খালেদার হাতে সময় আছে বড়জোর নয় মাস: জাফরুল্লাহ

50

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার হাতে বড়জোর নয় মাস সময় আছে। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় ‘রাজনীতির আলোকে’ বিচারের রায় হবে। এই কয়েক মাস খালেদা জিয়া পরিশ্রম করলে রায় তাঁর পক্ষে যেতে পারে।

বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিচিত জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির চেয়ারপারসনের উদ্দেশে লেখা এক খোলা চিঠিতে এসব কথা বলেছেন। এবার ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন না করায় খালেদা জিয়াকে সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি তাঁর কিছু ‘ভুল’ কাজের সমালোচনাও করেছেন জাফরুল্লাহ। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন হাজার শব্দের ওই চিঠিতে তিনি খালেদা জিয়াকে জামায়াতের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, দলে গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র চর্চা করা, উপদেষ্টা পরিষদে বিশিষ্টজনদের কোঅপ্ট করা, ড. কামাল হোসেনের দলসহ কয়েকটি দলকে নিয়ে একসঙ্গে জনসভার ঘোষণা দেওয়ার পরামর্শ দেন। এর বাইরে খালেদা জিয়ার আরও কিছু ‘করণীয়’ও তুলে ধরেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

আপনার হাতে বেশি সময় নেই

চিঠিতে জাফরুল্লাহ চৌধুরী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘২০ দলের বাইরের বিরোধী দলসমূহকে একত্র করে বাংলাদেশে জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সুসংহত করার জন্য আপনার হাতে সময় আছে বড়জোর নয় মাস। সম্ভবত এই সময়ের মধ্যে আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় রাজনীতির আলোকে বিচারের রায় বেরোবে। এই কয়েক মাস পরিশ্রম করলে জনগণের রায় আপনার পক্ষে আসার সম্ভাবনা সমধিক।’

তারেক রহমানের সাজার বিষয়টি উল্লেখ করে জাফরুল্লাহ লিখেছেন, ‘এটা কি সুষ্ঠু বিচারের রায় না রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? এর ফয়সালা ছাত্রদলের ২০-৩০ জনের মিছিলে হবে না, এতে কেবল আপনাদের শক্তির অপচয় এবং ভুল কাজ। ফয়সালা হবে মূলত সুষ্ঠু গণতন্ত্রের আন্দোলনে এবং উচ্চ আদালতে।’

কর্মীদের সাক্ষাৎ দিন

খালেদা জিয়াকে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়ে জাফরুল্লাহ লিখেছেন, ‘ভবিষ্যৎ আন্দোলনের স্বার্থে নিয়মিতভাবে সকাল ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত আপনার বাড়িতে তৃণমূল কর্মীদের সাক্ষাৎ দিন। কর্মীদের দেখভাল করার জন্য একজন ৫০ অনূর্ধ্ব উচ্চশিক্ষিত, রাজনীতির ভাষা ও শিষ্টাচারের সঙ্গে পরিচিত কিন্তু খয়ের খাঁ নয়, এরূপ একজন নারী বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। তার বিশেষ দায়িত্ব হবে বিভিন্ন কমিটির কার্যকলাপের সারসংক্ষেপ এবং অন্তত ১০টি দৈনিক পত্রিকার মুখ্য সংবাদগুলো নিয়ে আপনার সঙ্গে প্রতিদিন আলোচনা করা। আপনার রাতের গুলশান অফিসের সময় সন্ধ্যায় করলে ভালো হবে।’

খালেদা জিয়াকে প্রতি মাসে অন্তত দুটি জেলায় জনসভা করার পরামর্শ দিয়েছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এসব জনসভায় সরকারের দুর্নীতি ও আর্থিক খাতে লুটপাট, সীমান্ত হত্যা, ট্রানজিট ফি, ভারতের সঙ্গে পানির হিস্যা ইত্যাদিকে মূল প্রতিপাদ্য করার পরামর্শ দেন। তিনি লিখেছেন, ‘একই তথ্য বিশেষত ভারতের অনৈতিক কার্যকলাপের কথা বারবার বলতে হবে।… জনসভায় শক্তভাবে এসব তথ্য উপস্থাপন করুন, ভারত সরকারের চিন্তায় পরিবর্তন আসতে বাধ্য।’

আপনি জিতেছেন

এবার জন্মদিন পালন না করায় খালেদা জিয়াকে সাধুবাদ জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, ‘দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে ১৫ আগস্ট আপনার জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠান বাতিল করে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কী মন্তব্য করেছেন, তাতে কিছু যায়-আসে না। আপনি জিতেছেন।’

