লন্ডনে ‘বাংলাদেশ বইমেলা’ ও তার ভবিষ্যৎ

148

ফারুক আহমদ

লন্ডনে বাঙালিদের ঈদ মেলা, নববর্ষ মেলা ইত্যাদি সুদীর্ঘকাল ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে এলেও বইমেলার ইতিহাস খুব একটা প্রাচীন নয়। আমাদের অনুসন্ধান মতে লন্ডনে বইমেলার প্রথম আয়োজক ছিলেন লন্ডন থেকে প্রকাশিক ‘দেশবার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক গাজীউল হাসান খান ও ‘সাগর পারে’ পত্রিকার সম্পাদক হিরন্ময় ভট্টাচার্য। হিরন্ময় ভট্টাচার্য তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘নানা রঙের দিনগুলি’তে, ‘লন্ডনে প্রথম বাংলা বইমেলা’ শিরোনামে লিখেছেন, “লন্ডনে প্রথম বাংলা বইমেলার ব্যবস্থা করা হয় ১৯৮৩ সালের ৮-১১ অক্টোবর। উদ্যোক্তা ‘দেশবার্তা’ ও ‘সাগর পারে’ পত্রিকা। লন্ডনে প্রকাশিত বই ছাড়াও কলকাতা থেকে বই এনে সাজিয়েছিল ‘পাবলিশার্স গিল্ড’ এবং ঢাকা থেকে ‘মুক্তধারা’। মেলার প্রাঙ্গণ পূর্ব লন্ডনে মার্ডেল স্ট্রিটের এশিয়ান স্টাডিজ সেন্টার (টাওয়ার হ্যামলেটস ইন্সটিটিউট)। মেলা উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফখরুদ্দীন আহমেদ। বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে এসেছিলেন সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরী। সেখানে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ঢাকার চিত্তরঞ্জন সাহা, গিল্ডের প্রতিনিধি অরবিন্দ ভট্টাচার্য, লন্ডনের হিরন্ময় ভট্টাচার্য এবং তাসাদ্দুক আহমদ।”

গাজীউল হাসান খান বলেন, এই মেলাকে সাফল্যমণ্ডিত করতে কাজ করেন তাসাদ্দুক আহমদ, আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, প্রফেসর গোলাম মুর্শিদ, কথাসাহিত্যিক মাসুদ আহমদ, উদয়শংকর দাসসহ লন্ডনের সর্বস্তরের মানুষ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী মেলায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। মেলায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছিল লন্ডনবাসী লেখক গাজীউল হাসান খানের বিলাতের পটভূমি নিয়ে লেখা ‘বিপন্ন জনপদ’ এবং হিরন্ময় ভট্টাচার্যের ‘নির্বাসিত সাহিত্য’। অর্থাৎ ১০০টির মতো বিক্রি হয়েছিল ‘বিপন্ন জনপদ’ এবং এর পরেই ছিল ‘নির্বাসিত সাহিত্য’-এর অবস্থান।

দ্বিতীয় বার বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় আরও বছর পাঁচেক পরে ১৯৮৮ সালে। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ঢাকা’র কর্ণধার মফিদুল হক, সিপিবি, লন্ডন এবং উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, লন্ডন।

পটভূমি হচ্ছে, ১৯৮৩ সাল থেকে বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সিলেট জেলা সিপিবির সদস্য ও সংস্কৃতিকর্মী সামসুল আলম, সৈয়দ রকিব আহমেদ ও হামিদ মোহাম্মদ বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে ১৯৮৭ সালে আসেন। কথায় আছে, ‘ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’। লন্ডনে এসে এরাও ‘সিপিজিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নিখিলেশ চক্রবর্তীর সাহায্যে লন্ডনেও ‘বাংলাদেশের সিপিবি’র কার্যক্রমকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বৈচারারবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করতে থাকেন। তাদের এহেন কর্মকাণ্ডের খবর শুনে তখনকার জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীর কর্ণধার মফিদুল হক কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন নেতা ও বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছ থেকে উল্লিখিতদের ঠিকানা সংগ্রহ করে, তার প্রকাশনীর পক্ষ থেকে লন্ডনে বইমেলা অনুষ্ঠানের আগ্রহ প্রকাশ করেন। লন্ডনে সিপিবি’র কর্মকর্তাদের চিঠি লিখে জানান যে, তিনি অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে মস্কো ও বার্লিনে অনুষ্ঠিতব্য দুটি বইমেলায় অংশ নিচ্ছেন। তাদের সহযোগিতা পেলে এই সময়ে লন্ডনে বইমেলা করতে চান। নুরুল ইসলাম নাহিদও ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখে মফিদুল হকের আগ্রহের ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা চান। একইভাবে তৎকালীন সাপ্তাহিক একতা’র সম্পাদক মতিউর রহমানও (বর্তমান দৈনিক প্রথম আলো’র সম্পাদক) বইমেলা বিষয়ে তার লন্ডনবাসী বন্ধু শফিউল্লাহর কাছে চিঠি লেখেন, সহযোগিতা চান।

