আমারে তুমি করিবে ত্রাণ

83

সাগুফতা শারমিন তানিয়া

কেউ কিছু বললে সেটা নিয়ে ‘পারসোন্যাল চয়েজ’ এর ধুঁয়ো তোলাটা তো আছেই। সম্মিলিতভাবে এইসব সামাজিক লক্ষণ অনেকগুলি কথা বলে। বলে, নির্বিচার পশুহত্যাকে গ্ল্যামারাইজ, হিউম্যানাইজ এবং র‍্যাশনালাইজ করতে আমরা সোচ্চার। প্রাণীর অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর পটভূমিতে দাঁড়িয়ে এইসব কাউফি-গোটফি-সেলফি আসলে আমাদের মৃত্যু নিয়ে নির্বিকারত্বকেই দেখিয়ে দেয় শুধু, আমি দুঃখিত-কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি এইসব ছবি আমাদের হৃদয়মনের কোনো রকম ত্যাগের স্পৃহাকে দেখিয়ে দেয় না।

মনের পশুর প্রসঙ্গে আসি। পশু আমার জানামতে নিষ্পাপ। ওয়াল্ট হুইটম্যানও তাই ভাবতেন। পশু আসলে কী করে? পশুকে প্রবৃত্তির পুরিয়াতে যা কিছু পুরে দেয়া হয়েছে পরমেশ্বরের কাছ থেকে, যা তার ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজনীয়- সে শুধু তাই করে। ক্ষিদে পেলে খাদ্য সংগ্রহ করে খায়, সন্তানধারণ-বংশরক্ষা ইত্যাদির জন্য শারীরিকভাবে মিলিত হয়, যে সময়টুকু সে কিছুই করে না তখন ঘুমায় বা স্তব্ধ থাকে।

এটা ‘পাশবিক’ কেন হবে? কোনো বড় তত্ত্বের ধার না ধেরে, জীবনের নিগূঢ় গোপন নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে একান্ত ব্যক্তিগত জীবনযাপন করা যদি পশুত্ব হয়- তাহলে পশুত্বই তো আমাদের নির্ভান-নিষ্পাপ জীবনের দিকে যাওয়ার পথ। আমাদের গন্তব্য।

হুইটম্যান যে লিখেছিলেন,

“I think I could turn and live with the animals, they are so placid and self contained;

I stand and look at them long and long.

They do not sweat and whine about their condition;

They do not lie awake in the dark and weep for their sins;

They do not make me sick discussing their duty to God;

Not one is dissatisfied-not one is demented with the mania of owning things;

Not one kneels to another, nor his kind that lived thousands of years ago;

Not one is responsible or industrious over the whole earth.”

একটি পশুও অন্ধকারে পাপিষ্ঠ মানুষের মতো জেগে থাকে না, ঈশ্বরের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য নিয়ে মুখে ফেনা তুলে অপরকে অতীষ্ঠ করে আবার অন্যায় পথে হাঁটে না, পশুর ‘আন্তরিক অসন্তোষ’ বলে চিরজাগরুক কোনো অনুভূতি নেই, সে আরেক পশুর কাছে মহীয়ানও হয় না, নতজানুও হয় না।

‘পাশবিক’ বলতে তো আসলে এই-ই বোঝায় এবং ভেবে দেখুন, পাশবিকতা আমাদের জন্য কত জরুরি। তেমন কাউকে অযথা কষ্ট না দিয়ে, তেমন কোনো ক্ষতিকর চিন্তা মাথায় না রেখে নির্বিরোধ একটি জীবন কাটায় পশু- মনে যদি পশু থেকে থাকে তবেই আমাদের মানবিক হওয়া সম্ভব।

কিন্তু আমাদের মনে আসলে জেগে আছে মানুষ, তার কবজি ডুবিয়ে খেতে হবে, খেতে খেতে হয়রান হয়ে গেলে বাকিটা ফেলতে হবে, ফেলতে গিয়ে কারো কথায় কর্ণপাত করতে না হয় সেজন্য সে ধর্ম এবং সামাজিকতার ঠিকুজি খুঁজে ঠিকঠাক বের করে নেবে ভান করবার উপায়, দেখানোর অজুহাত।

