লাঙ্গল টু লন্ডন -১

184

ফারুক আহমদ

 

২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে লাঙ্গল টু লন্ডন   এই কথাগুলোকে নিয়ে বিলাতের বাঙালি কমিউনিটিতে নানা ধরণের প্রচার-অপপ্রচার চলছে।

 

ঘটনা হল, ঐদিন স্থানীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেল কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরীর ৮১তম জন্মদিন উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করে। এতে মূলত কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবী ও রাজনীতিবিদরাই উপস্থিত ছিলেন। বেশীর ভাগই ছিলেন সিলেটি।

 

অনুষ্ঠানে সাংবাদিক সৈয়দ নাহাস পাশা কথাপ্রসঙ্গে বিলাতের বাঙালি কমিউনিটির অর্জন ও অবদান নিয়ে লেখার জন্য অনুরোধ জানালে, এর জবাবে, আবদুল গাফফার চৌধুরী দীর্ঘ কথা বলেন। তাঁর কথার বেশীর ভাগই ছিল কমিউনিটিকে নিয়ে লেখার বিপদ সম্পর্কে।

 

উদাহরণ হিসেবে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বাঙালি কমিউনিটির কয়েকজনের নামোল্লেখ করে তাঁদের সম্পর্কে তির্যক কিছু কথাও বলেন। নির্বাহী মেয়র বিষয়ক তাঁর একটি লেখা কোনো বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করেনি, উল্লেখ করে এর কারণ সম্পর্কে যা বলেছেন তা-ও ছিল রীতিমত উদ্বেগজনক। বাংলা পত্রিকাগুলোর পাশাপাশি কয়েকজন ব্যক্তির নামোল্লেখ করায়, অনেকের ধারণা আবদুল গাফফার চৌধুরী নিজেই নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এই কমিউনিটির একজন বরেণ্য ব্যক্তি হিসেবে তিনি সব সময়ই শ্রদ্ধারপাত্র। কেউ তাঁর বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে কিছু বললে বা করলে পুরো কমিউনিটির পাশাপাশি বাংলা মিডিয়াও সব সময়ই তাঁর দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে কার্পণ্য করেননি, এখনো করবে না। তাঁরা অতীতে যেমন তাঁর সঙ্গে ছিলেন, এখনো আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। এর পরেও নিজের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এভাবে কথা বলার আদৌ কি কোনো প্রয়োজন ছিল? তিনি যাঁদের নাম উদাহরণ হিসেবে টেনে এনে মন্তব্য করেছেন, তাঁরা তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা অবাক হচ্ছি যে, ব্যক্তিগত বিষয়কে কমিউনিটির ইস্যুতে পরিণত করে, তা নিয়ে অহেতুক রাজনীতি চলছে, ইতিহাস বিকৃতি চলছে এবং পুরো বাঙালি কমিউনিটিকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

 

যেসকল বিষয়কে সামনে রেখে, বিশেষ করে সিলেটি কমিউনিটিকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, তা পুরোপুরি তুলে ধরে আলোচনা সম্ভব নয়, অভিপ্রেতও নয়। এর মধ্যে প্রধান তিনটি ইস্যু হচ্ছে: (১) আবদুল গাফফার চৌধুরী সিলেটিদের, ‘লাঙ্গল টু লন্ডন’ বলে অপমান করেছেন’! (২) তিনি বলেছেন সুদূর ‘আলাস্কায় গিয়েও দেখেছেন সেখানে বাঙালি দোকান খোলে বসে সিলেটিরা পান ও খবরের কাগজ বিক্রি করে’ এবং (৩) ‘সিলেটি একটি উপভাষা’। ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

পুরো অনুষ্ঠানটি দেখার পরে আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে মনে হয়েছে, তিনি সার্বিকভাবে সিলেটি কমিউনিটিকে নিয়ে যে সকল মন্তব্য করেছেন, তাতে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখানোর কোনো কমতি ছিল না। হতে পারে এ আমার জ্ঞানের দীনতা।

 

আমি প্রথম প্রশ্নের উত্তরে জানতে চাই, একটি কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে, গত ক’দশক আগেও যেখানে বাংলাদেশের শতকরা আশি-নব্বই ভাগ মানুষের প্রধান ও একমাত্র পেশা ছিল কৃষি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতীক হচ্ছে,- নৌকা, ধানের শীষ ও লাঙ্গল। সেখানে, ‘লাঙ্গল টু লন্ডন’ অর্থাৎ কৃষিকাজ করে লন্ডনে এসেছেন অথবা কৃষকরাই লন্ডনে এসেছেন কথাটি যদি কেউ বলেই থাকেন, তা অপমানজনক হবে কেন? আর লাঙ্গল চালানো বা কৃষিকাজ করাকে কেউ যদি অপমানজনক মনে করে থাকেন তা হলেতো তিনি একজন মূর্খ। বিলাতে কি শুধু সিলেটিরাই লস্কর হিসেবে এসেছেন? সংখ্যায় কম হলেও নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের মানুষেরা কি আসেননি?

