সততা চর্চার ‘অনেস্টি শপ’

47

।।তরিকুল ইসলাম।।

নেই কোনো দোকানি, নেই নজরদারি ক্যামেরা। জিনিসপত্রের গায়ে দাম লেখা রয়েছে। সেই দাম অনুযায়ী খাতা-কলম বা অন্য কোনো শিক্ষাসামগ্রী নিয়ে লাল বাক্সে টাকা রাখতে হবে। এভাবে কোনো দরদাম ছাড়াই শিক্ষার্থীরা কেনাকাটা করতে পারছে ‘অনেস্টি শপ’ থেকে। এই দোকান থেকে শিক্ষার্থীরা যেমন সহজে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারছে, তেমনি রাখতে পারছে সততার স্বাক্ষর।

ধানমন্ডির কার্ডিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীদের সততা অনুশীলনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই এই প্রয়াস। ওই স্কুলের কয়েকটি ক্যাম্পাসে এমন ব্যতিক্রমী দোকান রয়েছে।

একটি পণ্য অতিরিক্ত নিলে বা টাকা না দিলে দেখার কেউ নেই। তবু সবাই সততার পরীক্ষায় পাস করেছে। গত কয়েক মাসের ক্যাশবক্সের হিসাব তা-ই বলছে।

এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করা হয়, সুযোগ থাকার পরও তারা কেন আরেকটি জিনিস নেয় না? ক্যাশবক্সে কম টাকা কেন ফেলে না? কেউ তো আর দেখছে না।

তার বক্তব্যের সারকথা—বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। ‘স্যাররা আমাদের বিশ্বাস করেন তাই,’ ওই শিক্ষার্থীর সোজা উত্তর।

ষষ্ঠ শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী জিবা তাসনিয়া বলল, ‘আমি সততা চর্চার সুযোগ জীবনে এই প্রথমবার পেয়েছি, কেন আমি সে সুযোগ কাজে লাগাব না?’

ধানমন্ডির কার্ডিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের একজন শিক্ষার্থী অনেস্টি শপে পণ্য কিনছে। ছবি: তরিকুল ইসলামদিনে তিনবার সকাল, দুপুর ও বিকেলে দোকানটি খোলা হয়। নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা মেনে ওই বিপণি থেকে তাদের প্রয়োজনীয় যেকোনো পণ্য কিনতে পারে শিক্ষার্থীরা। দোকানের চারপাশের তাকে সাজানো আছে কলম, পেনসিল, খাতা, রাবারসহ বিভিন্ন রকমের শিক্ষাসামগ্রী।

এই অভিনব উদ্যোগের বিষয়ে ওই স্কুলের অধ্যক্ষ এ এম এম খাইরুল বাশার বলেন, ‘অনেস্টি শপ এ বছর চালু করা একটি প্রজেক্ট। শিক্ষার্থীদের সততা শেখানোর জন্যই এই উদ্যোগ। এটিকে সততার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসও বলতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ছোটবেলায় শিখেছি “সততা উত্তম পন্থা”। কিন্তু এ স্কুলের শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় “সততা একমাত্র পন্থা”। উক্তিটি এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।’

লাল ক্যাশবক্সটি সপ্তাহ শেষে খোলা হয়। পণ্যমূল্যের সঙ্গে মোট টাকার পরিমাণ মেলানো হয়। একটি পণ্য অতিরিক্ত নিলে বা দাম পরিশোধ না করলে দেখার কেউ নেই। তবু কয়েক মাসে পণ্যমূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা পাওয়া গেছে বলে জানান এই প্রকল্পের পরিচালক এহসানুল আমিন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে ধরেই নিয়েছিলাম আমাদের লোকসান হবে। কিন্তু প্রতি মাসে ক্যাশবক্সে আমরা বরং অতিরিক্ত টাকা পেয়েছি।’ যেহেতু খুচরা করার সুযোগ নেই, তাই কিছু শিক্ষার্থী বাড়তি টাকা রেখে গেছে বলে মনে করেন এহসানুল আমিন।

এই প্রকল্পে অংশ নিতে পেরে শিক্ষার্থীরা আনন্দিত, উজ্জীবিত। স্কুলের শিক্ষার্থী রাইমা বলে, ‘এখানে কেনাকাটা করতে খুব ভালো লাগে। যেকোনো পণ্য দেখেশুনে নিজেই পছন্দ করে কিনতে পারি।’

সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অতসী হৈমন্তিকা বলেন, ‘একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্যই আমি সততা চর্চা করি, যা একজন মানুষকে অনেকভাবে সাহায্য করতে পারে।’

এই চর্চা শিক্ষার্থীদের ওপর সুপ্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন ওই স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষিকা ফারহানা আক্তার। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমি আমার ওয়ালেটটি কয়েক হাজার টাকাসহ হারিয়ে ফেলি। সারা দিন স্কুলে খোঁজাখুঁজি করেও এটি না পেয়ে হতাশ হই। ভেবেছিলাম, ওটা আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু পরদিন একজন শিক্ষার্থী এসে ওয়ালেটটি আমার হাতে দিয়ে বলে, “ম্যাম, এটা নিশ্চয় আপনার।