ইউ-টার্ন কেন?

59

নাদীম কাদির

আমি সত্যের জয়ে আনন্দিত হই, যদিও বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে অনুমোদন দেয়ার দরকার নেই। কারণ বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুকে বহু আগেই সেই স্থান দিয়ে রেখেছে।

তারপরও যখন কোনো বৃহৎ শক্তি নতুন করে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ নিয়ে নতুন ধারায় অবতীর্ণ হয়, তখন ভাবতেই হয় কেনো এই ইউ-টার্ন! মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তার ৯ ঘণ্টার সফরে বাংলাদেশের সবাইকে তাক লাগিয়ে চলে গেলেন।

উনি প্রথমেই গেলেন জাতির জনকের স্মৃতিজড়িত বাস ভবন ৩২ নম্বর-এ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ‘বঙ্গবন্ধু ভবন’-এ। পুস্পস্তবক অর্পণ করলেন জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে। এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা উচ্চ পর্যায়ের কেউ এই শ্রদ্ধা জানালেন। প্রশংসা করলেন বঙ্গবন্ধু ও তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার।

অতিথি জাদুঘরে রাখা দর্শনার্থীদের অভিমত খাতায়ও লিখলেন, ‘যে দেশ বাংলাদেশের জন্মের বিরুদ্ধে ছিল আজ কেনো ৪৫ বছর পর এই ইউ-টার্ন। আমি খুব খুশি বঙ্গবন্ধু তার প্রাপ্য সম্মান পেলেন আর তা ছিনিয়ে আনলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কেনো বললাম ছিনিয়ে আনলেন? কারণ আমার মতে তার নেতৃত্ব বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র বসে তা দেখেছে।’

জন কেরি ইএমকে সেন্টারে যা বললেন, তার কিছুটা বলা প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, ‘…আমি আপনাদের জানাতে চাই, বাংলাদেশের অগ্রগতিতে শরিক হতে পেরে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট গর্ববোধ করে। স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার তিনটি প্রধান উন্নয়ন উদ্যোগের বিষয়। আমরা বাংলাদেশকে স্বাগত জানাই। কেননা, তারাও এসব উদ্যোগে অংশ নিয়েছে।

কখনো কখনো কেউ কেউ আমাদের সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন অনুভব করেছেন। যেটা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। তবে আমি গর্বিত যে সিনেটর টেড কেনেডিই বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সমর্থন জানানো একমাত্র মার্কিন নন। ১৯৭১ সালে আমি তরুণ ছিলাম। তখন কেবল ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে ফিরেছি। আমরা সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থক ছিলাম। ম্যাসাচুসেটস বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের পক্ষে ছিল। আমি এ জন্য গর্ব বোধ করি।

সবাই জানি, এখন একটা ভিন্ন এবং বেশ কঠিন সময় পার করছি আমরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ বাংলাদেশ। এটি জনবহুল একটি দেশ। দেশের উপকূলীয় নিচু অঞ্চল ভয়াবহ ঝড়ের মুখে পড়ে। এসব বাংলাদেশকে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর শীর্ষে রেখেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ তাদের আবাস হারাতে পারে।

আর এসবের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং আমি আমাদের স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছি। উপকূলীয় এলাকার সম্পদের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ বাংলাদেশি মানুষের সহযোগিতায় জলবায়ু সহিষ্ণুতা সৃষ্টি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির নানা প্রকল্পে সহায়তা, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে আমরা এসব কাজ করে যাচ্ছি।

আপনারা সবাই জানেন, জলবায়ু পরিবর্তন রোধের ক্ষেত্রে কোনো গোপন বিষয় নেই। এটা সুনির্দিষ্ট। এটা জ্বালানি নীতির বিষয়। আপনারা যদি জ্বালানি নীতি ঠিক করতে পারেন, তবে আপনি জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। আজই প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর (এ এইচ মাহমুদ আলী) সঙ্গে বৈঠকে মন্ট্রিল প্রটোকলের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছি।

