বাংলাপ্রেমী উইলিয়াম রাদিচে

112

গোলাম মুরশিদ

 

আসন্ন অমর একুশে বইমেলায় প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হবে বাংলা সাহিত্যের অনুবাদক ও গবেষক উইলিয়াম রাদিচের বাংলায় লেখা বই দীর্ঘ দুরূহ পথ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পাঁচটি বক্তৃতা। এই বইয়ের ভূমিকায় রাদিচেকে নিয়ে লিখেছেন গোলাম মুরশিদ

 

উইলিয়াম রাদিচে, প্রতিকৃতি: মাসুক হেলালআঠারো শতকের আগে পর্যন্ত বঙ্গদেশের ভাষার নাম ‘বাঙ্গলা ভাষা’ হয়নি। অন্তত ‘বাঙ্গলা ভাষা’ নামটা প্রামাণ্য নাম হিসেবে গৃহীত হয়নি। কাজেই বিদেশিরা সে ভাষা শিখবে যত্নের সঙ্গে—এটা প্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু নিচের আলোচনা থেকে দেখতে পাব, আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে বাংলা ভাষার গুরুত্ব কীভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশিরাও কেমন যত্নের সঙ্গে তা শিখতে আরম্ভ করেন। তারপর বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও গৌরবান্বিত হয়ে ওঠে এবং আজ তা বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু বিদেশিরা বাংলার প্রতি আকৃষ্ট হলেন কী করে?

শাসন করতে নয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ দেশে এসেছিল ব্যবসা করতে। যে কলকাতায় তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র গড়ে তোলে, সেখানে চালু ছিল স্থানীয় কথ্যভাষা বাংলা আর রাজভাষা ফারসি-মেশানো কথ্যভাষা হিন্দুস্তানি। কাজেই ব্যবসায়ী এবং কোম্পানির যে কর্মচারীরা আসতেন তখন, তাঁরা ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, হিন্দুস্তানি এবং বাংলা খানিকটা শিখে ফেলতেন। টিকে থাকার জন্যই তাঁদের শিখতে হতো।

কিন্তু ১৭৭০-এর দশকের গোড়া থেকে কোম্পানির শাসন রীতিমতো একটা কাঠামোভিত্তিক চেহারা নিল। তখন বিলাত থেকে প্রশাসনকার্যে সহায়তা করার জন্য তরুণ শিক্ষানবিশরা আসতে আরম্ভ করলেন অনেক বেশি সংখ্যায়। এঁদের মধ্যে কারও কারও রীতিমতো ভাষা শেখার প্রতিভা ছিল। উইলিয়াম জোনস, ন্যাথানিয়েল হ্যালহেড, জোনাথান ডানকান, চার্লস উইলকিনস, হেনরি পিটস ফরস্টার, টমাস কোলব্রুক প্রমুখ ছিলেন এঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। অন্য কর্মচারীদেরও আসার আগেই কর্মস্থানের কোনো একটা ভাষার অ আ ক খ শিখে আসতে হতো। এভাবে পরবর্তী তিরিশ-চল্লিশের দশকে একদল প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদ অথবা ওরিয়েন্টালিস্টের দেখা মিলেছিল এশিয়াটিক সোসাইটি (১৭৮৪-) আর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে (১৮০০-) কেন্দ্র করে।

এঁরা দেশীয় ভাষাসমূহ, দেশের ইতিহাস, ভূগোল এবং সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে অধ্যয়ন এবং গবেষণা করেন। ফলে তাঁরা এক গৌরবোজ্জ্বল প্রাচীন ভারতকে আবিষ্কার করেন।

 

আরেক দল ওরিয়েন্টালিস্টের জন্ম হয়েছিল খ্রিষ্টধর্ম প্রচার করতে এসে। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান ছিলেন উইলিয়াম কেরি। আরেকজন—প্রায় এক শতাব্দী পর—এডওয়ার্ড জন টমসন। এই বিদেশিদের প্রয়াসে এবং তাঁদের দেশি সহকর্মীদের সহযোগিতায় বাংলা ভাষায় বই লেখা হয়, বাংলা সাহিত্য রচিত হয় এবং বাংলা ভাষা একটা ফরমাল রূপ নেয়।