ইতোমধ্যে এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ‘সিপিবি’র আরেকজন লন্ডনবাসী কর্মী সৈয়দ বেলাল আহমদ। সৈয়দ বেলাল আহমদ দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে বসবাসের কারণে এ বইমেলা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তাকে গাইড করেন কবি হামিদ মোহাম্মদ। এরা তখন সিদ্ধান্ত নেন যে, বইমেলা অথবা এ জাতীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে লন্ডনে একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রয়োজন। মূলত এই বোধ থেকেই জন্ম নেয় ‘উদীচী লন্ডন শাখা’। এই সংগঠনের মাধ্যমেই তারা বইমেলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে বই ছাড়িয়ে আনতে সমস্যা দেখা দেয়। তখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন সাব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক (তিনি তখন লন্ডনে)। তিনি তার বন্ধু সোনালী ব্যাংকের কমার্শিয়াল শাখার ম্যানেজার মোহাম্মদ আলীর মাধ্যমে পনের দিনের মধ্যে তিন হাজার পাউন্ড পরিশোধ করার শর্তে বইগুলো ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। তারপর একে একে এগিয়ে আসেন মাহমুদ এ রউফ, গাজীউল হাসান খান, ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আহমদ। যুব ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে হাবিবুর রহমান, লুসি রহমান, ডাক্তার ফজল মাহমুদ, ডাক্তার কুদরতুল ইসলাম, ডলি ইসলাম, হরমুজ আলী, কুমার মুর্শিদ, সৈয়দ শাহীন, উদয়শংকর দাস, মোহাম্মদ দিনার, দিলু নাসের, কুতুব উদ্দিন প্রমুখ। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে চলতে থাকে মেলার প্রচার কাজ।

তখন লন্ডনে বাংলা পত্রিকা ছাড়া কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিল না। সেজন্য কর্মকর্তাগণ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচারের পাশাপাশি পোস্টার বিলি ও বিশেষ বিশেষ স্থানে লাগানোর উদ্যোগ নেন। বিলাতে সেখানে-সেখানে পোস্টারিং করার নিয়ম নেই। এটা বেআইনি কাজ বলেই বিবেচিত। জানা যায়, একদিন রাতে মেলার পোস্টারিং করতে গিয়ে মোহাম্মদ দিনার পুলিশের হাতে ধরা পড়ে দু’ঘণ্টা থানায় আটক থাকতে হয়েছিল। এভাবে মহাধুমধামের মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালের ৮ অক্টোবর বিকাল ৩ ঘটিকায় নন্দিত সাংবাদিক-কলামিস্ট আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী পূর্ব লন্ডনের ডেভেনান্ট সেন্টারে বইমেলার উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অ্যামন্যাস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর সেক্রেটারি জেনারেল মি. ইয়ান মার্টিন, শিল্পী হাশেম খান, ভাস্কর নিতুন কুণ্ডু, সাবেক প্রতিমন্ত্রী বেগম নূরজাহান মুর্শেদ, সাংবাদিক শফিক রেহমান প্রমুখ। বইমেলা চলে ৮ অক্টোবর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত।

এ মেলার সাফল্য সম্পর্কে অন্যতম আয়োজক কবি হামিদ মোহাম্মদ লিখেছেন, ‘বইমেলায় অভাবিতভাবে বইয়ের বিক্রয় হয়। মফিদুল হক মেলার সাফল্যে চমকিত হয়ে ওঠেন। প্রায় এগার হাজার পাউন্ডের বই বিক্রি হয়। তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার বই বিক্রি হয়েছিল।’

