‘তৃতীয়বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ ’ ২৬ – : মাহমুদ এ রউফ

152

বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনীতিক,কমিউনিটি নেতা মাহমুদ এ রউফ দেশে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিতে যুক্তছিলেন। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের  সক্রিয়  কর্মী ও ছাত্রনেতা। সিলেটের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মদনমোহন  কলেজের শিক্ষার্থী  ছিলেন ষাটের দশকের গোড়ার দিকে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে লন্ডনে আসেন ষাটের দশকের  শেষার্ধে। জড়িয়ে পড়েন বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিলেত হয়ে ওঠে তৃতীয় রণক্ষেত্র। মাহমুদ এ রউফ বিলেতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সংঘটিত আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন প্রথম সারির নেতা। তাঁর  লেখনিতে উঠে আসছে  ‘তৃতীয় বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ‘।

বিলেতবাংলা২৪.কম ধারাবাহিক প্রকাশ করছে বিলেতে বাঙালির প্রত্যয়দীপ্ত এই আগুনঝরা দিনের ইতিহাস। প্রতি সপ্তাহে  থাকছে ‘তৃতীয়বাংলায়  মুক্তিযুদ্ধ ‘।-নির্বাহী সম্পাদক।

 কিস্তি ২৬

যুক্তরাজ্য ন্যাপ গঠন

একই সময় অক্টোবর মাসে ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদও জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের জন্য লন্ডনে যাত্রাবিরতি করেন। তিনি স্থানীয় ন্যাপকর্মীদের সাথে কয়েকদফা মিলিত হয়ে যুক্তরাজ্যে ন্যাপকর্মীদের কাজকর্ম সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করেন। সেই সাথে এখানে ন্যাপের  শাখা গঠন সম্পর্কে জানার  জন্য খবরাখবর নেন। ন্যাপ কর্মীরা অত্যন্ত উতসাহ সহকারে ন্যাপ প্রধানকে অনুরোধ করে ন্যাপের শাখা গঠন করলে সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কর্মীদের সংঘবদ্ধ করা খুবই সহজ হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের  পক্ষে তাদের সংঘবদ্ধভাবে কাজ করা খুবই শক্তিশালি হবে।কর্মীদের কাছ থেকে এতোসব উতসাহজনক অনুরোধ দেখে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ যুক্তরাজ্যে ন্যাপের শাখা গঠনের জন্য রাজি হলেন। পার্টি প্রধানের অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কর্মীরা খুব উতসাহ সহকারে সাংগঠনিক কাজে নেমে গেলেন। অতি অল্পদিনের মধ্যেই শাখা গঠনের কাজে তারা সফল হন। ৭ নভেম্বর ১৯৭১ সালে  পশ্চিম লন্ডনের কনওয়ে হলে এক সাধারণ সভার আয়োজন হলো।এ সভায় যুক্তরাজ্য ন্যাপের কমিটি ঘোষণা দেয়া হয়। এই উপলক্ষে প্রকাশিত প্রচারপত্র ও কমিটির তালিকা তুলে ধরা হলো।

“যুক্তরাজ্য ন্যাপ:

সর্বস্তরে ঐক্য করুন,বিজয়কে নিকটবর্তী করুন:-

প্রিয় বাঙালি ভাইবোনেরা,

সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজিবাদের শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা কায়েম করা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির অন্যতম কর্মীসূচী। একচেটিয়া পুঁজিপতি তথা বড় বড় মিল মালিকদের দ্বারা দরিদ্র শ্রমিকদের শোষণ বা বড় বড় জোতদারদের  দ্বারা নিরীহ কৃষকদের শোষণের বিরুদ্ধে ন্যাপ জন্মাবধি সংগ্রাম করে আসছে। চির শত্রু মার্কিনী সা¤্রাজ্যবাদ, যারা পৃথিবীর সকল অনুন্নত দেশকেই তাদের শোষণের জালে আটকাতে চায়, এই শত্রুর বিরুদ্ধেও নিরলস সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে ন্যাপ।

বাংলাদেশের বীর মুক্তিবাহিনি যখন দেশকে এহিয়ার দশ্যু বাহিনির কবল থেকে মুক্ত করার পথে, ঠিক এই সময়ই মার্কিন সামাজ্যবাদীরা তাদের বড় তাবেদার এহিয়াকে দিয়ে ভারত আক্রমণ করার চক্রান্ত করছে।উদ্দেশ্য হলো,যাতে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম দুনিয়ার মানুষের কাছে চাপা পড়ে যায় এবং সমস্যাটা দাঁড়ায় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়ে। ফলে বাংলাদেশ থাকবে পাকিস্তানে। মার্কিনী শোষণ চলবে পুরোদমে। কিন্তু বাঙালি আজ জাগ্রত। তাই দল, মত, জাতি,ধর্ম নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে এই ‘ঘৃণ্য‘চক্রান্তকে ব্যর্থ করতে হবে।

অবশ্য বন্ধু দুই রাষ্ট্র ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার শান্তি,মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তির ফলে আমেরিকার এই ঘৃণ্য চক্রান্ত কিছুটা দমে গেছে।

এই চক্রান্তকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করতে হলে আমাদের মুক্তি সংগ্রামকে আরও বহুগুণে জোরদার করতে হবে। মুক্তি সংগ্রামকে জোরদার করতে হলে আমাদের সম্ভব সকল শক্তি নিয়োগ করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সব রকমের সাহায্যের  ব্যবস্থা করতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে, দলীয় সর্বপ্রকার সংকীর্ণতা ত্যাগ করে সকল বাঙালিকে দেশ মাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

মাতৃভূমির স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবাসী ন্যাপকর্মীদের সংঘবদ্ধ ও সুর্শঙ্খলভাবে কাজ করার জন্য দলীয় প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের অনুমিক্রমে খুব জরুরি অবস্থায় যুক্তরাজ্যে নির্বাচনের  মাধ্যমে ন্যাপের শাখা গঠন করা হয়। চলতি বছরের ৭ নভেম্বর লন্ডনের কনওয়ে হলে যুক্তরাজ্য ন্যাপ কর্মীদের উপস্থিতিতে ডা.নুরুল আলমের সভাপতিত্বে এই নির্বাচনী সভা অনুষ্ঠিত হয়। চলবে।