 

অনুষ্ঠানে আবদুল গাফফার চৌধুরী যে মালেক মামার কথা বলেছেন তিনিওতো চট্টগ্রামের মানুষ। তা হলে তাঁরা কি কৃষকের সন্তান এবং লাঙ্গল টু লন্ডন নন? বলা বাহুল্য, আবদুল গাফফার চৌধুরী সিলেটিদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে, আমাদের পূর্বসূরি, ‘তাঁদেরকে যাঁরা লাঙ্গল টু লন্ডন বলে’, এই কথাটির দ্বারা নিন্দুকদের বিরুদ্ধেই প্রচ্ছন্নভাবে তাঁর ক্ষোভই প্রকাশ করেছেন।

 

আমি অবাক হয়েছি, এর প্রতিবাদে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সিলেটিদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মান, ইজ্জত, উন্নয়ন সব কিছুই ঠিকাধারী নেয়া একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্টের ইতিহাসজ্ঞান দেখে।

 

সভায় তিনি বলেছেন, “সিলেট প্রবাসীদের সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করার আগে আবদুল গাফফার চৌধুরীর জানা উচিত যাদেরকে তিনি লাঙ্গল টু লন্ডন বলে অবজ্ঞা করছেন সেই সিলেটের হবিগঞ্জের সন্তান বিপিন চন্দ্র পাল আবদুল গাফফার চৌধুরীর জন্মেরও কমপক্ষে ছয় যুগ আগে, ১৮৬২ সালে হাউজ অব কমন্সের সদস্য হন”!

 

এই একই কথা, একই সংগঠনের আরেকজন ডক্টরেট ডিগ্রিধারী কর্মকর্তা, একটি অনলাইন টেলিভিশন চ্যানেলে গিয়ে পুনরাবৃত্তি করেছেন। অথচ প্রকৃত তথ্য হচ্ছে, বিপিনচন্দ্র পালের জন্ম ১৮৫৮ সালের ৭ নভেম্বর। সে হিসেবে ১৮৬৪ সালে তিনি ছিলেন মাত্র পাঁচ বছরের বালক। তিনি কখনো ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন না এবং সে চেষ্টাও এখানে থাকাকালীন করেছেন বলে অন্তত আমাদের জানা নেই। তাঁর জীবনীতেও এর কোনো উল্লেখ নেই। তা হলে তথ্যটা তাঁরা পেলেন কোথায়?

 

আমার মনে হয় খবরের কাগজ বিক্রয় করা কিংবা কিনে নিয়ে পড়া অপমানজনক বিবেচনায় সেগুলো তাঁরা পড়েন না। নতুবা জানতেন, বিলাতের প্রথম বাঙালি কাউন্সিলার মনোয়ার হোসেন, প্রথম বাঙালি নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান, প্রথম বাঙালি এমপি রোশানারা আলী। বিশেষ করে রোশানারা আলীর যে প্রথম বাঙালি এমপি এই কথাটি ২০১০ সালের ৬ মে থেকে অহরহ লেখা হচ্ছে। এর পরেও কি তারা এই কমিউনিটির নেতা হিসেবে দাবি করতে পারেন?

 

দ্বিতীয় কথাটি ছিল, আবদুল গাফফার চৌধুরী সুদূর আলাস্কায় গিয়েও দেখেছেন, “সিলেটিরা বাঙালি দোকান খোলে বসে আছেন, পান ও খবরের কাগজ বিক্রি করেন।” এই কথাগুলোর মধ্যে অপমানের কী আছে?

