‘তৃতীয়বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ ’ ৩০ – : মাহমুদ এ রউফ

110

বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনীতিক,কমিউনিটি নেতা মাহমুদ এ রউফ দেশে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিতে যুক্তছিলেন। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের  সক্রিয়  কর্মী ও ছাত্রনেতা। সিলেটের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মদনমোহন  কলেজের শিক্ষার্থী  ছিলেন ষাটের দশকের গোড়ার দিকে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে লন্ডনে আসেন ষাটের দশকের  শেষার্ধে। জড়িয়ে পড়েন বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিলেত হয়ে ওঠে তৃতীয় রণক্ষেত্র। মাহমুদ এ রউফ বিলেতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সংঘটিত আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন প্রথম সারির নেতা। তাঁর  লেখনিতে উঠে আসছে  ‘তৃতীয় বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ‘।

বিলেতবাংলা২৪.কম ধারাবাহিক প্রকাশ করছে বিলেতে বাঙালির প্রত্যয়দীপ্ত এই আগুনঝরা দিনের ইতিহাস। প্রতি সপ্তাহে  থাকছে ‘তৃতীয়বাংলায়  মুক্তিযুদ্ধ ‘।-নির্বাহী সম্পাদক।

কিস্তি ৩০

ডিসেম্বরের তৎপরতা

১৯৭১ সালের  সেপ্টেম্বরের শেষে ইন্দিরা গান্ধীর মস্কো সফর এবং সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগরণী,প্রধানমন্ত্রী কুসিগিন ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভের সাথে সাফল্যজনক আলোচনা ও প্রায় ৯০ লক্ষ বাস্তুত্যাগী ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারি বাংলাদেশীদের মুক্ত বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য তাদের পূর্ণ সমর্থন আদায় অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক মনে হচ্ছিল। তারপর আবার জনমত সৃষ্টির জন্য ইউরোপ ও আমেরিকা ইন্দিরা গান্ধীর সফর আমাদের কাছে মনে হচ্ছিল ইতিবাচক একটা কিছু হওয়া খুব একটা দূরে নয়। সফর শেষ করে দেশে ফিরে গিয়ে চার সপ্তাহের মধ্যেই জানতে পারলাম ৩ রা ডিসেম্বর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন বলে ইন্ধিরা গান্ধী এক বেতার ভাষণ প্রচার করেছেন। উল্লেখ্য,এর  একদিন আগে পাকিস্তান ভারতের অমৃতসর আক্রমণ করে মূলত অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে। ভারত পাল্টা যুদ্ধ শুরু করার এই খবর শুনে আমরা প্রবাসীরা আনন্দে একেবারে রাস্তায় নেমে ভারতের প্রতি সমর্থন, কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাতে লাগলাম। সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নকেও সমর্থনের জন্য  অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাজ্য ন্যাপ ও বাংলাদেশ জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট যৌথভাবে লন্ডনের কনওয়ে হলে এক জনসভার আয়োজন করে এবং ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। পাকিস্তানি সামরিক চক্রের বাংলাদেশের জনগণের উপর নির্যাতন ও ঘৃন্য আচরণের জন্য তীব্র নিন্দা জানানো হয়।এই জনসভায় অন্যান্যদের মধ্যে লর্ড ফেনার ব্রকওয়ে বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তৃতায় লর্ড ব্রকওয়ে  বলেন, এই যুদ্ধের জন্য সোভিয়েত ব্যতীত অন্যান্য সকল বৃহত শক্তিগুলো দায়ী। পূর্ববঙ্গে সামরিক আক্রমণ চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করার পর প্রায় সকল বৃহত শক্তি নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তিনি আরো বলেন, ইচ্ছা করলে অনেক আগেই জনগণের রায়কে মেনে নিয়ে একটা গণতন্ত্র সম্মত সমাধান করার জন্য বৃহতশক্তিগুলো  পাকিস্তানকে বাধ্য করাতে পারতো।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম প্রহরেই এই জনসভাতে অনেক বিদেশী মিডিয়া উপস্থিত হয় এবং তারা জানতে চায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য আমরা স্বেচ্ছাসেবী সংগ্রহ করছি কি না। বিদেশী মিডিয়ার আগ্রহ দেখে ও প্রবাসী বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার নিশ্চিত আগ্রহের প্রমাণ স্বরূপ সভা থেকে ঘোষণা দেওয়া হল ‘অসহায় দেশবাসীর জন্য সাহায্যের জন্য আমরা স্বেচ্ছাসেবী সংগ্রহ করছি।এবং নিজেরাও অংশগ্রহণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।‘

এই খবর বিদেশী মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছিল। এদিকে মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারলো পাকিস্তানি সামরিক বাহিনির পরাজয় প্রায় নিশ্চিত। সুতরাং তড়িঘড়ি করে জাতিসংঘে ৪ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব  করলো। এ প্রস্তাব আমেরিকার তাবেদার গোষ্ঠী সমর্থন করলো। তবে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ভোট দিতে বিরত থাকলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রস্তাবের বিরোধিতা করে জোরালো অবস্থান নেয় এবং ভেটো প্রয়োগ করে। সোভিয়েত ভেটো প্রয়োগের ফলে আমেরিকার প্রস্তাব পাশ হতে বাঁধার সৃষ্টি হলো।চলবে