পানখী সাপের মুখ থেকে হাড়গিলে পাখি ছুটে বেরিয়ে গেলে শিকার ধরতে না পারায় সে ফোঁসফোঁস করবে একবেলা, মানুষ একই ফোঁসফোঁস আজীবন বয়ে বেড়াতে সক্ষম। শিকারী পাখি মা পেঙ্গুইনের সামনেই তার বাচ্চাকে খেয়ে ফেলে, মা বেড়ালের সামনে থেকেই তার ছানা ছোঁ মেরে নিয়ে যায়; আমরা তার চেয়ে ভয়াবহ কাজ করি, আমরা মায়ের সামনে বাচ্চাকে গলাধঃকরণ করি এবং তারপর দোহাই দিই সামাজিক-ধর্মীয়- রাষ্ট্রীয় কত না অনুশাসনের।

বুদ্ধিবৃত্তিতে আমরা নিরঙ্কুশভাবে সেরা বলে আমাদের ওজরের অভাব হয় না কখনো, আগে ভাবতে হবে আমার কী চাই, তারপর যুক্তির গজ-ফিতে নিয়ে চাহিদামাফিক কাপড় কাটতে বসবো, তাই আমাদের নৃশংসতার পিছনে কারণের অভাব হয় না, সম্পূর্ণ অন্যায় যুদ্ধের অজুহাতের অভাব হয় না, ভূপ্রকৃতিকে নির্বিচারে দোহন করবার যুক্তির অভাব হয় না।

যেমন ধরুন, মানুষ হিসেবে আমার শখ হয়েছে সবচেয়ে ফুরফুরে সবচেয়ে উষ্ণ চাদর গায়ে দেব, শুধু আমার ইচ্ছার কারণে আমি গর্ভস্থ ভ্রুণ ভেড়াশাবকের লোম (আপনি ঠিকই পড়ছেন, গর্ভবতী ভেড়ীর পেট চিরে এই ভ্রুণ বের করা হয়) দিয়ে ‘পশমিনা’ পরবো। পশু আমার চেয়ে অধম নাকি? কবে থেকে?

হিতাহিত সারাবেলা কপচে দিনের শেষে মানুষ তাই করে যাতে তার ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি হবে। সারাদিন ত্যাগের মহিমা- ঈশ্বর থেকে রবীন্দ্রনাথ সকলের বাণী প্রচার করে সন্ধ্যাবেলা আসলে ফেসবুকে ‘কত বড় গরু’ কেনা গেল সেই আস্ফালন করাটাই আসলে উদ্দেশ্য।

শৈশবে যখন দাদীর মুখে ইবরাহীম (আঃ) এর এই গল্প শুনতাম, নিজের প্রথম শিশু সন্তান ইসমাইল (আঃ)কে আশি বছর বয়স্ক ইবরাহীম (আঃ) পাহাড়ে নিয়ে যাচ্ছেন কারণ গায়েবী আদেশ হয়েছে – “কোরবানি দাও,” ভয়ে আমি চোখ বুঁজে ফেলতাম। পরে যখন ইসমাইল বেঁচে ফিরতেন, আর তার বদলে একটি মায়াভেড়া জবেহ হতো আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতাম। এ গল্প ব্যাবিলনিয়ানদের, মিনিয়ানদের, ইহুদিদের, খ্রিস্টানদের এবং মুসলিমদের, অর্থাৎ প্রাক-ইসলামিক আরবেও এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।

আল্লাহ কেন তাঁর খলিলুল্লাহ (পরম বন্ধু) ইবরাহীমকে (আঃ) এমন ভয়ানক আদেশ দিলেন? সর্বজ্ঞানী যাঁকে ডাকা হয় তিনি কি আপনা থেকেই ইবরাহীমের মন জানতেন না? কেন এই ভয়াবহ পরীক্ষা?