এর পরে, ১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, প্রতি বছরের মতো সাহিত্য উৎসব করে লন্ডনের ম্যানিং হল-এ। বাংলাদেশ থেকে অতিথি হয়ে আসেন কবি বেগম সুফিয়া কামাল এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। সাহিত্য উৎসবের অন্যান্য কর্মসূচির সঙ্গে সপ্তাহব্যাপী বইমেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় নিজ খরচে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসে যোগ দিয়েছিল আনন্দ পাবলিশার্স। তাদের বেশিরভাগ বই ছিল সৃজনশীল। সে-বছর আশানুরূপভাবে বই বিক্রয় না হলেও তুলনামূলকভাবে মননশীল বইয়ের বিক্রি ছিল বেশি।

মোটকথা, লন্ডনের এই বইমেলা আমাদের জানান দিচ্ছে যে, লন্ডনে একুশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত বইয়ের পাঠক ছিল, বইয়ের কদর ছিল। তখন শুধুমাত্র ব্রিক লেন ও পাশের রাস্তাগুলোতে ছিল প্রায় চার থেকে পাঁচটি বই ও মিউজিক হাউস। প্রতি সপ্তাহে সোম থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই দোকানগুলোতে বাঙালি ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকত। যুক্তরাজ্যের অলিগলি থেকে বাঙালিরা দেশীয় খাবার, বাংলা পত্রপত্রিকা, বাংলা গানের ক্যাসেট, সিডি, বাংলা ছায়াছবির ভিডিও, ডিভিডি ইত্যাদির জন্য সপ্তাহিক ছুটির দিনে পূর্ব লন্ডনে ছুটে আসতেন। ফিরতেন পলিথিনের বেগ ভরে ভিডিও ক্যাসেট, গানের ক্যাসেট, বই ও পত্রপত্রিকা নিয়ে। তখন এগুলোই ছিল বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে রেস্টুরেন্টকর্মীরা পুরো সপ্তাহ বই পড়ে, গান শুনে এবং নাটক ও ছায়াছবি দেখে অবসর কাটাতেন। একইভাবে সময় কাটাতেন বাংলাদেশ থেকে আসা গৃহিণীরাও। যারা বেশি দূরে থাকতেন, তারা এসে গ্রাহক হয়ে অগ্রিম ডাকমাসুল ও মূল্য পরিশোধ করে যেতেন। দোকান মালিকগণ তাদের ডাকযোগে এসব পাঠাতেন। তখন ব্রিক লেনে পা ফেলার আগে, অনেক দূরে থেকে শোনা যেত কুতুবউদ্দিনের বাঁশিতে পল্লীগীতির সুর। এ কে আনামের কণ্ঠে ‘সিলট পাইলে যেমন তেমন, ঢাকাত পাইলে কই আছইন কেমন, লন্ডন পাইলে ধরিয়া কই ও আমার সিলটী ভাইসাবরে আমার সিলটী ভাইসাব’; হিমাংশু গোস্বামীর কণ্ঠে ‘সাধের লাউ বানালো মোরে বৈরাগী’; আরতি ধরের কণ্ঠে ‘তুমি রহমতের দরিয়া তুমি রহমতের দরিয়া দোয়া কর মোরে হযরত শাহজালাল আউলিয়া’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

তার পর ১৯৯৯ সালের ২৫ জুলাই আসলো স্যাটেলাইটে বাংলা টিভি চ্যানেল ‘বাংলা টিভি’। তখন কিছুটা হলেও কমতে থাকলো বাংলা নাটক ও ছায়াছবির ক্যাসেট ও ভিডিও’র কদর। ২০০০ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ‘একুশের টিভি’; ২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘চ্যানেল-এস’। এভাবে একে একে সোনালী টিভি, ভেকটন টিভি, দেশ টিভি, চ্যানেল-৯ ইউকে, এটিএন বাংলা ইউকে, চ্যানেল আই ইউরোপ, এনটিভি ইউরোপ ইত্যাদি যতই আসতে থাকল, ততই কমতে থাকলো মিউজিক হাউসগুলোর ক্রেতার সংখ্যা, সংবাদপত্র ও বইয়ের পাঠক। ক্রেতার অভাবে একে একে বন্ধ হতে থাকে মিউজিক হাউসগুলো এবং এগুলোর সঙ্গে থাকা বইয়ের বেচাকেনাও। একেবারে শেষে আইফোন বাজারে এসে পুরো বাজারটাকেই তছনছ করে দিয়ে যায়। এখন বাংলাদেশের যেকোনো দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক হোক আর লন্ডনের জনমত, সুরমা কিংবা পত্রিকা হোক স্মার্ট ফোনের ডিজিট টিপলেই ভেসে ওঠে। ব্রিক লেনে যাবার প্রয়োজন হয় না। গ্রাহক হবার প্রয়োজনও নেই। অর্থাৎ পত্রিপত্রিকা থেকে আরম্ভ করে সকল ধরনের বিনোদন এখন চলে গেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। পরিণামে বন্ধ হয়ে গেছে বিলাতের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশী বইবিক্রেতা প্রতিষ্ঠা ‘রূপসী বাংলা’। পশ্চিম বাংলার বইবিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘গ্রন্থ নীড়’-এরও এখন কোনো হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না।