 

ইউরোপের কোথাও এমন কোনো গ্রোসারি শপের মালিক আছেন কি যিনি তাঁর দোকানে পান বিক্রি করেন না? কিংবা খবরের কাগজ বিক্রি করতে অস্বীকার করবেন? পানতো আমাদের সংস্কৃতির একটি বড় উপাদান। এমনও সময় ছিল যখন পান ছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠানই পূর্ণতা পেত না।

বিলাতের বাঙালির যে দুইজন সবচে বড় ধনী, এবং আমাদের গৌরবের চূড়ামণি, তারা পান কিংবা খবরের কাগজ ব্যবসায়ি নন, সরাসরি মাছ ব্যবসায়ি। আলাস্কায় বাঙালি দোকান খুলে সিলেটিরা পান ও খবরের কাগজ বিক্রয় করে এই কথাটি না বলে, তিনি যদি বলতেন, বিলাতে সিলেটিদের মধ্যে মাছের ব্যবসা করেও শতাধিক মিলিয়ন পাউন্ডের মালিক হয়েছেন। তা হলে কি মিথ্যা বলতেন? নাকি সেটাও সিলেটিদের জন্য অপমানজনক বলে বিবেচিত হতো? আমারতো মনে হয় এই মধ্যযুগীয় মানসিকতা অন্তত বিলেতবাসী কোনো সিলেটি এখন আর পোষণ করেন না। এমনকি আমাদের পূর্বসূরিরাও যে করতেন না, ক্যারোলাইন অ্যাডাম্সের লেখা, “অ্যাক্রস সেভেন সিজ অ্যান্ড থার্টিন রিভার্স” গ্রন্থটিই তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

 

লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার ভাষ্যানুসারে বিলাতে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সবচে প্রভাবশালী বাঙালি মুসলমান হচ্ছেন সরোয়ার আহমদ। তাঁর এই প্রভাবের মূলে ছিল পত্রিকা ব্যবসা। তাঁর পিতা শুধু সাপ্তাহিক সুরমার মালিক-সম্পাদকই ছিলেন না, একইসঙ্গে পত্রিকার পরিবেশকও ছিলেন। তারা পত্রিকা চালিয়েই বিত্তবান হয়েছেন। এখনো তাঁরা তাঁদের পত্রিকা নিজেরাই বিলি করেন। কিন্তু তাঁরা কিংবা এই কমিউনিটির কেউইতো এটাকে অপমানজনক হিসেবে বিবেচনা করেন না। বরং তা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে গৌরবের সঙ্গে উল্লেখ করেন।

 

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, আবদুল গাফফার চৌধুরী পান ও পত্রিকা বিক্রয়ের উদাহরণ ছাড়া কী আর কোনো উদাহরণ খুঁজে পেলেন না? এ বিষয়ে একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করতে চাই। আমরা অনেক সময় আবদুল গাফফার চৌধুরীকে উপস্থাপন করতে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই বলে থাকি “তিনি আমাদের বটবৃক্ষ”। কিন্তু তাঁর বক্তব্যকে যদি এর ভিন্ন অর্থ করে, আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপে গিয়ে বলেন, “দেখ ব্যাটার কত বড় সাহস! সে আবদুল গাফফার চৌধুরীকে বটবৃক্ষ বলে!” তারা যদি যুক্তি দেখান যে, বটবৃক্ষ হচ্ছে এমন একটি গাছ যে গাছের নীচে ঘাসও হয়না। জ্বালানি কাঠ ছাড়া বটবৃক্ষ আর তেমন কোনো কাজেও লাগে না।” তারা যদি আরও যুক্তি দেখান যে, আমি কি আবদুল গাফফার চৌধুরীকে বটবৃক্ষ না বলে আম, কাঁঠাল, লেচু, কমলা ইত্যাদি ফলবতি গাছের সঙ্গে তুলনা করতে পারতাম না? তা হলে কি তাদেরকে দোষ দেয়া যাবে? না যাবে না। এখানে দুটো অভিমতই সঠিক। কিন্তু প্রথমটা ভালোবাসাজাত এবং দ্বিতীয়টি উদ্দেশ্যমূলক।

 

আবদুল গাফফার চৌধুরীকে সবক দিতে গিয়ে কেউ কেউ বলেছেন, “আলাস্কায় গিয়ে তিনি একজন সিলেটিকে পান বিক্রি করতে দেখে সেটিই তার কাছে বড় উদাহরণ হয়েছে। কিন্তু সিলেটের বিয়ানীবাজারের সন্তান হাসিম ক্লর্ক এখন থেকে কমপক্ষে দুই যুগ আগেই যে আমেরিকার হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ-এর সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সেই গৌঁরবগাঁথা আবদুল গাফফার চৌধুরীর নজরে আসেনি”।

 

