বাগত জানানো হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, শাহ আবদুল করিম জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় পর্ষদের আহ্বায়ক গোলাম কুদ্দুছ ও যুগ্ম আহ্বায়ক ঝুনা চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন সিলেট উৎসব কমিটির আহ্বায়ক ড আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও জেলা প্রশাসক মো জয়নাল আবেদীন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিলেট উৎসব কমিটির সদস্য সচিব জামাল উদ্দিন হাসান বান্না।
পরে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রথমদিন স্থানীয় বিশিষ্ট শিল্পীরা বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গান পরিবেশন করেন।
পরের দুদিন গান পরিবেশন করবেন দেশের ও বিদেশের বিশিষ্ট শিল্পীরা। এছাড়া প্রতিদিন নৃত্যনাট্য পরিবেশন এবং তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হবে।

 

মুগ্ধতায় সাঙ্গ হলো করিমের মিলনমেলা
সিলেট জেলা স্টেডিয়াম ভর্তি হাজারো মানুষ। তিল ধারণের ঠাঁই নেই, তবুও সপরিবার-সবান্ধব আসছেন মানুষ। বাউল সম্রাট শাহ্ আবদুল করিমের ভক্ত ও গুণগ্রাহীদের ভালোবাসায় মুগ্ধতায় শেষ হলো বাউল শাহ্ আবদুল করিম জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে সিলেটের উৎসব। ৩দিনব্যাপী উৎসবের শেষদিনে সঙ্গীত পরিবেশন করে মুগ্ধ করে ভারতের প্রখ্যাত লোকগানের দল ‘দোহার’।
দলীয় পরিবেশনায় ‘বসন্ত বাতাসে সইগো, বসন্ত বাতাসে’ এবং ‘আসি বলে গেলো বন্ধু আইলো না’ গানের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় শেষ দিনের পরিবেশনা।
শেষ দিনে বক্তব্য রাখেন ড. রাজীব কর, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ইইউ শহীদুল ইসলাম শাহীন ও তাড়লের চেয়ারম্যান নুরুল হক তালুকদার।
পরে বাউল শাহ্ আবদুল করিমের জীবন ও দর্শনের উপর প্রখ্যাত নির্মাতা শাকুর মজিদ নির্মিত তথ্যচিত্র ‘ভাটির পুরুষ প্রদর্শিত হয়।
শেষ দিনে বাউল শাহ্ আবদুল করিমের সঙ্গীত পরিবেশন করেন-সিলেটের প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী জামাল উদ্দিন হাসান বান্না, বাউল কালা মিয়া, বাউল সূর্যলাল, মিতালী চক্রবর্তী, অরুণ কান্তি তালুকদার, মীনাক্ষী দেব, তন্বী দেব, কাকলী দত্ত মুন্নী, আবুল কালাম আজাদ, তানজীদা হক তালুকদার। এছাড়াও,দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমী এবং নৃত্য পরিবেশন করে একাডেমী অব মনিপুরী কালচার এন্ড আর্টস।
তবে শেষ দিনের আকর্ষণ ভারতের কলকাতার প্রখ্যাত লোকগানের দল ‘দোহার’ মঞ্চে ওঠে রাত সাড়ে আটটায়। উপস্থিত হাজারো দর্শককে বিমোহিত করে তাঁরা পরিবেশন করে বাউল শাহ্ আবদুল করিমের গান। তাদের পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে শেষ হয় বাউল সম্রাট শাহ্ আবদুল করিম জন্মশতবার্ষিকী উৎসব।
উল্লেখ্য, শাহ্ আবদুল করিম জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় পর্ষদের উদ্যোগে, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ও সিলেট উৎসব কমিটির ব্যবস্থাপনায় ১৭ ফেব্রয়ারী বুধবার বিকেল ৪টায় সিলেট জেলা স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে উৎসব উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি।
এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরকার সুজেয় শ্যাম ও শাহ আবদুল করিম জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় পর্ষদের আহ্বায়ক গোলাম কুদ্দুছ।

বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম স্মরণে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন করলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি।