তারপর বাংলাসহ নানা দেশীয় ভাষা শিক্ষার অনুবর্তন চলে গোটা উনিশ শতক ধরে। সরকারি চাকরি করার শর্ত হিসেবে একটি বাধ্যতামূলক দেশীয় ভাষা বাংলা শেখেন। এঁদের বেশির ভাগ হিন্দুস্তানি ভাষা শিখলেও অনেকে বাংলাও শেখেন। গ্রেইভস হটন, জর্জ গ্রিয়ারসন আর জন বিমসের মতো পণ্ডিতের আবির্ভাব ঘটেছিল এভাবেই।

নিজেদের গবেষণা এবং শিক্ষাসূত্রেও বিশ শতকে অনেক ইংরেজ বাংলা শেখেন। এঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য টমাস ওয়েলবোর্ন ক্লার্ক, যিনি কার্সিয়াংয়ে পড়াতে এসে ভালো করে বাংলা ও নেপালি ভাষা শিখেছিলেন। দেশে ফিরে গিয়ে পরে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ—সংক্ষেপে সোয়াসের বাংলার অধ্যাপক হন। এঁরই ছাত্র জন ভিক্টর বোল্টন ওড়িয়া সাহিত্যিক ফকিরমোহন সেনাপতির ওপর গবেষণা করতে গিয়ে উৎকৃষ্ট বাংলা শেখেন। তাঁরই পরিচালনায় বাংলাদেশের কয়েকজন সুপরিচিত পণ্ডিত পিএইচডি করেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। এডওয়ার্ড ডিমক, র্যাল্ফ নিকোলাস, ডেভিড কফ, জন ব্রুমফিল্ড প্রমুখও বাংলা শেখেন তাঁদের গবেষণাসূত্রে। বাংলাদেশে মার্কিন পিস কোরের সদস্য হিসেবে বরিশালে থাকার সময় বাংলা শেখেন ক্লিনটন সিলি। এঁরা বাংলা শেখেন তাঁদের কাজের সূত্রে। বাংলা শিখবেন বলেই শেখেননি।

অপর পক্ষে উইলিয়াম রাদিচে বাংলা শিখেছিলেন বাংলা শিখবেন বলেই। অক্সফোর্ডে ইংরেজিতে ডিগ্রি করার পর তিনি ভাবছিলেন, অতঃপর কী করবেন। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যে তাঁর আগ্রহ ছিল। তিনি একাধারে মৌলিক কবি এবং অনুবাদক। অক্সফোর্ডে তিনি তরুণ কবি হিসেবে পুরস্কারও লাভ করেছিলেন। সে যা-ই হোক, অক্সফোর্ডের অধ্যয়ন শেষ করে যখন তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ভাবছিলেন, তখন তাঁর এক বাঙালি বন্ধু তাঁকে বাংলা পড়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, কাজ করার মতো অনেক উপাদান তিনি বাংলা ভাষায় পাবেন। এ ছাড়া যা তাঁকে তখন বাংলা পড়তে সত্যি সত্যি উদ্বুদ্ধ করে তা হলো, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম। উইলিয়াম রাদিচে তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছেন, নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ নন, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম নন, তাঁকে বাংলা ভাষার দিকে টেনেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা এবং জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের গৌরবজনক স্বাধীনতাসংগ্রাম তাঁকে উদ্দীপ্ত করেছিল। বঙ্গদেশ এবং বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর আরও একটা দূরবর্তী আকর্ষণ ছিল—একসময় তাঁর পিতামহ এবং তারপর তাঁর পিতৃব্য বঙ্গদেশে আইসিএস অফিসার হিসেবে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সেই সূত্রেও তিনি নিশ্চয় ছেলেবেলা থেকে বঙ্গদেশ এবং ভারতবর্ষের অনেক গল্প-কাহিনি শুনে থাকবেন, যা তাঁকে বঙ্গদেশ সম্পর্কে কৌতূহলী করে থাকবে।

অক্সফোর্ডে বাংলা শেখার ব্যবস্থা ছিল না, তাই উইলিয়াম রাদিচে বাংলা শিখতে যান লন্ডনের সোয়াসে। সেখানে তিনি বিভাগের প্রভাষক তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে বাংলা শেখেন। তার আগেই ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে ক্লার্ক সাহেব মারা গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অধ্যাপক। তাঁর জায়গাতে জন ব্লোল্টন আর তারাপদ মুখোপাধ্যায় প্রভাষক হন। তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে উইলিয়াম রাদিচে ভালো করেই বাংলা শেখেন, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গীয় সাহিত্যিক বাংলা। আমার ধারণা, তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে রবীন্দ্রসাহিত্যেও তাঁর হাতেখড়ি হয়। রবীন্দ্রসাহিত্য দিয়ে সূচনাই হওয়াই তো স্বাভাবিক।

