উত্তরাঞ্চলের পর দৃষ্টি এবার সিলেটে

58

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার ঘটনার প্রধান আসামি মঈনুল ইসলাম ওরফে সিফাত ওরফে শামীমকে গত ২৪ আগস্ট টঙ্গী থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্য সিফাত আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে সে জানায়, তাদের ‘বড় ভাই’ মেজর (অব.) সৈয়দ জিয়াউল হক। এবিটিতে সে সাগর নামে পরিচিত। জিয়ার গ্রামের বাড়ি সিলেটের মৌলভীবাজারে। সিফাতের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিলেট থেকে ডিবি পুলিশ অন্তত আট এবিটি সদস্যকে গ্রেফতার করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন সময় দেশের উত্তরাঞ্চলে উগ্রপন্থিদের তৎপরতা দেখা গেলেও পিছিয়ে নেই সিলেটও। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনায় জঙ্গিদের আস্তানা ও মদদদাতাদের গোপন তৎপরতা সিলেটকেন্দ্রিক ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আর এর নেপথ্যে রয়েছে পুরস্কার ঘোষিত জঙ্গি এবিটির শীর্ষ নেতা জিয়া। একাধারে জিয়া সিলেটের বাসিন্দা এবং পড়াশোনাও করেছে সিলেটকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। জিয়ার বাড়ি মৌলভীবাজারে হওয়ায় গোপনে তার মাধ্যমেও অনেকে উগ্রপন্থায় জড়াচ্ছে। সিলেটে দীর্ঘদিন অবস্থান করায় সেখানে তার বড় ধরনের নেটওয়ার্ক ছিল। এ ছাড়া নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর গ্রামের বাড়িও সিলেটে। এমনকি সম্প্রতি রাজধানীর পাইকপাড়ায় পুলিশের অভিযানে নিহত মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম সিলেট থেকেই উগ্রপন্থায় জড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে। সব মিলিয়ে উত্তরাঞ্চলের পর জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধে গোয়েন্দাদের দৃষ্টি এখন সিলেটেও।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) চার ও নগরীর বেসরকারি লিডিং ইউনিভার্সিটির তিন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের অভিযানে আটককৃতদের মধ্যে শাবি শাখা এবিটির সমন্বয়ক আবদুল আজিজও রয়েছে। গুলশান হামলার পর গত ১৮ জুলাই শাবি ক্যাম্পাস থেকে সর্বপ্রথম ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবদুল আজিজকে আটক করা হয়। একই দিন লিডিং ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিভাগের শেষ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাহবুবুল করিম চৌধুরীকে আটক করা হয়। আবদুল আজিজকে আটকের পর গত ২ আগস্ট শাবির ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ইফাহ আহমেদ চৌধুরী নাহিদ আটক হয়। আজিজ ও নাহিদ ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ৩ আগস্ট একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জুয়েল আহমদ ও ১৮ আগস্ট কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাদমান আবেদীনকে আটক করেন গোয়েন্দারা। ২৫ আগস্ট জঙ্গি সন্দেহে শাবির দুই ছাত্রকে আটক করে র‌্যাব। লিডিং ইউনিভার্সিটির মাহবুবুল করিম চৌধুরীকে আটকের পর আইন বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী মো. মাহবুব ইকবাল মুন্না ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মামুন হুসাইনকে আটক করে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট। এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সিলেটের আম্বরখানায় অভিযান চালিয়ে মেহেদী হাসান রাফি নামে একজনকে আটক করে পুলিশ। চলতি বছর রাজধানীর বাড্ডায় জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালাতে গেলে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে জঙ্গিরা। ওই হামলায় রাফি সম্পৃক্ত ছিল বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছর সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ইকবালকে আটক করে পুলিশ। এর আগে সিলেট থেকে হিবজু নামে এক উগ্রপন্থিকে গ্রেফতার করা হয়। সে স্থানীয় একটি আয়ুর্বেদিক কলেজের শিক্ষার্থী ছিল।

পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সিলেট এলাকায় এবিটির বেশ কিছু সক্রিয় কর্মী রয়েছে। তাদের অনেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যারা এবিটির সদস্যদের ‘মগজধোলাই’ করছে। তাদের ব্যাপারেও গোয়েন্দারা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছেন। সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সম্প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান গোয়েন্দারা। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীকে এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের ব্যাপারেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সিলেটকেন্দ্রিক অনেক উগ্রপন্থি পারিবারিকভাবে সিলেটের বাসিন্দা। আবার অনেকে সেখানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করতে গিয়ে উগ্রপন্থায় জড়িয়েছে। সিলেটকেন্দ্রিক যেসব উগ্রপন্থি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে তারা যাতে দেশ ছাড়তে না পারে এ ব্যাপারেও সতর্ক গোয়েন্দারা।