মঙ্গলবার 17.02.2016 সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নন্দন মঞ্চে শাহ আবদুল করিম জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় পর্ষদের আয়োজনে ‘আমি বাঙলা মায়ের ছেলে’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন তিনি।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, শাহ আবদুল করিম সংগীতের ভিতর দিয়ে যা রচনা করেছেন তা বিশ্বমানের সৃষ্টি। আত্নপ্রচার বিমুখ এ শিল্পী কখনো শহরে আসার চেষ্টা করেননি। অজপাড়াগায়ে নিরবে,নিভৃতে তিনি তার সাধনা চালিয়ে গেছেন।

মন্ত্রী বলেন, আবদুল করিমকে চিনতে আমরা খুব বিলম্বই করেছি। তিনি যদি দীর্ঘজীবি না হতেন তাহলে তাকে আমরা হয়তো আবিস্কার করতে পারতাম না।

নুর বলেন, বক্ততা দিয়ে শাহ আবদুল করিমকে যতটা না বোঝা যাবে তার চেয়ে বেশি বুঝতে পারবো তার সংগীতকে অবগাহন করতে পারলে। ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ তার ওই একটি গানই তাকে চিরদিন মনে রাখার জন্য যথেষ্ট।

শাহ আবদুল করিমকে একজন অসাম্প্রদায়িক, সুফী সাধক আখ্যায়িত করে সংস্কৃতি মন্ত্রী আরো বলেন, সুন্দর বাংলাদেশে গড়ার লড়াইয়ে আমরা নিয়োজিত । আমাদের এ লড়াই অব্যাহত থাকবে। এ লড়াইয়ে শাহ আবদুল করিম সব সময় আমাদের পাশে থাকবেন।

বক্তারা বলেন, শাহ আবদুল করিম যেমন দেশের গান,প্রেমের গান গেয়েছেন তেমনি গেয়েছে আত্নিক গানও। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে একজন জাগরনের কবি হিসেবে তিনি তখনও তার দায়িত্ব পালন করেছেন। করিম শুধু বাংলার শিল্পী নয় তিনি বিশ্বের একজন মানুষ এ বিষয়টি আমাদের প্রতিষ্ঠিত করার সময় এসেছে।

তারা বলেন, লালন থেকে শুরু করে শাহ আবদুল করিম আমাদের বাংলা লোক সংস্কৃতির ধারা তৈরি করে দিয়ে গেছেন।

শাহ আবদুল করিম জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় পর্ষদের আহবায়ক গোলাম কুদ্দুসের সভাপতিত্বে এসময় আরো বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি সচিব বেগম আখতারী মমতাজ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, গবেষক মাহফুজুর রহমান, সঙ্গীত শিল্পী কালিদাস প্রসাদ , উৎসব উদযাপন পর‌্যদের সদস্যসচিব হাসান আরিফ প্রমুখ।

সাংস্কৃতিক পর্বে আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, সখী কুঞ্জ সাজাও গো, গান গাই আমার মনরে বুঝাই , দিবানিশি ভাবি যারে, ঝিল মিল করে ময়ূরপংখী নায়, বন্ধু আইলারে নারেসহ শাহ আবদুল করিমের বিভিন্ন গান গেয়ে শোনান শিল্পী সুবীর নন্দী, চন্দনা মজুমদার, ফকির শাহাবুদ্দিন, শাহনাজ বেলীসহ অন্যান্য শিল্পীরা।

এছাড়া করিমের গানের সাথে শুক্লা সরকারের পরিচালনায় নৃত্য পরিবশেন করেন শিল্পীরা।

 
সুরের ইন্দ্রজালে শেষ হলো তিন দিনের অনুষ্ঠানমালা
সিলেটে  শুক্রবার শেষ হলো তিন দিনব্যাপী বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের জন্মশতবার্ষিকীর উত্সব। রাষ্ট্রীয়ভাবে বছরব্যাপী বাউল করিমের জন্মশতবাষির্কী পালনের সূচনা পর্বের অনুষ্ঠানের তিন দিনই যেন পুরো সিলেট মেতেছিল শাহ আবদুল করিমে। বাংলাদেশ ও ভারতের খ্যাতিমান শিল্পীদের পাশাপাশি করিমের অনুসারীরা সুরের ইন্দ্রজালে মোহাবেষ্টিত করে রাখে শ্রোতাদের। শেষ দিন দর্শক-শ্রোতারা উদ্বেলিত হয় কলকাতার লোকগানের দল দোহারের গানে।