তিনি বিশেষ করে আকৃষ্ট হন রবীন্দ্রনাথের কাব্য পড়ে। তিনি রবীন্দ্রনাথের কাব্য অনুবাদ করতে আরম্ভ করেন। তাঁর সেই অনুবাদের মধ্য থেকে ৪৮টি নানা স্বাদের কবিতা নিয়ে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: সিলেকটেড পোয়েমস নামে একটি কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশক পেঙ্গুইন বুকস। এই সংকলন প্রকাশিত হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ যেন নতুন জীবন লাভ করেন। প্রথম মহাযুদ্ধের ঠিক আগে এক বিশেষ রাজনৈতিক হতাশা এবং বিষণ্নতার মধ্যে গীতাঞ্জলির এক বিশেষ স্বাদের গান ও কবিতার জন্য তখনকার ব্রিটেনে এবং বৃহত্তর ইউরোপে রবীন্দ্রনাথ দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। তারই সূত্র ধরে ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যের জন্য সমগ্র এশিয়ার মধ্যে সবার আগে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এই জনপ্রিয়তার সত্যিকার কারণ তিনি নিজেই জানতেন না। ফলে তিনি পরবর্তী কয়েক বছর যেসব সাহিত্য অনুবাদ করেন, তাকে পাঠকেরা একঘেয়েমি বলেই বিবেচনা করেন। প্রথম মহাযুদ্ধের জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততাও রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা লোপ করে দেয়। কারণ, তিনি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা লোপের একটা প্রমাণ: ১৯২০-২১ সালেই অক্সফোর্ডের ইংরেজি কাব্যসংগ্রহে শেষবারের মতো রবীন্দ্রনাথের কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়। রবীন্দ্রনাথ খেয়া, গীতাঞ্জলি, গীতালি এবং গীতিমাল্য-এ প্রধানত আধ্যাত্মিকতার রহস্যময়তা দিয়ে আচ্ছন্ন পূজা, প্রেম এবং প্রকৃতির গানই রচনা করেননি, অন্য অনেক বিচিত্র আঙ্গিক এবং রসের কাব্য রচনা করেছিলেন। গীতাঞ্জলির অনুবাদের মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্যের পাঠকেরা যার স্বাদ আদৌ পাননি। রবীন্দ্রনাথ এভাবে এক দশকের কম সময়ের মধ্যে পশ্চিম আকাশ থেকে ঝরে পড়েন।

উইলিয়াম রাদিচের প্রধান কৃতিত্ব এই যে তিনি বিচিত্র আঙ্গিক এবং নানা স্বাদের মাত্র ৪৮টি কবিতার কাব্যানুবাদ করেন ‘আধুনিক’ ইংরেজিতে এবং সেই অনূদিত কবিতা দিয়ে এমন একটি সংকলন প্রকাশ করেন, যা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ইংরেজ পাঠকদের কৌতূহল নতুন করে জাগিয়ে তোলে। এতে ‘দুই বিঘা জমি’র মতো আখ্যানমূলক কবিতা যেমন ছিল, তেমনি ‘সোনারতরী’, ‘সাজাহান’ এবং শেষ দিকের গদ্যকবিতাও ছিল। বিশেষ করে ব্রিটেনে তখন দ্য রাজ কোয়ার্টেট উপন্যাসগুচ্ছ এবং তার ওপর ভিত্তি করে রচিত টিভির একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘দ্য জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন’, একাধিক নামকরা চলচ্চিত্র গান্ধী, আ প্যাসিজ টু ইন্ডিয়া ইত্যাদি ফেলে আসা ভারতবর্ষ সম্পর্কে ব্রিটেনে যে নস্টালজিয়া জেগে উঠেছিল, তা-ও রবীন্দ্রনাথের পুনর্জাগরণে সহায়তা করে। সেই সঙ্গে অনুবাদক হিসেবে রাদিচেও পরিচিতি লাভ করেন।