কিছু ভুল করছেন

জাফরুল্লাহ লিখেছেন, ‘৩৮ বছরের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের সাড়ে চার মাস পরে জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা, কমিটির বড় সাইজ বা ক্রমানুসারে বয়োজ্যেষ্ঠদের হিসাব না মানা কিংবা পর্যাপ্ত নারী নেত্রীর স্থান না হওয়া অথবা নবীন তরুণদের সংখ্যাধিক্য ভুল কাজ নয়। ভুলটা হয়েছে অন্য জায়গায়। আপনার দলের কিছু চাটুকার দায়িত্ব পালনে অনিচ্ছুক, সরকারের দমননীতিতে ভীত-সন্ত্রস্ত সিনিয়র নেতৃবৃন্দ যারা সম্ভবত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর তৈল-এর প্রাসঙ্গিকতা ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করে দলের মহাসচিব থেকে শুরু করে পুরো জাতীয় কমিটির মনোনয়নের দায়িত্ব আপনার ওপর চাপিয়ে দিয়ে আপনাকে আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাস ও সম্মান প্রদর্শন মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা তাদের দলের প্রতি আনুগত্যের অভাব ও দায়িত্ব এড়ানোর প্রচেষ্টামাত্র এবং আপনাকে সবার চোখে আপনার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণেরÿসূক্ষ্ম প্রক্রিয়া।’

জাফরুল্লাহ আরও লিখেছেন, ‘আমার মনে হয়, দীর্ঘদিন আপনি বিএনপির গঠনতন্ত্র পড়েননি এবং আপনার মনোনীত নির্বাহী কমিটির সদস্যদের অধিকাংশও পড়েননি। আপনার স্থায়ী কমিটির নেতাদের উচিত ছিল আপনাকে অযথা তেল না দিয়ে, গঠনতন্ত্রের নির্ধারিত বিষয়সমূহ আপনার সামনে তুলে ধরা এবং গঠনতন্ত্র মোতাবেক আপনার ক্ষমতা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য দেওয়া।’

জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদকে খালেদা জিয়ার প্রধান উপদেষ্টা করলে বিএনপি লাভবান হবে এবং দেশবাসীর প্রশংসা পাবেন।

বিশিষ্টজনদের কো-অপ্ট

জাফরুল্লাহ লিখেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বিষয়, বিশেষত ভারতীয় আগ্রাসন, অনুপ্রবেশ, একাধিক ট্রানজিট ও বাংলাদেশের সঙ্গে সিকিম-ভুটানতুল্য ব্যবহার পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ বিষয়ে দলের (বিএনপি) সদস্য নয় অথচ বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শী, যোগ্যতাসম্পন্ন ও সুদক্ষ ব্যক্তিদের কোঅপ্ট করার বিধান আছে। এসব বিষয়ে অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক আহমেদ কামাল, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক ফেরদৌস আজিম, উপাচার্য পারভীন হাসান, নারী প‌ক্ষের শিরীন হক, সুজনের বদিউল আলম মজুমদার, হাফিজ উদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক আইনুন নিশাত, অধ্যাপক এম আর খান, বারডেমের ডা. এ কে আজাদ খান, আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস এ খান, অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক, বিআইডিএসের বিনায়ক সেন, প্রাক্তন আমলা আলী ইমাম মজুমদার, সাদত হোসেন, শওকত আলী, আলী আকবর খান প্রভৃতি বিশিষ্টজনকে কমিটিসমূহে কোঅপ্ট করলে কমিটির কাজের গুরুত্ব বাড়বে এবং বিএনপি জ্ঞানসমৃদ্ধ হবে ও ভবিষ্যতে দেশ শাসনে আপনার সুবিধা হবে।’

কূপমণ্ডূকতা পরিহার করুন

খালেদা জিয়ার উদ্দেশে জাফরুল্লাহ লিখেছেন, ‘অনুগ্রহ করে কূপমণ্ডূকতা পরিহার করুন। আপনি সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন, আপনার গঠনতন্ত্রের নির্দেশ মোতাবেক ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও মহানগর কমিটিসমূহ, নারী দল, ছাত্রদল ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠন দুই বছর পরপর যথাযথভাবে নির্বাচন করে উৎসাহী কর্মীদের বিভিন্ন পদে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে। পার্টির অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভিত না নিলে জাতির জন্য গণতান্ত্রিক সুবিধা প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। ঘরকুনো কর্মীরা সন্ধ্যায় আপনার গুলশান অফিসে ভিড় করবে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আপনার ডাকে মাঠে নামবে না। এরা সুখের পায়রা এবং কতক বয়োবৃদ্ধ। তারা তাদের পরিজনকে জাতীয় কমিটিতে অঙ্গীভূত করার কাজে বেশি ব্যাপৃত থাকবেন, যেমন ঘটেছে ২০১৬ সালের আপনার জাতীয় কমিটির ক্ষেত্রে। যত দিন গয়েশ্বর-নিতাই তাদের মেয়েদের কমিটিতে ঢোকাতে ব্যস্ত থাকবেন, তত দিন সংখ্যালঘু রাজনৈতিক কর্মীরা বিএনপিতে ভিড়তে উৎসাহী হবেন না।’

