কবি সৈয়দ শামসুল হক বিলেতে কি আর আসবেন?

143

।।হামিদ মোহাম্মদ।।

বিলেতে ডজন খানেক বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র রয়েছে। বাংলা সংবাদপত্রের এক শ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে মূল্যমান তলানিতে। কিন্তু সংবাদপত্রের প্রকাশক ও মালিক সম্পাদকদের ধারণা ভিন্ন। তারা মানতে নারাজ এ ধরনের মন্তব্য। ঢাকার পত্রিকা থেকে কপি করে যার শুরু,বর্তমান অবস্থায়ও এর তেমন হেরফের নেই।যারা কাজ করেন,তারাও গা-সওয়া। পত্রিকায় কাজ করেন এই লেভেলটা রক্ষা করা ছাড়া আর কোনো মাথাব্যথা নেই।
কথা বলছি বিলেতের বাংলা সংবাদপত্রের মান নিয়ে শুধু নয়, এর মতিগতি নিয়ে। মানসম্মত কিছু প্রকাশ করার পেছনে নিষ্ঠা,ইচ্ছা ও স্বপ্ন থাকা প্রায়োজন। দীর্ঘদিনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,এ ক্ষেত্রে বিলেতের প্রকাশনা জগতের সৃজনশীলতা কোনো পত্রিকারই ধর্তব্য বিষয় নয়। বিলেতে ভালো অনেক লেখক রয়েছেন,অতীতেও ছিলেন কিন্তু পত্রিকাওয়ালারা এদের ধার ধারেননি, ধারেনও না। কোনোদিন কোনো লেখার জন্য কোনো খ্যাতিমান লেখককে তাগিদ তো দূরের কথা দ্বারস্থও হননি। বিলেতেই ছিলেন ইতিহাসবিদ গবেষক তপন রায় চৌধুরী,হিরন্মূয় আচার্য,ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন।তাঁরা এখন প্রয়াত।
বিলেতে খন্ডকালিন বসবাস করেছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক,শহীদ কাদরী,আসাদ চৌধুরী। এছাড়া তরুণ লেখক ইমতিয়ার শামীম, মুজাহিদ শরীফ,মাসুদা ভাট্টি, শামীম রেজা ছিলেন অনেকদিন। রয়েছেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। স্থায়ীভাবে আছেন তরুণ কবি মুজিব ইরমসহ আরো অনেক লেখক ও কবি।
এছাড়া বিলেত অনেকটা তীর্থভূমি হয়ে আছে উপমহাদেশের বাঙালি মনীষীদের। কোনো মনীষী বিলেত আসেননি,বিলেত এসে জ্ঞান আহরণ করেননি, এমন ধরনের ঘটনা বিরল।
কথাগুলো অনেকের মতে, হতে পারে অগোছালো। হ্যা, অগোছালো-ই।সম্প্রতি দীর্ঘদিন লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। তাকে দেখার জন্য বা তাঁর কোনো সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য জানা মতে, কোনো বাংলা পত্রিকার সাংবাদিক যাননি হাসপাতালে। যারা গেছেন,তারা ফটো সেশন ও ফেইসবুকে ফলো-আপ করার জন্য। একমাত্র কবি মুজিব ইরম এ সময় সৈয়দ হককে নিয়ে একটি লেখা ঢাকার একটি দৈনিক ও লন্ডনের অনলাইন বিলেতবাংলা‘য় লিখেছিলেন। লেখাটি সঘন উচ্চারণে ঋদ্ধ ছিল।
অথচ,সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কবি।বাঙালি মননের কবি, লেখক,নাট্যকার। অতি কদর বা তাকে নিয়ে বাগাগম্বর করার দরকার নেই।কিন্তু তাঁর প্রাপ্য সম্মান,অন্তত তাকে শয্যাশায়ী অবস্থায় এক নজর দেখা বিলেতের বাঙালি লেখক সাংবাদিকদের সময় হলো না,এটাই আশ্চর্য বিষয়। রাজনীতিকদেরও বাদ দেয়া যায় না।তারাও একবার উঁকি দেননি। অথচ, নেতানেত্রীরা লন্ডনে এলে মাটিতে পা রাখতে দেন না।ঘুম হারাম হয়।
বিলেতের কারোর সময় না হলেও লন্ডনে তাঁর চিকিৎসা চলাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালে ছুটে গেছেন।দীর্ঘ সময় ছিলেন সৈয়দ হকের শয্যাপাশে। দেশে চলে যাবার পর আবার প্রধানমন্ত্রী দেখতে গেছেন হাসপাতালে। চিকিৎসা ব্যয় বহনের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। চলচ্চিত্র শিল্পী কবরী দেখতে গেছেন সেই ষাটের দশকের সৈয়দ হকের চিত্রনাট্য ‘সুতরাং‘য়ে প্রথম অভিনয়ের স্মৃতি যার উজ্জ্বল হয়ে আছে মনে। দেখতে গেছেন এবং প্রতিদিন যাচ্ছেন দেশের সনামধন্য সংস্কৃতিকর্মী,কবি ও লেখকরা। কলকাতার আনন্দবজারসহ পত্রপত্রিকা শয্যাশায়ী সৈয়দ হককে নিয়ে বিশেষ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। দেশের মাটিতে শয্যাশায়ী এই বরণ্য কবিকে যথাযথ মর্যাদা দেয়া দেখে লজ্জা যদি না পান অন্তত আফসোস হওয়ার কথা বিলেতের সংবাদপত্র জগতের মানুষের।
অন্যদিকে, জাতির বিবেক,অন্ধকারে পথ প্রদর্শক, আমাদের মূলবোধের অন্যতম অগ্রপথিক সৈয়দ শামসুল হক অনেকটা নিরবে লন্ডনে হাসপাতালে কাটিয়ে গেলেন কয়েক মাস। এ বিষয়টি অন্যতম লজ্জা হয়ে থাকবে ইতিহাসে। তিনি কি লন্ডনে আর আসবেন? আসার সময় হবে?
এ জন্য শুরুতেই, বিলেতের বাংলা সংবাদপত্রের বর্তমান চিত্র নিয়ে কিছুটা অগোছালো আলোকপাত করেই মূল বিষয়টি ব্যক্ত করতে হয়েছে। যাতে জবাবটাও অন্য কেউ দেবার দরকার নেই।এতো দু:সময়,দূরাবস্থা বিলেতের বাঙালিদের অতীতে ছিল না বলেই জানি।