রাদিচের এই অনুবাদগ্রন্থটি আকারে ছিল ছোট, কিন্তু অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এ গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর ইংরেজ কবি ও সম্পাদক ক্যাথলিন রেইন এর সমীক্ষা করতে গিয়ে লিখেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ যে এত বড় কবি ছিলেন, তা তিনি এ গ্রন্থ পড়ার আগে জানতেন না। এখন তিনি অনুভব করছেন যে বিশ শতকের দুই শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন উইলিয়াম ইয়েটস আর রবীন্দ্রনাথ। এই একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত থেকেই বোঝা যায়, রাদিচের চটি বইটি রবীন্দ্রনাথকে কেমন নতুন জীবন দান করেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ বইয়ের ভূমিকাটি রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সাহিত্য সম্পর্কে পাঠকদের একটা সংক্ষিপ্ত কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ ধারণা দেয়।

একবার এই নির্বাচিত কবিতাসংকলনের মাধ্যমে সাফল্য লাভ করার পর রাদিচে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের অনুবাদে হাত দেন। কবিতার রস আস্বাদনে যেমন তার পরিবেশ সম্পর্কে পরিচিতি একান্ত আবশ্যিক নয়, ছোটগল্প সম্পর্কে সে কথা খাটে না। ছোটগল্পের স্বাদ পেতে হলে সেই জগৎ সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণার দরকার হয়। সে জন্য ১৯৯১ সালে যখন রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত গল্পের অনুবাদ পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত হয়, তখন তা কবিতার মতো অতটা সমাদর লাভ করেনি। তবে এ বইয়ের পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। কেবল তা-ই নয়, এরপর ছোটগল্পের আরও একটি সংকলন প্রকাশ করেন কাবুলিওয়ালা নামে। তবে রাদিচে উপলব্ধি করেন যে রবীন্দ্রনাথের সত্যিকার অনুবাদের ক্ষেত্র তাঁর গল্প, উপন্যাস অথবা নাটক নয়, সে হলো তাঁর কবিতা। তাই তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার আরও একাধিক সংকলন প্রকাশ করেন। এমনকি কণিকা, লেখন এবং স্ফুলিঙ্গর ক্ষুদ্র কবিতাও অনুবাদ করেন (২০০৪)।

তিনি সোয়াস থেকে বাংলা শেখার কোর্স শেষ করে ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করতে আরম্ভ করেন। তাঁর গবেষণার নির্দেশক ছিলেন ঐতিহাসিক অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরী। আমি কখনো রাদিচেকে সরাসরি জিজ্ঞেস করিনি, কিন্তু অক্সফোর্ডে তিনি পড়তেন খুব সম্ভব খণ্ডকালীন ছাত্র হিসেবে। বাকি সময় পড়াতেন একটা স্কুলে। পরে তিনি সোয়াসের শিক্ষক হন (১৯৮৮) প্রথমে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে, তারপর প্রভাষক এবং সবশেষে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে। তিনি তখন ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও কাজ করেন। এ সময়ে তাঁর বয়স মাত্র ৫০ বছর। কিন্তু তখনই তিনি অবসর নিয়ে নিজের কাজে আত্মনিয়োগ করতে চান।

রাদিচের পরিচয় শিক্ষক হিসেবে যতটা, তার চেয়ে তিনি ঢের বেশি পরিচিত কবি, লেখক এবং অনুবাদক হিসেবে। তাঁর নয়টি মৌলিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং কবি হিসেবে তিনি পুরস্কারও লাভ করেছেন। তা সত্ত্বেও তাঁর খ্যাতি এসেছে অনুবাদের পথ ধরে। তিনি অসামান্য অনুবাদক। তাঁর অনুবাদ সঠিক হওয়া সত্ত্বেও সৌভাগ্যক্রমে তা আক্ষরিক নয়। তিনি এক ভাষার ধারণা এবং ভাবটি অনায়াসে অন্য ভাষায় সঞ্চারিত করে দেন। সে জন্য কোনো কোনো বাঙালি সমালোচক বাংলা কোনো শব্দ, অণুবাক্য অথবা বাক্য তুলে ধরে তার সঙ্গে ইংরেজির তুলনা করে তাঁর অনুবাদে আক্ষরিক অমিল দেখিয়েছেন। এ কেবল তাঁর অনুবাদের প্রতি অবিচার নয়, সামগ্রিকভাবে উত্তম অনুবাদের প্রতিই অবিচার। আমার ধারণা, কবি অথবা শিক্ষকের চেয়েও অনুবাদক হিসেবে রাদিচে শ্রেষ্ঠ।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: এই দুই বাঙালি কবিকে পাশ্চাত্যে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন উইলিয়াম রাদিচেতাঁর অনুবাদে কেবল ভিনভাষী মূল বিষয়বস্তুর পরিচয় পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় মূল ছন্দের দোলা, মূল ভাষার সংগীতময়তা, এমনকি মূলের রস আস্বাদন। দৃষ্টান্তস্বরূপ ‘সাজাহান’ কবিতার উল্লেখ করতে পারি। ইংরেজিতে পড়ছি, কিন্তু পড়তে গিয়ে যেন শুনতে পাই ‘এ কথা জানিতে তুমি ভারত-ঈশ্বর সাজাহান/কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান।’ কথাগুলো শুনতে পাই মূলের ছন্দে এবং ধ্বনিমাধুর্যে। মনে পড়ে, রাদিচের পাশে বসেই দেখেছিলাম তাঁর অনূদিত দ্য পোস্ট অফিস নাটকের অভিনয়। সংলাপগুলো বলা হচ্ছিল ইংরেজিতে, কিন্তু আমি যেন সে সংলাপগুলো শুনতে পাচ্ছিলাম বাংলায়। এমন শব্দভেদী এবং মর্মস্পর্শী অনুবাদ তাঁর।