বিএনপির জাতীয় কমিটিতে পরিবারতন্ত্র জিন্দাবাদ

বিএনপি জাতীয় কমিটিতে পরিবারতন্ত্র জিন্দাবাদ—১০ নেতার স্ত্রী, ১১ নেতার ছেলে, ৬ ভাইবোন স্থান পেয়েছেন অথচ শিষ্টাচার বজায় রেখে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আপনি ছেলের বউকে জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে স্থান দেননি। স্থায়ী কমিটিতে কমপক্ষে চারজন নারী অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। চার-ছয় কোটি মানুষের প্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসংখ্যা গঠনতন্ত্র সংশোধন করে প্রয়োজনে ২৫ জন করলে আপত্তি কোথায়? সদস্যরা পার্টির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ভিত্তিতে দু-তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন, মনোনীত নন। চেয়ারম্যানের মনোনয়নে আসবেন তিন-চারজন মাত্র।

জাতীয় কমিটিতে ’৭১ যুদ্ধাপরাধী আবদুল আলীম ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্থান অযৌক্তিক ও ভুল সিদ্ধান্ত। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে তো কোনো দলীয় রাজনীতিতে নেই।

তারেক আপনার স্থান নেওয়ার চেষ্টা করুক

জাফরুল্লাহ লিখেছেন, ‘আজকে আপনি জিয়াউর রহমানের সুন্দরী বালিকা বধূ নন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আপনার পরিশ্রম ও ধীশক্তির বলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দু-দুবার নির্বাচনে জয়ী করিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, চার-ছয় কোটি বাংলাদেশের মানুষ আপনার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তাদের প্রতি আপনার দায়িত্ব আছে, দায়িত্ব আছে ভালোভাবে তারেককে দেশে ফিরিয়ে এনে আপনার ন্যায় নিজ গুণে এবং সততা ও পরিশ্রমে বলীয়ান হয়ে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আপনার স্থানটা নেওয়ার চেষ্টা করুক সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, দুর্নীতি ও গুন্ডামির মাধ্যমে নয়, জিয়াউর রহমানের ন্যায় সততার ভিত্তিতে।’

পার্টিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুন

জাফরুল্লাহ লিখেছেন, ‘পার্টিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুন। এতে পার্টির সর্বস্তরে নতুন জাগরণ সৃষ্টি হবে। তারা দেশের জন্য জীবন দিতে পিছপা হবে না। যদি পার্টি তাদের পরিবারের দায়িত্ব নেয়। জেলে থাকা কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে অনুগ্রহ করে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন। জেল থেকে বেরোলে অবশ্য তাদের আপনার অফিসে ডেকে এনে আলাপ করবেন, সাহস দেবেন।’

জামায়াত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিন

জাফরুল্লাহ খালেদা জিয়ার উদ্দেশে লিখেছেন, ‘বুঝে সুজে সবার সঙ্গে আলাপ করে জামায়াত সম্পর্কে দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নিন। দেশবাসীর কাছে তাদের পুনরায়ÿক্ষমা চাইতে হবে। অধ্যাপক গোলাম আজম প্রদর্শিত ১৯৯১ সালে একক তৃতীয় ধারার রাজনীতি হতে পারে জামায়াতের জন্য মঙ্গলকর কূটকৌশল।’ খালেদা জিয়ার প্রতি তাঁর পরামর্শ, ‘অচিরেই জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে সম্মিলিত বিরোধী দল হিসেবে অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষায় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বাসদের খালেকুজ্জামান, জাসদের আ স ম আবদুর রব প্রমুখকে সঙ্গে নিয়ে এক মাসের মধ্যে প্রথম জনসভায় অংশগ্রহণের ঘোষণা দিন। বিএনপির বর্তমান জোটের নেতারা তো থাকছেনই, আপনি জেলে থাকলেও সম্মিলিত বিরোধী দলের বিজয় সুনিশ্চিত। জয় হোক সুষ্ঠু জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের। পতন হবে প্রতারণার উন্নয়ন ও সরকারের মেগা দুর্নীতির।