বাংলাদেশে বিপ্লববাদ- আবেগ,রোমাঞ্চ, ফ্যাশন

141

 

হামিদ মোহাম্মদ

বাংলাদেশে বিপ্লব করার দিকে ঝুঁকে যাওয়া তরুণ সমাজের চরিত্র মূলত আবেগী ও ফ্যাশনেবল। বিশ্ব পরিসরে বিপ্লবের  বিভিন্ন বাক বদলে এর প্রতিফলনের চিত্র বাংলাদেশে নতুন নয়। বর্তমানে আইএস-এর কর্মকান্ড বিশ্বব্যাপী আলোচিত বিষয়। তরুণ সমাজ সব সময় আলোচিত থাকতে চায়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজের অবস্থানকেও দেখতে আগ্রহী হয়ে ওঠা এক ধরনের ফ্যাশন।

আশির দশকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ব্যাপকভাবে বিপ্লব সংঘটিত করার দিকে এ রকমই ঝুঁকে পড়ে। এ সময় জাসদ  নামের রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই ধরনের ফ্যাশনবেল আবেগ ছড়িয়ে দেয়। হাজার হাজার তরুণ আবেগ তাড়িত হয়। যার পরিসমাপ্তি ঘটে-আত্মহননে, ব্যর্থতায় এবং  জাতির অপূরণীয় ক্ষতি সাধনের মাধ্যমে।

বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্র বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার নামে বিশ্বের মুসলিম  দেশগুলোতে এমনি উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ সমাজের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ  এই উন্মাদনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ইসলামী বিপ্লব সফল করার জন্য ফ্যাশনেবল এই  আবেগী বিপ্লবী হওয়ার রোমাঞ্চে রোমাঞ্চিত।  বেহেশতি ও বেহেশতে যাওয়ার বিপ্লব আকাঙ্খা লালন করছে মনে ও মননে। এই ব্যাখ্যাকে অনেকে হয়তো উড়িয়ে দেবেন নানা অজুহাতে। তবে- বিপ্লববাদী হওয়া,এর ধরণ,গতিপ্রকৃতি এছাড়া কোন ধরনের পরিবারের সন্তান এ সবে সম্পৃক্ত হচ্ছে, কেন হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্টভাবে বুঝা যাবে। আমার মনে হয়,নিজের স্বার্থেও এসব বিশ্লেষণ জরুরি।

অতীতের বিপ্লবী কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাংলা অঞ্চলের যে সন্তানরা বিপ্লবে দীক্ষা নেয় তারা বেশিরভাগই সচ্ছল পরিবারের। পারিবারিক অবস্থান কোনো অর্থেই শ্রমিকশ্রেণীর কাছাকাছি ছিলো না। বরং ব্রিটিশদের অনুগত ও তাদের আর্শিবাদপুষ্ট ছিলো। তবে কেন এ সমস্ত পরিবারের সন্তান বিপ্লবী সাজতে পছন্দ করতো। আবেগ ও ফ্যাশনই কাজ করতো মনের ভেতর। যদিও ভিনদেশী শাসন শোষণও বিপ্লবী হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিলো। কেননা, তাদের শ্রেণীচ্যুতির কোনো কারণই ছিলো না। বরং শ্রেণীচ্যুত না হয়ে শোষিত কৃষক শ্রেণীর বিপ্লবী চরিত্রকে কলুষিত করা ও নেতৃত্বকে কেড়ে  নেয়ার কাজটিই তারা সম্পন্ন করে। এতে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে সঠিক বিপ্লবী নেতৃত্ব তৈরী হয়নি  সেই সময়। এ সব ফ্যাশনবেল আবেগী বিপ্লবীদের মধ্য থেকে তো হওয়ার কথাও নয়। যার কারণে, পেটিবুর্জোয়া ও বুর্জোয়া শ্রেণীর হাতেই ভারত দ্বিখ-িত হয়ে উপনিবেশমুক্ত হয়।

 এ তো গেল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও সংগ্রামের কথা। বাংলাদেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়। পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বাঙালিরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়ার পর অর্জনটাই হয় প্রধানত শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। এতে সমাজে শোষণের বিরুদ্ধে আবেগ তৈরি হয়। এই আবেগকে কাজে লাগায় নব্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল জাসদ। এই রাজনৈতিক দলটি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে আবেগ ছড়িয়ে দেয় তরুণ সমাজের ভেতর। তরুণসমাজও আবেগ তাড়িত হয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে বিপ্লব সফল করতে। এই উদ্দীপ্ত হওয়া তরুণ সমাজটিও বেশিরভাগ সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিলো। সুতরাং এখানেও  বিপ্লব করা বা বিপ্লবী হওয়া ছিলো ফ্যাশন, বিপ্লবও ছিলো ফ্যাশনেবল। জাসদ নেতৃত্বে বা কর্মীদের মধ্যেও শ্রেণীচ্যুতি ছিলো না। এ সময়  মাওবাদী বিপ্লবীরাও ছিলো মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আগত সন্তানরা।

একইভাবে বর্তমানে বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লব বা খেলাফত কায়েম করতে উদ্ধুদ্ধ ও উদ্দীপ্ত তরুণ সমাজের অতি  ক্ষুদ্র অংশটি  বিত্তশালী পরিবারের সন্তানই বেশির ভাগ। গত ১ জুলাই সংঘটিত গুলশান ট্রেজেডিতে অংশ  নেয়া তরুণদের সামাজিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলেই তা স্পষ্ট। তারা আবেগী ও ফ্যাশনেবল। ইন্টারনেটের সুযোগে ও মাধ্যমে এ তরুণরা বিভিন্ন ইসলামিক সাইটে পড়াশোনা, ইসলামিক গোষ্ঠীর সাথে  চ্যাটিং এবং আইএসএর কার্যক্রম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বেহেশতে যাওয়ার সহজ পথ প্রাপ্তিতে নিবেদিত হচ্ছে। এখানেও আবেগটাই প্রধান। অনেকটা ফ্যাশন! রোমাঞ্চ! বেহেশত যাওয়ার লোভ, তুচ্ছ এ  জাগতিক দুনিয়া।