হাইড্রোফ্লুরো কার্বনের থেকে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। আর শুধু এ থেকেই আমরা পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি আধা ডিগ্রি সেলসিয়াস কমাতে পারি। কাজেই এ বিষয়ে করার অনেক কিছুই আছে। এই পরিবর্তনের জন্য যেসব দেশ লড়াই করছে, বাংলাদেশের তার শীর্ষে থাকা প্রয়োজন এবং আমরা তা চাই।

আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সর্বতোভাবে সহায়তা করবে; অতীতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা যেমনটা বাংলাদেশের পাশে থেকেছি।’

একদিন চীন, রাশিয়া, ভারত আর জাপান এই যাত্রার সহযোগী হয়ে দ্বিপাক্ষিকভাবে লাভবান হয়েছে। হচ্ছে পদ্মা সেতু, হচ্ছে রাস্তা, হচ্ছে রেলপথ, হচ্ছে নতুন বিমানবন্দর।

বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন পরিগণিত হচ্ছে উন্নয়নের অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে। বাংলাদেশ একদিকে ডিজিটাল হবে আর আমেরিকা শুধু বসে বসে দেখবে? তাই আজ শেখ হাসিনা’র বাংলাদেশে অন্যরকম আয়োজন নিয়ে আসলেন জন কেরি। ৪৫ বছর পরে হলেও তাদের মানতে হল, বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি আর তার কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের যোগ্য নেত্রী। তার সাথে বুঝে চলতে হবে।

আর একটি বড় অর্জন হল যে, আমরা আইএস বা জঙ্গিবাদ দেশে নেই বলেছি। মোটামুটি কেরি এই সুরেই কথা বলেছেন। তিনি বললেন, জঙ্গিরা এই দেশেরই। যা ছিল বাংলাদেশের দাবি। আমরা বলেছি জঙ্গিরা আইএস’এর সমর্থক। তিনিও বললেন তাই। কিন্তু একটু যোগ করলেন যে বাংলাদেশের জঙ্গিদের সাথে ওদের (আইএস’এর) যোগাযোগ ছিল বা আছে।

কিন্তু আশার কথা যে, যুক্তরাষ্ট্র আরো জোরালোভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নিয়ে কাজ করবে। কারণ তারা এখন বিশ্বাস করে শেখ হাসিনা যা বলেন তাই করেন। জঙ্গিবাদের ব্যাপারে তিনি জিরো টলারেন্স দেখিয়েছেন।

যুদ্ধ অপরাধীর ব্যাপারে কোনো টু শব্দ না করা একটি বড় ইউ-টার্ন। আমরা তাদেরকে বুঝাতে পেরেছি যাদের ফাঁসি হয়েছে বা হবে তারা তারই যোগ্য। খুনি আর ধর্ষণকারী রাজাকার, যাদের এদেশে ঠাঁই নাই। তারা আমাদের কোর্টের ব্যাপারে যা বলেছিল তা আস্তে করে চেপে গেলেন। কারণ আদালত সবচেয়ে ন্যায় বিচার করেই ফাঁসি দিচ্ছে নিজামীগংদের।

শেষ কথা হল যে, আমার মতে তারা তাদের কেনেডির বাংলাদেশ প্রীতি মনে করেই বলতে চেয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ বিরোধী ছিল না। তাই ঢাকার উচিত তাদের নতুন বন্ধুত্বের হাতকে সাড়া দেওয়া এবং সুযোগ দেওয়া।

মাথা নত না করে জাতি আজ বিশ্বের দরবারে প্রমাণ করেছে তারা সত্যের জন্য কোনো অন্যায় দাবি মানবে না। সে যত বড় শক্তি হোক না কেন! কারণ অনেকে বিরোধীতা করলেও আমি বলবো আজ বাংলাদেশ সঠিক নেতৃত্ব পেয়ে সামনের জায়গায় আসছে।

আমাদের এই অর্জন ধরে রাখতে হবে এবং আরো সামনে যেতে হবে!

নাদীম কাদির : সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার।

nadeemqaadir1960@gmail.com