‘রূপসী বাংলা’ সেই সত্তরের দশকে থেকে একুশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত খুচরা বিক্রয়ের পরেও শুধু এদেশের বিভিন্ন বারা কাউন্সিল লাইব্রেরিগুলো থেকে বছরে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার পাউন্ড বা তারও বেশি মূল্যের বইয়ের অর্ডার পেতো বলে শুনেছি। বাঙালি জন অধ্যুসিত প্রায় প্রত্যেকটি বারার লাইব্রেরিগুলোতে আলাদা বাংলা বইয়ের সেল্ফ ছিল। রূপসী বাংলার কর্ণধার মিসেস রায়হানা মাহবুব বলেন, ‘এখন লাইব্রেরিগুলো আর বই কিনে না। কারণ, বাংলা বইয়ের পাঠক নেই।’

মূলত এই মড়কে একে একে হারিয়ে গেছে বই ও মিউজিক হাউসগুলো। কোনোমতে টিকে আছে শুধু ব্রিক লেনের ‘সঙ্গীতা’। প্রতি সপ্তাহে ব্রিক লেনে গেলে প্রথমেই একবার উঁকি মেরে দেখি, দোকানটির দরজা খোলা আছেতো? এই গত বছরও (২০১৫) সঙ্গীতায় বাংলাদেশ ও ভারতের নামি-দামি পত্রিকাগুলো আসতো। এ বছর (২০১৬) থেকে আর আসছে না। আসছে না আগের মতো বইও। কারণ, মালিকের ভাষায়, ‘প্রথমত আকাশচুম্ভী বিমান ভাড়া। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ থেকে ১০০ কেজির নিচে বই আনতে দেওয়া হয় না। জেনে অবাক হবেন যে, এক কেজি সবজির বিমানভাড়া মাত্র ৮০ টাকা। অথচ এক কেজি বই বা পত্রিকার বিমান ভাড়া ২৫০ টাকা। অর্থাৎ এক কেজি শাক-সবজির চাইতে এক কেজি বইয়ের বিমানভাড়া তিনগুণের চাইতেও বেশি। বাংলাদেশ সরকার সম্ভবত মানুষকে জ্ঞান বিতরণের চাইতে তাদের কাছে শাক-সবজি বিতরণে আগ্রহী। তাই বাংলাদেশ থেকে বই আমদানি ছেড়ে দিয়েছি!”

গত ১৫ সেপ্টেম্বর পূর্ব লন্ডনে গিয়ে জানলাম আমার আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ সঙ্গীতা সেপ্টেম্বর মাস থেকে ৩০ ভাগ ছাড় দিয়ে বইয়ের স্টক খালি করতে চাচ্ছে! কারণ, এতো বিমান ভাড়া দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বই নিয়ে এসে লন্ডনে দোকান চালানো সম্ভব নয়। আমার এ লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে তখন কিংবা তার আগে-পরে হয়ত বিলাতের এই একমাত্র বইয়ের দোকানটিও বন্ধ হয়ে যাবে।