প্রতিদিনের মতো  শত শিল্পীর কণ্ঠে আবদুল করিমের গানের মূর্ছনায় শুরু হয় দিনের অনুষ্ঠানসূচি। বিকেল ৪টা বাজতেই উত্সবস্থল সিলেট জেলা স্টেডিয়াম চত্বর দর্শকদের উপস্থিতিতে সরব হয়ে ওঠে। শুরুতে স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি বাউল করিমের শিষ্যরা গান পরিবেশন করেন। দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেন সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা। নৃত্য পরিবেশন করেন মণিপুরী ইনস্টিটিউট অব কালচারের (এমকা) শিল্পীরা। প্রদর্শিত হয় বাউল করিমকে নিয়ে বিশষ্টি চিত্র নির্মাতা শাকুর মজিদের প্রামাণ্যচিত্র ‘ভাটির পুরুষ’। ক্লোজআপ তারকা আশিক ছাড়াও আবদুল করিমের গান ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করে কলকাতার লোকগানের দল দোহার।

দোহারের শিল্পী কালিকা প্রসাদ বাউল করিমের গান পরিবেশনের ফাঁকে ফাঁকে এই সাধক পুরুষের নানা বৈশষ্ট্যি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সাধারণত বাউল যাঁরা তাঁরা সেই অর্থে কম্পোজার হন না। তাঁরা তাঁদের সাধনার গান ভক্তদের নিয়ে যে অঞ্চলে থাকেন সেই অঞ্চলের সুরের ওপর গেয়ে যান। পরে শিল্পীরা তাঁদের গানের সুরে খানিক পরিবর্তন আনেন। যেমন হাছন রাজার যে গান আমরা শুনি তাঁর সব সুর হাছন রাজা দেননি। অনেক সুর বিদিত লালের দেওয়া। নির্মেলুন্দ চৌধুরীর দেওয়া। লালন ফকিরের গানেও তাই। কিন্তু শাহ আবদুল করিম ছিলেন ভিন্ন। তিনি নিজে একজন কম্পোজার। তাঁর সুরগুলো শুনলেই বুঝা যায়। তিনি সুরকারও। এটা বাউলদের বেলায় ব্যতিক্রম।’ শেষ দিনে গতকাল উত্সব স্মারক ‘ভব সাগরের নাইয়া’র মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার জন্মশতবার্ষিকী উত্সবের দ্বিতীয় দিনেও শত শিল্পীর কণ্ঠে বাউল করিমের গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে সিলেটের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী অংশুমান দত্ত অঞ্জু, কাকলী দত্ত মুন্নী, লাভলী দে, লাভলী লস্কর, শীতল চৌধুরী, মিতালী চক্রবর্তী, পংকজ দাসের পাশাপাশি সিলেট বিভাগের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাউল শিল্পীরা করিমের গান পরিবেশন করেন। সিলেট বিভাগের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাউল শিল্পীদের মধ্যে বাউল ইকরাম উদ্দিন, শাহজাহান, পথিক রাজু, রুবি রানী দাস প্রমুখ করিমের গান পরিবেশন করেন। নৃত্য পরিবেশন করে এমকা, নৃত্যরঙ, শিল্পাঙ্গনের নৃত্যশিল্পীরা।

বাংলাদেশি শিল্পীদের পাশাপাশি ভারতের খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীরাও করিমের গানে দর্শকদের বিমোহিত করেন। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দর্শকদের সরব উপস্থিতি ছিল সিলেট জেলা স্টেডিয়াম চত্বরে।

অনুষ্ঠানে শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদারের পাশাপাশি ভারতের প্রখ্যাত লোকসংগীত গবেষক ও গণসংগীত শিল্পী শুভেন্দু মাইতি বাউল শাহ আবদুল করিমের গণসংগীতসহ বেশ কয়েকটি গান পরিবেশন করেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে তিনিও করিমকে এবং তাঁর কর্মের নানা দিক তুলে ধরেন।