কোটেশনভুক্ত এই কথাগুলো শুনে এখন যদি বিয়ানীবাজারবাসীরা ক্ষেপে গিয়ে প্রশ্ন তুলেন, আপনি তাঁদের এই কৃতিসন্তানের নামটি বিকৃত বললেন কেন? আপনি কি তাঁর সঠিক নাম, “হ্যানসন ক্লার্ক (Hansen Clarke) অথবা হাসান আলী হাশিম (Hasan Ali Hashim)” বলতে পারতেন না? অথবা, যদি প্রশ্ন করেন,- তিনি “ইউএস রিপ্রেজেনটেটিভ ফর মিশিগান’স থার্টিন্থ কংগ্রেসিওনাল ডিসট্রিক্ট ছিলেন ২০১১ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত”। আপনি সেটাকে কমপক্ষে দুই যুগ আগে বললেন কেন? তা হলে উত্তরটা কী হবে? অর্থাৎ আমি জানতে চাচ্ছি আপনি তথ্য বিকৃতির অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন কি না?

 

তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল, আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেছেন ‘সিলেটি একটি উপভাষা’। এই ঐতিহাসিক বিষয় নিয়েও সিলেটিদের মাথা-মগজ হিসেবে দাবিদার একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ইতিহাসজ্ঞান দেখে আরও অবাক হয়েছি। এর মধ্যেও আরেকজন ডক্টরেট ডিগ্রিধারীর বক্তব্য ছিল, “আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেছেন, সিলেটি কোনো ভাষা নয়। আমি তাঁকে পরামর্শ দিতে চাই আপাতত লেখালেখি কম করেন এবং কম কথা বলেন। আরো পড়াশোনা করেন। দেখবেন, সিলেটি ভাষার উৎপত্তি যেই নাগরী ভাষা থেকে সেই ভাষার পূর্ণাঙ্গ বর্ণমালা রয়েছে। এটি উপ-ভাষা নয়”।

 

তাঁর এই বক্তব্যে আমি অবাক না হয়ে পারিনি। আবদুল গাফফার চৌধুরীর বক্তব্যের উত্তর দিতে গিয়ে, সিলেটি ভাষা সম্পর্কে ভুল তথ্য উপস্থাপন করে বলা যায়, তিনিও ইতিহাস বিকৃত করেছেন।

 

এবার আমরা সিলেটি ভাষা আঞ্চলিক উপ-ভাষা কি না সে সম্পর্কে সিলেটিসহ ভারতখ্যাত কয়েকজন গবেষকের ভাষ্য উল্লেখ করে এর সমাধানে পৌঁছাতে চেষ্টা করব। সিলেটি ভাষা সম্পর্কে গবেষক, অধ্যাপক আসাদ্দর আলীর ভাষ্য হচ্ছে: “সিলেটি নাগরি বলতে এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী লিপিকে বুঝায়, যার পেছনে ‘সিলেটি নাগরি ভাষা’ বলে আদৌ কোনো ভাষার অস্তিত্ব বর্তমান নেই। শুধুমাত্র যে এখন বর্তমান নেই তা নয়, অতীত কালে ‘সিলেটি নাগরি ভাষা’ বলে কোনো ভাষা ছিলো না, এমনকি ভবিষ্যতেও থাকার কথাটা পর্যন্ত স্বপ্নযোগেও কল্পনা করা অসম্ভব। আসলে কেবলমাত্র বাংলা ভাষাকে লিখিতভাবে প্রকাশ করার জন্যই কঠিন-জটিল বাংলা লিপির সহজতম বিকল্পলিপি হিসেবে ‘সিলেটি নাগরি লিপি’ বা ‘সিলেটি নাগরি হরফ’-এর উদ্ভাবন ঘটানো হয়েছিলো (সাপ্তাহিক সুরমা, ১১ই এপ্রিল ২০০২)।

 

এই বিষয়ে দেওয়ান নুরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী তাঁর “আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা: উত্তরাধিকার ও মুসলমানি নাগরী শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন: “দেবনাগরী জাত আগ্রাসন থেকে মুক্তিলাভের লক্ষে দেব নাগরীর প্যারালাল মুসলমানি নাগরীর সৃষ্টি হয়। সুতরাং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা হাসিলের হাতিয়ার ছিল এই সিলেটী নাগরী। এ কথাটি জানান দেবার জন্যই ‘নাগরী’ কথাটি সংরক্ষিত থাকে। সিলেটী নাগরীতে বাংলা লিপির আধিক্য থাকা সত্ত্বেও সিলেটী নাগরী নামকরণের অন্য কোনো ব্যাখ্যা জানা যায় না। উল্লেখ্য, সিলেটী নাগরী প্রধানত সিলেটের কথ্যবুলি বা আঞ্চলিক ভাষাকেই (বাংলা ভাষা বা বাংলা উপভাষা) অবলম্বন করেছে (পৃ.-৮) ।” অর্থাৎ তিনিও এটাকে উপভাষা বলছেন!