সুখের কথা যে, এই আকালে বাংলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের উদ্যোগে এবং ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্য’-এর আয়োজনে ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর লন্ডনে ‘বাংলা একাডেমির বইমেলা’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই মেলা আয়োজনে ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্য’-এর পক্ষে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন গোলাম মোস্তফা, দিলু নাসের, ইকবাল হোসেন বুলবুল, গোলাম কবির, ইসহাক কাজল, মুজিবুল হক মনি প্রমুখ। মেলাকে উপলক্ষ করে ২০১১ সাল থেকে বাংলা একাডেমি প্রবর্তন করে ‘প্রবাসী লেখক পুরস্কার’। ২০১৫ সালে এটির নামকরণ করা হয়, ‘বাংলা একাডেমি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার’।

এ বছর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এই মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং এটির নামকরণ করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ বইমেলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব’। এ বছর বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর, শনি ও রবিবার পূর্ব লন্ডনের ওয়াটারলিলিতে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, মনে হচ্ছে মেলা আর আগের মতো জমছে না। একই কথা, বাংলাদেশের একুশে বইমেলা সম্পর্কে বাংলাদেশের লেখক-প্রকাশকদেরও।

২০১৫ সালের মেলা সম্পর্কে ‘ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ’-এর কর্ণধার জহিরুল আবেদীন জুয়েল বলেন, ‘বাংলাদেশে একুশের বইমেলা এখন অনেকটা প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসেন, কিন্তু সে তুলনায় বই বিক্রি হয় না। যারা আসেন তার বেশিরভাগই ক্রেতা নন, দর্শক। তাই মেলা অনেকটা পণ্ডশ্রমে পরিণত হচ্ছে।’

বাংলাদেশের মতো লন্ডনেও মেলার আমেজ দিন দিন কমেছে। তার প্রধান কারণ আগেই বলেছি- ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা। দ্বিতীয়ত, বাংলা বইয়ের মূল পাঠক ছিলেন বাংলাদেশ থেকে আগতরা। গত প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইমিগ্রেশন আইনে কড়াকড়ির কারণে বিলাতে বাঙালির প্রবাহেও ভাটা এসেছে। উচ্চশিক্ষার্থে আসাও এখন খুব একটা সহজ বিষয় নয়। এর পরেও হাতেগোনা যারা বাংলাদেশ থেকে আসছেন তারা বাংলা ও ইংরেজি কোনো ভাষার বই পড়তে আগ্রহী নন। কারণ, তারা দেশে থাকতে বই পড়ার শিক্ষা বা অভ্যাস কোনোটাই নিয়ে আসছেন না। শিক্ষক ও অভিভাবকেরা তাদেরকে শুধু একটা জিনিসই শিখেয়েছেন কীভাবে জিপিএ-৫ পাওয়া যায়। সেজন্য তাদেরকে শুধু পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠায় ডুবিয়ে রাখা হত। এখন তারা মগ্ন থাকে স্মার্ট ফোন নিয়ে। সেজন্য বাংলাদেশে যেমন বাংলা বইয়ের পাঠক দিন দিন কমছে, তেমনি বিলাতেও বাংলা বইয়ের পাঠক কমছে।

বিলাতে বইমেলা না জমার বহুবিধ কারণের মধ্যে আরেকটি হচ্ছে, পাঠকের চাহিদামতো বই না আসা। আগেই বলেছি লন্ডনে প্রথম বইমেলায় বই বিক্রির তালিকার শীর্ষে ছিল বিলাতের লেখকদের বই। দ্বিতীয় বইমেলা হয়েছিল মননশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশনী’র মাধ্যমে। মাত্র সাত দিনে প্রায় তিন হাজার বই বিক্রি হয়েছিল। তৃতীয় বার এসেছিল কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স। আশানুরূপ বই বিক্রি হয়নি। চতুর্থবার বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় মননশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা একাডেমি’র উদ্যোগে। বই বিক্রির পরিমাণ মন্দ ছিল না। কিন্তু বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে যে, এ প্রতিষ্ঠানটিও পাঠকের চাহিদামতো বইগুলো লন্ডনে আনেন না। দ্বিতীয়ত একই ধরনের বই প্রায় প্রতি বছর লন্ডনে আসে। তৃতীয়ত একটি সরকারি প্রকাশনা সংস্থা হওয়া সত্ত্বেও বইয়ের কাগজ, ছাপা ও বাঁধাই অর্থাৎ কোয়ালিটি অত্যন্ত নিম্নমানের। এর পরেও অভিধান এবং অন্যান্য গবেষণামূলক বই এখনো মেলায় মুড়িমুড়কির মতো বিক্রি হয়। সে তুলনায় বিলাতে সৃজনশীল বইয়ের পাঠক খুবই কম। পাঠক ও আয়োজকদের চাহিদামতো বই নিয়ে আসলে যে, অবিক্রীত থাকে না তার প্রমাণ হচ্ছে ২০১২ সালের বাংলা একাডেমি বইমেলা। সে বছর ঢাকা থেকে এসেছিল সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ’। মাত্র কয়েকটি বই ছাড়া তাদের সব ক’টি বই বিক্রি হয়ে যায়। কারণ একটিই, তারা আমাদের দেওয়া তালিকা অনুসারে বই নিয়ে এসেছিলেন।