কেন এসব হচ্ছে? কেউ কেউ উতসাহ দেখাচ্ছেন, গুলশান ট্রেজেডিতে অংশ নেয়া এরা তো কেউই  মাদ্রাসা  ছাত্র নয়- যারা ইসলামিক ধারায় শিক্ষালাভ করে,ধর্মকে নিয়ে ভাবে,গবেষণা করে,আল্লাহকে শক্তি মনে করে। তারা একধাপ এগিয়ে বলছেন, এতোদিন মাদ্রাসাগুলোকে দোষারোপ করা হচ্ছিল। বলা হচ্ছিলো- মাদ্রাসাই জঙ্গি তৈরী করছে। কিন্তু, গুলশানের ঘটনায় যুক্তদের পরিচয় মাদ্রাসা ছাত্র নয় বলে আত্মতৃপ্তি পাওয়ার কিছু নেই,মাদ্রাসায় পড়–য়া ছাত্ররাও এসব কার্যক্রমে অন্যতম একটি  অংশ রয়েছে। অন্যদিকে, আর্ন্তজাতিক যোগসুত্র যে কোনো বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে নিয়ামক হিশেবে কাজ করে। বর্তমানে যেভাবে আইএস ও আলকায়দার যোগসুত্র বিদ্যমান। অতীতেও ছিলো মাওবাদী চিন্তা ও মার্কসীয় মতবাদ এবং শ্রেণী সংগ্রাম।

বর্তমানে বাংলাদেশে সংঘটিত ঘটনার সাথে মাদ্রাসা ছাত্রই হোক অথবা কলেজ-বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষার্থীই যুক্ত  হোক- মূলত রোমাঞ্চ ও আবেগটাই পুঁজি। সবখানেই ফ্যাশন। বিপ্লবী সাজা যে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই গ্যাড়াকলকে কীভাবে খন্ডাবেন?

 খোজ করলে দেখবেন, পরিবারগুলো বা পরিবারের কর্তারা সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন। পরিবারগুলো সমাজের চাকচিক্যতার দৌঁড়ে ব্যস্ত। ব্যবসা,চাকরি সর্বোপরি  প্রতিপত্তি ধরে রাখতে গিয়ে সন্তানকে পরিচর্যা থেকে দূরে। উল্লেখযোগ্য  দেখভাল নেই।

সবশেষে যে কথাটি বলে লেখাটি  শেষ করতে চাই, তা হলো বাংলাদেশের মানুষের সচেতনতা। সচেতন শুধু পরিবার নয়,সমাজের সর্বক্ষেত্রে নাগরিক হিশেবে দায়-দায়িত্ব প্রয়োগ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে সন্তান কোথায় যায়, কিকি করে,ইন্টানেটে কিকি পড়ে, কোন ধরনের বই পড়ে, কোন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তি এক্সারসাইজ করে। যে কোনো বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হলেই মূল থেকেই দৃষ্টি ফেলতে হবে তার বা তাদের গতিবিধি, কর্মকান্ডের  ওপর। একইভাবেÑ প্রতিবেশীর সন্তান,পাড়ার ছেলেমেয়ে কি ভাবছে, তাদের চলাফেরা পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। প্রয়োজনে, তার অভিভাবককে অবহিত ও সহযোগিতা করা। দেখা গেছে,অভিজ্ঞতা নিরন্তর ছোটখাটো অবহেলার কারণে, সমাজ বা সমাজের ভিত অনেকবার নড়ে ওঠেছে। যদি সমাজকে  নাড়িয়ে  দেয়ার মতো  কোনো ঘটনা ঘটেÑতার দায় কীভাবে এড়াবেন অভিভাবক, প্রতিবেশী,পাড়ার লোক?

এ ক্ষেত্রে যা না বললে অপূর্ণ থেকে যাবে লেখাটি। মূলত,তরুণ সমাজ সব সময়ই নতুন কিছুর প্রতি আগ্রহী থাকে। আবিষ্কারের প্রতি উতসাহ, মনের মধ্যে  অন্তহীন জিজ্ঞাসা,অনুসন্ধিতসার শেষ নেই,তার মগজে কিলবিল করে রোমাঞ্চ। মেধার বিকাশ তো এভাবেই ঘটে। সুশিক্ষা আর কুশিক্ষার প্রকরণ ও ভেদাভেদ তাকে চিনিয়ে দেয়ার দায়িত্ব,অভিভাবক, শিক্ষক,সমাজপতি সকলের। এই জিজ্ঞাসা বা  রোমাঞ্চ প্রেমের হউক আর বিপ্লবের হোক অতিরিক্ত কিছুই সুফল বয়ে আনে না। যে কোনো নতুন বিষয়ে  বাংলাদেশের তরুণ সমাজের যে কোনো বিষয়ের প্রতি  রোমাঞ্চিত হওয়া দোষের নয়-তবে জ্ঞানহীন কর্মকান্ড, অন্ধ অনুসরণ থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনোভাবেই নির্বোধ হওয়া- নিজের,সমাজের বা দেশের জন্য শুভ নয়। অভিভাবকসহ সকল মহলের  শুভবুদ্ধির উদয় হউক। ৪ জুলাই ২০১৬, লন্ডন।