পাহাড় থেকে তো সন্তুষ্ট পিতাপুত্র নেমে এলেন, আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার আনন্দে তাঁরা উদ্বেল, এ ঘটনার পর ইসমাইল (আঃ) নাকি ১৩৭ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু নিজের সন্তানকে জবেহ করতে জনহীন পর্বত-প্রান্তরে নিয়ে গেছিলেন ইবরাহীম (আঃ), সেই গ্লানি কি তাঁকে জীবদ্দশায় তাড়া করতো? জানতে ইচ্ছা করে।

কারণ ইসলামিক স্কলাররা বলছেন, আল্লাহ কুরআনের কোথাও ইবরাহীম (আঃ)কে বলেননি ইসমাইল (আঃ)কে কুরবানি দিতে, এমনকি স্বপ্নাদেশেরও উল্লেখ নেই। বরং উল্লেখ আছে, ইসমাইল (আঃ)কে ডেকে পিতা বলছেন, “হে আমার পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে কুরবানি দিচ্ছি।”

আমি একটি জায়গায় পড়েছি, কুরআনের কোথাও এই ঘটনায় সেই মায়াভেড়া জবেহ হবার কথাও লেখা নেই, বর্ণিত আছে এই মহাপাপ (নরহত্যা মহাপাপ) থেকে ঈশ্বর ইবরাহীম (আঃ)কে অব্যাহতি দিলেন, আল্লাহর ইন্টারভেইন করার কথা আছে, কিন্তু ইসমাইলের বদলে ভেড়া কুরবানির কথা নেই। যদি এ মহাপাপ থেকে অব্যাহতি হয়, তবে এই মহাপাপের মন্ত্রণা কে দিল? পাপ করবার আহ্বান কে করে মানুষকে? ঈশ্বর তো নন (আল্লাহ নেভার অ্যাডভোকেটস ইভিল।) !

ইসমাইলকে জবেহ করার এ চেষ্টার পর ঘোষণা জারি করা হলো, Killing an innocent soul is a great sin , কেন তবে সেই ভয়ানক পাপকাজে আদেশ করা হলো? ইসলামের হর্তাকর্তা সৌদিদের আর্থিক এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ইহপৃথিবীতে যত অপাপবিদ্ধ আত্মার মৃত্যু হয়েছে তা নিয়েই বা প্রশ্ন কবে করবো আমরা?  বলা হয়েছে পশুর রক্ত বা মাংসে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই, তিনি চান তোমার আন্তরিক আনুগত্য, মাংসে মানুষের অধিকার তাতে ঈশ্বরের কিছু যায় আসে না। আল্লাহর অনুগত হিসেবে, কিলিং অ্যান ইনোসেন্ট সোল ইজ আ গ্রেট সিন জেনে, সৌদিদের গণহত্যাকে কবে প্রশ্ন করবো আমরা?

আমি কোনো ইসলামিক স্কলার নই, তবে আমি জানি আমার সংশয় আমি উত্থাপন করতেই পারি। ভাঙা হাটে যখন একজন গরুচাষী গামছায় মুখ লুকিয়ে হু হু করে কেঁদে ফেলে, যখন পশুর হাটে শেষবারের মতো দুই কাঁধে দুই গরুকে আগলে চাষী আর গরুতে আলিঙ্গনের ছবি দেখি, আমার মনে হয় এ তো ঈশ্বরের পায়ে আহুতি নয়, অর্থের সমাগমকে কোনোভাবে অস্বীকার করতে না পারা অক্ষমের কান্না।

শৈশবে যখন নিষ্পাপ অবস্থায় আমার মতো শিশুদের ‘পাপক্ষালনের’ আশায় জোর করে কুরবানি দেখতে বাধ্য করা হতো, আমি সেখানে কোনো ভালবাসার মহিমা, কোনো আত্মত্যাগের জ্যোতি দেখতে পেতাম না।

একটি পশুর অকথ্য মৃত্যুযাতনা ছাড়া আমার সত্যদর্শী শিশুমন আর কিছুই দেখতে পেত না। একটু বড় হবার পর পরিবারের চাপের বিরুদ্ধে গিয়ে কুরবানি আমি আর দেখিনি, একটি শিশুকে একটি জীবিত প্রাণীর হত্যাদৃশ্য দেখাবার ভিতরে কোনো কল্যাণ থাকতে পারে না, তার মমতাময় হৃদয়কে পাষাণ করে তুলবার পদ্ধতিতে কোনো কল্যাণ নিহিত থাকতে পারে না।

অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স্ক মাদ্রাসার শিশুকে দিয়ে কুরবানি করানোটা কোনো কল্যাণ প্রসব করবে না।

বকরি-ঈদের সকালে মৃত্যুপথযাত্রী পশুর অসহ্য কান্না, কসাইয়ের হাত থেকে ছুটে যাওয়া প্রাণীর পিছনে অজস্র মানুষের হৈ-হৈ, এর ভিতর আমি দরজা বন্ধ করে বসে থাকতাম, আমার পাশে বসতেন মহাকবি-

“আমারই পাদোদক নিয়ে

প্রাণপ্রবাহিনী বইছে তাদের শিরায়।

তাদের অপমান আমাকে বেজেছে;

আজ তোমার হাতের নৈবেদ্য অশুচি।”

আমার মন বলে, আল্লাহ যিনি ভালবাসার আধার, যিনি আমারও আল্লাহ, অবলা জীবেরও আল্লাহ, তিনি এমন নিষ্ঠুরতা দেখে বান্দার ভালবাসায় তুষ্ট হবেন তা হতেই পারে না। হাদিসে কুদসীতে (মানে কিনা রসুল সাঃ আল্লাহর বলা কথা সরাসরি বর্ণনা দিচ্ছেন) আছে, “আমি আমার বান্দার ধারণার সহিত রহিয়াছি, অর্থাৎ বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা পোষণ করে, আমিও তাহার সহিত তেমন ব্যবহার করিয়া থাকি।”

মানুষকে প্রতারণা করতে করতে আমরা এতই সিদ্ধহস্ত যে আমরা ঈশ্বরকেও প্রণতি দিই ভান করে, আত্মোপলব্ধির ভান- ত্যাগের ভান- স্বার্থহীনতার ভান- যেন এতসব সাত্ত্বিক ভানের আড়ালে আমাদের অগাধ মাংস কিনবার রাজসিকতা এবং  মাংস খাওয়ার তামসিকতা আড়াল করা যায়। কই এতিমখানার অর্ধাশনে বছর কাটানো শিশুদের তো আমরা মৃত্যুবার্ষিকী ছাড়া স্মরণ করি না, ‘স্কুল মিল’ বলে কোনো দ্বি-প্রাহরিক খানা যদি স্কুলে বরাদ্দ করা হয়, আমরা নিঃসংকোচে সেখান থেকে চুরি করবো, ভুখা গর্ভবতী নারীদের কাজের বুয়া হিসেবেও তো চাকরি দিই না যথেষ্ট পরিশ্রম করতে পারবে না বলে- আর্তকে খাদ্য বিতরণের এই তো নমুনা। এই তো নমুনা আমাদের হৃদয়ের দীনতার। তাহলে এই কুরবানি ঈদের সময় মাংস বিলানোর এবং আত্মত্যাগের এতো ভেক কীসের?

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের একটি ছোটগল্পে রাঢ় অঞ্চলের কুমড়োচাষী ভোজের কুমড়ো দিতে ভিনগাঁয়ে যেতে যেতে পথশ্রমক্লান্ত গরুকে বিক্রি করে দেয়- সেই গরুর মাংস ভেবে পীরের দরগার সিন্নি আর খেতে পারে না, চাষীর চোখের সেই অনর্গল অশ্রু আর সেই সন্তান-সম্বোধন দেখে পীর ঘৃণায় মুখ কুঁচকে তাকে ‘বেদাত’ এবং ‘বুতপূজারী’ ইত্যাদি গাল দেন, সেই-ই আসল গল্প। ধর্মের কারবারীরা কী হিন্দু, কী মুসলিম, ক ইহুদি, এই পশুবলির রক্তে কবে ধুয়ে ফেলেছে আসল প্রেমের বাণী।

১৩/০৯/২০১৬

‘উইমেন চ্যাপ্টার‘থেকে সংকলিত।