কেবল অনুবাদ করেই তিনি তৃপ্ত নন, আঙ্গিক নিয়েও তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। যেমন: ‘দেবতার গ্রাস’ কাহিনিমূলক কবিতাটি তিনি অনুবাদ করেন অথবা বলা যেতে পারে রূপান্তর করেন নেদারল্যান্ডসের একটি অপেরা কোম্পানির জন্য। তারপর সেই অসাধারণ গীতিনাট্যটি স্ন্যাচ্ট্ড্ বাই গড নামে অভিনীত হয় ১৯৯২ সালে।

অনুবাদে সৃজনশীলতার আরেকটি অসাধারণ পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষের সময়ে। এ সময়ে তিনি ইংরেজি গীতাঞ্জলি নতুন করে অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন নির্বাচিত শতাধিক গান এবং কবিতার গদ্যানুবাদ নিয়ে ইংল্যান্ডে যান এবং সেখানকার গুণীজনদের পড়ে শোনান, তখন তা শুনে তাঁরা মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস পর যখন এই গান ও কবিতাগুলো ছাপানো হয়, তখন তা খানিকটা মাজাঘষা করেছিলেন উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস। কেবল তা-ই নয়, রবীন্দ্রনাথ যে ক্রম অনুযায়ী রচনাগুলো সাজিয়েছিলেন, সেগুলোরও পরিবর্তন করেছিলেন। কিন্তু ১০০ বছর পর ২০১২ সালে উইলিয়াম রাদিচে মূলের ক্রম ফিরিয়ে আনেন এবং রবীন্দ্রনাথের মূল অনুবাদের পাশাপাশি আধুনিক ইংরেজিতে রচনাগুলোর পদ্যানুবাদও প্রকাশ করেন। ফলে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলির মাধ্যমে পাঠকদের হৃদয়ে যে রস সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, প্রথমবারের মতো পাঠকেরা তার স্বাদ পেলেন রাদিচের অনুবাদে। একে ইংরেজিতে ট্রান্সলেশন না বলে বলা হয়েছে ট্রান্সক্রিয়েশন।

বস্তুত, অনুবাদ করতে গিয়েও রাদিচে তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন নানা দিক দিয়ে। দ্য পোয়েম অব দ্য কিলিং অব মেঘনাদ নামে তিনি মেঘনাদবধ কাব্য-এর যে উৎকৃষ্ট অনুবাদ করেন, তাতেও তিনি এই সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রথমেই তিনি যে সমস্যার মুখোমুখি হন, তা হলো এ কাব্যের ছন্দ—ব্ল্যাঙ্ক ভার্স নিয়ে। মাইকেল অমিত্রাক্ষর নামে বাংলায় এই ছন্দের যে রূপান্তর ঘটান, তাতে সমস্যা কিছু কম ছিল না। কারণ, ইংরেজিতে ব্ল্যাঙ্ক ভার্স কেবল অন্ত্যমিলহীন ১০ মাত্রার ছন্দ নয়, তাতে ঝোঁকযুক্ত এবং ঝোঁকহীন অক্ষর একটা বিশেষ শৃঙ্খলায় সাজানো থাকে এবং তার ফলে ছন্দে একটা সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় এবং অর্থ প্রকাশেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে নাটকের জন্য এ ছন্দ অত্যন্ত উপযোগী। (শেক্সপিয়ার যার ব্যাপক ব্যবহার করেছেন।)

মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন নাটক এবং কাব্যের প্রয়োজনে অমিত্রাক্ষর ছন্দ নির্মাণ করেন, তখন তার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন ১৪ মাত্রার পয়ারকে। অন্ত্যমিল পুরোপুরি বর্জন করেন। কিন্তু বহু জায়গাতেই পর্ববিভাগ মেনে নেন অথবা তাকে এড়াতে পারেননি। কোনো কোনো জায়গায় একটা বাক্য শেষ হয়েছে দুই, আড়াই, তিন, সাড়ে তিন পঙ্ক্তিতে। রাদিচে এ দিকটার দিকে লক্ষ রেখে তাঁর পঙ্ক্তিগুলোর দৈর্ঘ্যের হেরফের ঘটিয়েছেন। কিন্তু তিনি যেভাবেই তাঁর পঙ্ক্তিগুলো সাজিয়ে থাকুন না কেন, পড়তে গেলে বাংলা অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। ক্লিনটন সিলিও আটলান্টিকের অপর তীর থেকে মেঘনাদবধ কাব্যের অনুবাদ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু রাদিচে পঙ্ক্তিগুলোর দৈর্ঘ্যে বৈচিত্র্যের আমদানি করে সমস্যার যে সমাধান করেছেন, ক্লিনটন সিলি ১৪ মাত্রার পঙ্ক্তি বজায় রেখেও তা করতে পারেননি। রাদিচে যে মৌলিক কবি, তা-ও এ ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাদিচের মতো সিলি কবি নন।

সোয়াসের লেখাপড়া শেষ করে উইলিয়াম রাদিচে অক্সফোর্ডে ভর্তি হন, আগেই বলেছি। সেখান থেকে ১৯৮৭ সালে তিনি ডিফিল ডিগ্রি অর্জন করেন (অক্সফোর্ডে পিএইচডি নেই)। তাঁর বিষয়বস্তু ছিল মাইকেল মধুসূদনের জীবন ও সাহিত্য। জীবনী নিয়ে তিনি মৌলিক গবেষণা করেননি। যোগীন্দ্রনাথ বসু, নগেন্দ্রনাথ সোম এবং সুরেশচন্দ্র মৈত্রের ওপরই তিনি নির্ভর করেন। সত্যিকারের কৃতিত্ব তিনি দেখান মাইকেলের সাহিত্য বিশ্লেষণে। যেমন: কবির সাহিত্য বিশ্লেষণ করেই তিনি মন্তব্য করেন যে মাইকেলের জীবন ও সাহিত্যে খ্রিষ্টীয় পরিচয় ছিল আন্তরিক। মাইকেলের আরও একটি বৈশিষ্ট্যের কথা সবার আগে তিনি উল্লেখ করেন। সে হলো মাইকেলের সাহিত্য এবং চিঠিপত্রে হাস্যকৌতুকের সূক্ষ্ম প্রকাশ। তাঁর আগে এদিকে অন্য কেউ মনোযোগ আকর্ষণ করেননি। কিন্তু তাঁর এ আলোচনার পর এ সম্পর্কে কারও আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। তাঁর আরেকটি সুবিধা ছিল, তিনি ধ্রুপদি বিদ্যাচর্চা করেছিলেন। কাজেই তাঁর পূর্ববর্তী সমালোচকদের তুলনায় তিনি অনেক গভীরভাবে মাইকেলের ওপর গ্রিক, ইতালিয়ান এবং ইংরেজি ধ্রুপদি সাহিত্যের প্রভাব নির্ণয় করতে পেরেছিলেন। তাঁর ডিফিল ডিগ্রি হয়ে যাওয়ার পর তিনি মাইকেলের জীবনী নিয়ে কোনো প্রবন্ধ রচনা করেননি। কিন্তু মাইকেলের ওপর ইংরেজি এবং ইউরোপীয় ধ্রুপদি সাহিত্যের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। আলোচনা করেছেন মাইকেল সাহিত্যে পরজাতি-বৈরিতা নিয়েও।

