গানের শিল্পী যেভাবে জঙ্গি হলো!

48

উদিসা ইসলাম

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষদিকে এবং পরবর্তীতে চাকরিসূত্রে জঙ্গিগোষ্ঠীর নজরে পড়ে বদলে যেতে থাকে তাহমিদ। প্রথমে গান গাওয়া বন্ধ করে দেয়, তারপর বন্ধুদের সঙ্গে যাবতীয় যোগাযোগও। এরপরই পাড়ি জমায় সপরিবারে বিদেশে। বন্ধুদের দাবি, এখন মনে হচ্ছে, পুরোটাই পরিকল্পনা করে করা। আগে তার একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকলেও পরবর্তীতে স্বনামে আর কোনও অ্যাকাউন্টের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

তাহমিদ রহমান শাফি সম্প্রতি গুলশানে আর্টিজান রেস্তোরার হামলাকারীদের প্রশংসা করে প্রচারিত ভিডিওতে তিন তরুণের একজন এই তাহমিদ সাবেক নির্বাচন কমিশনার সফিউর রহমানের ছেলে। কেবল তাই নয়, সে শান্তিনিকেতনে পড়েছে, বাংলাদেশের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ক্লোজ আপ ওয়ানের প্রথম আয়োজনে সে শীর্ষ ১৫ কণ্ঠশিল্পীর মধ্যে ছিল।

একজন সচিবের ছেলে কীভাবে জঙ্গি হলো সে প্রশ্নে স্বজনরা বলছেন, হঠাৎ করে সে গান বন্ধ করে দেয়। তাদের ‘ধারণা’ তাহমিদের ওরিয়েন্টেশন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সময় থেকেই। তবে গ্রামীণ ফোনে চাকরিসূত্রে সে এমনকিছু মানুষের সংস্পর্শে আসে, যারা তাকে অন্যভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আর বিশ্লেষকরা বলছেন, এদের অধিকাংশই প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে জিহাদি লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয় এবং পরবর্তীতে সরাসরি রিক্রুটার-এর সংস্পর্শে আসে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিপরীতটাও ঘটে। রিক্রুটারের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে তাকে জঙ্গি হওয়ায় উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এমনটাও হতে পারে।

এই তাহমিদই ‘সাইট’-এর প্রকাশিত ভিডিওতে দাবি করেছিল, গুলশানে যে হামলা হয়েছে তা ঝলক মাত্র। সে শরিয়া আইনকে নিজেদের মতো করে নেওয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে গণতন্ত্র ‘শিরক’ মতবাদ এবং এতে আস্থা রাখতে নেই বলে উল্লেখ করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাহমিদের বন্ধুরা বলছেন, গত দু’তিনবছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেললেও একবছর আগে সপরিবারে দেশ ছেড়েছে সে। তার বাবা সফিউর রহমান ২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে মারা যান।

তাহমিদের বন্ধুরা বলছেন, সে ভীষণ দক্ষ ও স্মার্ট ছিল। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিকে হিজবুত তাহরীর নামে একটি সংগঠনের গল্প করতো এবং তাদের কাজের প্রশংসা করতো। এরপর তার আচার আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় এবং হঠাৎ সে নিজের গতিবিধি লুকানোর চেষ্টা করে আমাদের কাছে। তখন আমরা আর যোগাযোগ রাখিনি।

কীভাবে সম্পৃক্ততাগুলো হয় জানতে চাইলে জঙ্গিবাদ বিষয়ের গবেষক প্রবাসী নির্ঝর মজুমদার বলেন, উচ্চবিত্ত সন্তানরা পালাচ্ছে বা যোগ দিচ্ছে। কারণ তারাই রিক্রুটমেন্টের লক্ষ্য ছিলো। তাদের লক্ষ্য করেই রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পেইন চালিয়েছে জঙ্গিরা। আর যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা ধরন লক্ষণীয়। উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের টার্গেট করতো হিযবুত তাহরীর, যারা আদর্শিকভাবে আইসিসের সমান্তরাল। এদের অধিকাংশই প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে জিহাদি লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয় এবং পরবর্তীতে সরাসরি রিক্রুটার-এর সংস্পর্শে আসে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরামের ওমর শেহাব বলেন, সমাজের কোন অংশের তরুণরা টার্গেট এটি নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি। কাজেই ধুম করে বলে দেওয়া যায় না যে, বিত্তবান পরিবারের সন্তানেরা টার্গেট। তবে জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করেন যারা, তারা বলছেন, আইএস এবং হিজবুত তাহরীরের আদর্শগত মতবাদের জায়গা এক।

শিল্পী তাহমিদ যখন পরিবারের সঙ্গে নিকুঞ্জের বাসায় থাকতো তখন বন্ধুরা তার পরিবর্তন দেখতে পায় এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় বলে জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (১ জুলাই) রাতে গুলশান ২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে ২ পুলিশ সদস্য, ১৭ বিদেশি নাগরিক ও ৩ বাংলাদেশি নিহত হন। পরে কমান্ডো অভিযানে ৬  জঙ্গি নিহত হয় বলে শনিবার সেনা সদরেএক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। অভিযানে জীবিত উদ্ধার করা হয় ৩ বিদেশিসহ ১৩ জিম্মিকে। এছাড়া ১ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়।

 

তাহমিদের বাবা শফিউর রহমান ছিলেন সরকারের সচিব এবং পরে নির্বাচন কমিশনার।নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ২০০০ সালের ২৫ জুন থেকে ২০০৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত   নির্বাচন কমিশনার হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের তথ্য রয়েছে। পাকিস্তান আমলে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসনসহ বিভিন্নমন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্ব পালন করেন শফিউর রহমান। ২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে মারা যান তিনি। বাংলা ট্রিবিউন।