জিয়ার ফরমান উপড়ে ফেলা সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব ছিল

53

বিলেতবাংলা ডেস্ক, ৯ সেপ্টেম্বর:   আর্মি রুলস ভঙ্গকারী অবৈধ দখলদার রাষ্ট্রপতি’ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ‘বেয়নেটের খোঁচায় আনা’ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে সংবিধানের মূল কাঠামো পরিপন্থি বলেছেন বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল।

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কর্তৃক বিচারক অপসারণ প্রক্রিয়া সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে জিয়ার সামরিক ফরমান অগ্রাহ‌্য করার আইনগত দায়িত্ব পালনে তৎকালীন সুপ্রিম কোর্ট ব‌্যর্থ হয়েছিল বলেও মন্তব‌্য করেন তিনি।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা এক রিট আবেদনের শুনানির জন্য গঠিত তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চের তৃতীয় বিচারপতি আশরাফুল কামালের রায়টি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে।

এর আগে বেঞ্চের দুই জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের অংশ গত ১১ অগাস্ট প্রকাশিত হয়।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এই দুই বিচারকের দেওয়া ১৬৫ পৃষ্ঠার রায় ওই দিন সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে তোলা হয়েছিল। তৃতীয় বিচারকের রায় মিলিয়ে ২৯০ পৃষ্ঠা হল পূর্ণাঙ্গ রায়।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে হাই কোর্টের ওই রায়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করা হয়, যে সংশোধনী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার চার বছর আগে এনেছিল।

রায়ে দুই সহকর্মীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিচারপতি আশরাফুল কামাল বলেন, “এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বেয়নেটের খোঁচায় আর্মি রুলস ভঙ্গকারী অবৈধ দখলদার রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের একক ইচ্ছায় প্রণীত ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ সংবলিত ৯৬ অনুচ্ছেদটি সংবিধান এবং আপিল বিভাগের রায়ের পরিপন্থি।

“(এটা) জাতির জনকের নেতৃত্বে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির বিজ্ঞ সদস্যবৃন্দ এবং গণপরিষদের ৪০৩ জন সদস্যবৃন্দের কর্ম, আদর্শকে অবমূল্যায়নের শামিল, তথা সংবিধানের প্রস্তাবনার পরিপন্থি, সংবিধানের পরিপন্থি তথা বাতিল আইন।”

রায়ে তিনি বলেন, সংসদ কর্তৃক বিচারক অপসারণ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারতসহ উন্নত দেশগুলোতে রয়েছে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রয়েছে কেবল পাকিস্তানে।

>> ১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়।

>> পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়।

>> এই ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছিল।

এই সংশোধনীর বৈধতা চ‌্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর হাই কোর্টে রিট আবেদন হয়। গত ৫ মে রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে ওই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

বিচারপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের রায়ে বলা হয়, “এটা সংবিধানের দুটি মূল কাঠামো ৯৪(৪)ও ১৪৭(২) অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন। একইসঙ্গে সংবিধানের ৭(বি) অনুচ্ছেদকেও আঘাত করে।”

সংবিধানের ৭ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস‌্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে৷

৯৪ (৪) অনুচ্ছেদে রয়েছে- এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।

আলাদা রায়ে বিচারপতি আশরাফুল কামাল লিখেছেন, “দখলদার রাষ্ট্রপতি জিয়ার একক খেয়াল খুশিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কর্তৃক বিচারক অপসারণ প্রক্রিয়া সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্তকরণের সামরিক ফরমান উপড়ে ফেলা তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের আইনগত দায়িত্ব ছিল, যা আমাদের তৎকালীন সুপ্রিম কোর্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে।

“আমাদের সুপ্রিম কোর্টকে সেই লজ্জা তথা কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছেন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, ২০০৫ সালে তার পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের মাধ্যমে।”

“পরে প্রধান বিচারপতি মো. তাফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে আমাদের আপিল বিভাগ রায়ে কফিনের শেষ পেরেকটি ঠুকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংবলিত ৯৬ অনুচ্ছেদ কবরস্থ করেন।”

এই বিচারপতি রায়ে লিখেছেন, “দরখাস্তকারী প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, এই আইনটি সংবিধানের বিধানাবলীর সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথা অসাংবিধানিক।

“আমাদের সংবিধান লিখিত এবং প্রায় অপরিবর্তনীয়। কেবল একান্তভাবে অপরিহার্য হলে সংবিধানের প্রস্তাবনা, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে এবং এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং মৌলিক অধিকারসমূহকে ন‌্যূনতম বা বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত না করে সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে।

“আমার মতামত হলো, জাতীয় সংসদ সংবিধানসম্মতভাবে সংবিধান আইন-২০১৪ প্রণয়ন করেছেন। সংসদ কর্তৃক বিচারপতি অপসারণ প্রক্রিয়া সম্বলিত ৯৬ অনুচ্ছেদটি বিদ্যমান থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত থাকবে।”

রায়ে তিনি অভিজ্ঞ বিচারকের সঙ্কটের কারণে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়স ৬৭ থেকে ৭৫ বছরে উন্নীত করার সুপারিশ করেন।