দীর্ঘ দুরূহ পথ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পাঁচটি বক্তৃতা বইয়ের প্রচ্ছদউইলিয়াম রাদিচের আরেক অতুলনীয় অবদান হলো বহু অজানা দেশে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে, যেখানে বাংলা ভাষা নামে একটি ভাষার কথাই জানা ছিল না এবং জানা ছিল না বাংলা সাহিত্যের ঐশ্বর্যমণ্ডিত ঐতিহ্যের কথা, সেসব দেশে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের খবর পৌঁছে দিয়েছিলেন। রাদিচের অন্যান্য অবদানের মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পতাকাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার ব্যাপারে, তাঁর অবদান যে সুবিস্তৃত এবং অতুলনীয়—সে সম্পর্কে সন্দেহের কারণ নেই।

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য ছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যান্য বিষয় নিয়েও কাজ করেছেন। যেমন: ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে যাঁর অবদান ছিল সম্ভবত সবচেয়ে বেশি, সেই মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনীর ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকা লিখেছেন তিনি। বইটির শতাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। গর্বিত খ্রিষ্টান মাইকেল তাঁর বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে একদা লিখেছিলেন যে তিনি হিন্দুধর্মকে একচুলও তোয়াক্কা করেন না। কিন্তু হিন্দু পুরাণের শ্রেষ্ঠত্ব একেবারে তুলনাহীন। সেই পুরাণ সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট অথবা অস্পষ্ট কোনো ধারণাই নেই। বিশেষ করে যাঁরা ভারতীয় ভাষা জানেন না। এই অভাব পূরণের জন্য রাদিচে প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার মিথস অ্যান্ড লিজেন্ডস অব ইন্ডিয়া নামে একটি বিশাল গ্রন্থ প্রকাশ করেন ২০০২ সালে। এই গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য হলো এতে কেবল হিন্দুধর্মীয় পুরাণকথাই স্থান পায়নি, সেই সঙ্গে মুসলিম, জৈন, বৌদ্ধ এবং লৌকিক কাহিনিও জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর ভারত বহু-সাংস্কৃতিক ভারত—এ গ্রন্থেরও একাধিক সংস্করণ হয়েছে।

স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়েও তিনি একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন (১৯৯৮)। তাতে ১৪টি প্রবন্ধের মধ্যে একটি তাঁর রচনা। এতে তিনি অন্ধভক্তি প্রকাশ না করে হিন্দুধর্মকে আধুনিক করে তোলার ব্যাপারে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান সম্পর্কে লিখেছেন।

রাদিচে যখন সার্বক্ষণিক গবেষণা এবং কাব্যচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করার জন্য প্রস্তুত, তেমন সময় ২০১২ সালের মে মাসে একটা অত্যন্ত গুরুতর দুর্ঘটনায় পতিত হন। একটা চলন্ত ট্রাক তাঁকে ধাক্কা দেয়। ফলে তিনি দেহের বিভিন্ন স্থানে গুরুতররূপে আহত হন। বিশেষ করে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। তবে সৌভাগ্যক্রমে তাঁকে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় এবং সেখানে অত্যন্ত উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা লাভ করেন। তিনি লাইফ সাপোর্টেই ছিলেন ছয় সপ্তাহ। এত দীর্ঘ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর আবার সুস্থ হয়ে ওঠার দৃষ্টান্ত অত্যন্ত বিরল। তবে বেঁচে উঠলেও এখনো পর্যন্ত তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেননি। মাথায় আঘাতের কারণে তিনি মাঝেমধ্যেই মৃগীরোগে আক্রান্ত হন এবং ভাবতে গেলে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বাংলা সাহিত্যকে অনুবাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জগতে পৌঁছে দেওয়ার যে অসাধারণ কাজ তিনি করছিলেন, তা আবার করতে পারবেন কি না, সন্দেহ হয়। কিন্তু তিনি গত তিন দশক ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে সেবা করেছেন, তার কোনো তুলনা নেই। বাঙালিদের তারই জন্য তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

এই বইয়ে তাঁর যে পাঁচটি বক্তৃতা সংকলিত হয়েছে, তাতে তাঁর নিজের সম্পর্কে জানা যায়, তিনি বাংলা ভাষা-সাহিত্য নিয়ে যে কাজ করেছেন এবং বিশ্বের অন্যান্য ভাষা-সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার স্থান কোথায়, সে সম্পর্কে তাঁর মনোভাব এবং মূল্যায়নও জানা যায়।