 

সিলেটি নাগরি ভাষার গবেষক ড. গোলাম কাদির লিখিত এবং বাংলা একাডেমি থেকে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত “সিলেটী নাগরী লিপি : ভাষা ও সাহিত্য” শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থের ফ্লাপেও লেখা আছে: “বাংলা ভাষাসাহিত্যের লিখন ও পঠন-পাঠনের চর্চায় বাংলা লিপিমালার বিকল্প একটি লিপিমালার নাম সিলেটী নাগরী। শতের শতকে এ লিখির উদ্ভব ঘটে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে।”

 

এই একই ধরণের অভিমত পাওয়া যায় সিলেট ডিসট্রিক গেজেটিয়ার সম্পাদক বি সি অ্যালেন, ঐতিহাসিক শ্রীঅচুতচরণ চৌধুরী, যোগেশচন্দ্র ঘোষ, অধ্যাপক শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ড. সুকুমার সেন, ড. আহমদ হাসান দানী, নগেন্দ্রনাথ বসু, মুন্সি আশরাফ হোসেন প্রমুখের লেখা থেকেও। যুগ যুগ ধরে এই একই কথা সিলেটিরা বলছেন। কিন্তু এ নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলছেন না। অথচ এই একইকথা আবদুল গাফফার চৌধুরী বলায়,- গেল গেল রব উঠবে কেন? ভালো কথা, ডক্টরেট সাহেবের উপদেশ মতে, এখন কে আরও পড়াশোনা করবেন? তিনি না আবদুল গাফফার চৌধুরী?

 

ওদিকে, আরেকটি সংগঠন আবদুল গাফফার চৌধুরীর বিরোধীদের প্রতিবিরোধিতা করতে গিয়ে প্রেস কনফারেন্স করে বলেছেন: “সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরীর ৮১তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সরল মনে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশকে অপব্যাখ্যা করে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে স্বাধীনতা-বিরোধী গোষ্ঠী! এই মিথ্যাচারের সঙ্গে যারা জড়িত তারা সবাই একটি বিশেষ রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী যা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী” (সুরমা, ৮ই জানুয়ারি ২০১৬)।

 

এঁদের প্রতিও শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আবদুল গাফফার চৌধুরীর বিরোধীরা যেমন স্বঘোষিতভাবে সিলেটবাসীর দণ্ডমুণ্ডের কর্তা সেজেছেন, আপনারাও কি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সৌল এজেন্সি নিয়েছেন? কোনো বিষয় জানা ও বুঝার মধ্যে তারতম্য থাকতেই পারে। সেজন্য সবাইকে ঢালাওভাবে একই পাল্লায় তুলা কি সঠিক?

 

আমার জানামতে, এই প্রচার-অপপ্রচারের সঙ্গে জড়িত বেশীর ভাগ মানুষই সহজ-সরল। এর মধ্যে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন। এই অপপ্রচারে স্বাধীনতা-বিরোধীদের ইন্ধন থাকতেই পারে অথবা অবশ্যই রয়েছে। এঁদের দুরভিসন্ধি ও অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার কথা না বলে, সবাইকে স্বাধীনতা-বিরোধী বলে বড়দাগে চিহ্নিত করা কি অন্যায় নয়? কারণ, এই শব্দটি এখন বাংলাদেশে সবচে বড় একটি,- ‘গালি’।

 

পরিশেষে বলি, আপনারা আবদুল গাফফার চৌধুরীকে বলির পাঠা হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চান, ইচ্ছেমত করুন। অথবা দেবতার আসনে বসাতে চান,- তা-ও বসান। কিন্তু দয়া করে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে পুরো সিলেটি কমিউনিটিকে টেনে এনে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবেন না, অথবা তাঁদেরকে ঢালাওভাবে স্বাধীনতা-বিরোধী বলে চিহ্নিত করবেন না। আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে ভবিষ্যৎ-প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করবেন না। এ আমার বিনীত অনুরোধ।