রবিদের দুঃখ কে দেখে ?

47

। নাদীম কাদির ।

আমার বেশ কতগুলো ভক্ত আছে যাদের আমি আমার ‘বাচ্চা’ বলি। না আমি ওদের ভক্ত। ওরা সবাই মহৎ। পরিস্কার মন আর জীবন যুদ্ধ লড়ে চলছে। আমার বাবাহারা জীবনের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয় ওরা।

কারো হঠাৎ করে পরীক্ষা দেওয়ার ফি বা অসুস্থ মার চিকিৎসার পয়সা জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। আমার কাছে ওরা আসে তখন। সাহস দেই, সাহস যোগায়। নিজের জীবনের গল্প বলি। একটা কথা বলি, বার বার যত যাই হোক নিজের উপর বিশ্বাস হারাবে না। অধ্যাবসায়ী ও সৎ থাকতে হবে। জীবন যুদ্ধ আমাদের অনেকের জন্য কঠিন। তারপরও জিততে হবে।

এই কথাগুলো অনুসরণ করে রবি। সেদিন হঠাৎ ফেসবুকে বলল সে কথা বলতে চায়। আমি রাজি। মেসেঞ্জারে ফোন করে বললো, ওর মন খুবই খারাপ এবং ও চিন্তিত ভবিষ্যৎ নিয়ে। বাবা নাই। যা টাকা ছিলো তা দিয়ে কদিন আগে একমাত্র বোনের বিয়ে দিয়েছে। পড়াশুনা আর ঢাকা শহরে থাকা-খাওয়ার খরচতো আছেই।

বললাম,কি হয়েছে ?

রবি বললো ‘ভাইয়া’ রেস্টুরেন্টে ক্লাইন্ট নাই বললেই চলে, আবার রাজউক রেস্টুরেন্ট ভেঙ্গে ফেলতে চায়। কোনো মতে আর তিন মাস টিকে থাকতে পারি। কিন্তু তারপর? আমি কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না, এমনকি চাকরির বাজার মন্দা। গ্র্যাজুয়েশন ছাড়া তো কিছুই হবে না। কাকে বলবো? কে চাকরি দিবে? চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে লাভ নাই খুব একটা। কারণ মামা-চাচার দৌরাত্ম্য রয়েছে।

রাজউক কি রবির মতো যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রবির মতো যারা অনিশ্চয়তায় পড়ছে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করবে?

এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠা ঢাকা শহর মাঝে মাঝে বুল-ড্রোজারের দানবীয় চেহারা দেখে। যাদের পয়সা আছে, তারা রেস্টুরেন্ট বা দোকান খুলে মোটামুটি মূল বিনিয়োগ উঠিয়ে নেন। কিন্তু যারা কর্মচারি, তাদের কি হবে? কেনো এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ধানমন্ডি, গুলশান আর বারিধারার অনুমতি পেলো? আর বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসা এবং ভ্যাট দিয়ে আসছে, এটা তাহলে কিভাবে অবৈধ ?

সন্ত্রাস মোকাবেলা করতে গিয়ে হোটেল-রেস্টুরেন্ট ভেঙে ফেলা হঠাৎ করে অমানবিক। আমার বাচ্চা রবির মতো আরো অনেকে আছে। ওদের কি দোষ? ওদের ক্ষমতা নাই বলে যে জীবন যুদ্ধে হেরে যেতে হবে? তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার অধিকার রাজউককে কে দিয়েছে ?

যারা হয়তোবা ঘুষ খেয়ে অনুমতি দিয়েছে, তাদের কাছ থেকে সেই টাকা উদ্ধার করতে হবে প্রথমে সেই টাকা রবির মতো ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা আর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

যারা অনুমতি দিয়েছে তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যেন আর কখনও কেউ এই কাজ না করে। আমি জানি রাজউকে কি হয়। টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না। বাধ্য হয়েই আমরা টাকা দিয়ে ফাইল উদ্ধার করি।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব আছে। নগর পিতাদের সামনে ঢাকা এলোমেলো হচ্ছে দেখেও তারা চুপ কেনো ছিল? কার স্বার্থে?  রাজউকের দানবীয় বুল ড্রোজার থামান, আগে আমার ‘বাচ্চাদের’ বাঁচান-প্লিজ। এবার ভাঙা হলে আর যেন না গড়ে ওঠে।

এ ছেলে-মেয়েদের ফ্রাসটেশন দেখে মনে হয়, আমরা কি নতুন হোম গ্রোন টেররিস্ট তৈরী করতে যাচ্ছি, নাকি ক্রাইম রেট বাড়ানোর প্রক্রিয়া করছি? সবাই একটু ভাবুন, এটা বাস্তবায়ন হলে আমরা গ্লোরিয়া জিন্স বা অন্য যে কোনো হোটেলে গেলে হাসি-খুশি দৌড়াদৌড়ি করা বাচ্চাদের দেখতে আর পাব না। আমরা আমাদের বিবেককে জিজ্ঞাসা করলেই এ অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো।

এর আর পুনরাবৃত্তি চাই না, প্লিজ। ঘুষের টাকা উদ্ধার করে একটি ফান্ড গঠন করে এ সব ছেলে-মেয়েদের পাশে দাঁড়ান। দেশের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না।

নাদীম কাদির : সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার। nadeemqaadir1960@gmail.comMenu