মোটকথা, বিলাতের পাঠকের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ইতিহাস, আঞ্চলিক ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ, লোকসাহিত্য, জীবনী, রচনাসমগ্র, অনুবাদ ইত্যাদির চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি। তার পরেই রয়েছে ধর্মীয় পুস্তকাদি। এর প্রমাণ পাওয়া যায় স্থানীয় লাইব্রেরিগুলোতে গেলে। সেগুলোতে অন্য যেকোনো বইয়ের তুলনায় ধর্মীয় বইগুলো ইস্যু করার খতিয়ান দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। এর কারণ বহুবিধ এবং এ আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক। তৃতীয় স্থানে রয়েছে কবিতা এবং এর পরে গল্প ও উপন্যাসের স্থান।

মননশীল বই বিক্রি হবার কারণ সেগুলোর নামই বলে দেয় বইগুলোতে কী আছে। পক্ষান্তরে, সৃজনশীল বই বিক্রি না হবার প্রথম কারণ হচ্ছে বইগুলো সম্পর্কে পাঠকের কোনো ধারণা থাকে না। যেমন কলকাতায় বইমেলার আগে, এমনকী পুরো বছরব্যাপী কোনো প্রকাশনা সংস্থা কি কি বই প্রকাশ করছে, কোন বইয়ে কী আছে সে বিষয়ে সেখানকার আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ পত্রিকা, বইয়ের দেশসহ অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাগজগুলোতে রিভিউ বের হয়। যেগুলোর রিভিউ পাওয়া যায় না, সেগুলোর অন্তত সচিত্র পরিচিতি ‘বইয়ের দেশ’সহ অন্যান্য কাগজগুলোতে পাওয়া যায়। তার ওপর প্রকাশকেরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সেগুলোর সচিত্র বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। এতে পাঠক জানতে পারেন এটা কার বই এবং বইয়ে কী আছে। ফলে পাঠক আগে থেকেই কোন বইটি কিনবেন তা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই মেলায় যান। কিন্তু বাংলাদেশের বইগুলোর ব্যাপারে আমরা সেভাবে অনেক কিছুই জানতে পারি না।

শুনেছি এ বছরও কয়েকটি সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা মেলায় আসবে। এটা অবশ্যই বিলাতবাসীর জন্য একটি আনন্দের খবর। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা থেকে অভিমত হলো মেলা জমাতে হলে, বইয়ের বিক্রি বাড়াতে হলে, এখানকার পাঠক কারা এবং তারা কী ধরনের বই চান সে বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েই প্রকাশকদের মেলায় আসা উচিত। বাংলাদেশের এটিএন বাংলা, এনটিভি, আইটিভি এগুলোর অনুষ্ঠানমালা সরাসরি ইউরোপেও দেখানো হয়। প্রকাশকদের উচিত মেলায় আসার আগে তারা কী কী বই নিয়ে আসছেন, কোন কোন লেখকের বই নিয়ে আসছেন এ নিয়ে উল্লিখিত স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেরলগুলোতে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, বিজ্ঞাপন প্রচার করা। যাতে বিলাতের পাঠকদের পক্ষে বই কেনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয়া সহজ হয়। নতুবা মেলায় তাদের অংশগ্রহণ, বিশেষ করে বই বিক্রির দিক থেকে অনেকটা অন্ধকারে রূপসীর রূপ দেখার মতোই হবে। একইসঙ্গে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, সাহিত্য প্রকাশ, প্রথমা এ ধরনের প্রকাশনা সংস্থাগুলোও আসা দরকার, আর তাহলেই মেলা তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলেই আমার ধারণা।

ফারুক আহমদ : ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কারপ্রাপ্ত লন্ডনপ্রবাসী লেখক।