প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ডাঃ নীহার রঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক বাড়ির বেহাল দশা এস এম সুলতানের ‘শিশু স্বর্গ-২’ বন্ধ

155

 

শাহজাহান সাজু

উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঔপান্যানিক ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক বাড়িটির এখন বেহালদশা। অনাদর আর অবহেলায় খসে পড়ছে বাড়িটির পলেস্তারা। তাঁর পৈত্রিক বাড়িসহ সম্পত্তি দখল করার জন্য স্থানীয় ভূমিদস্যূরা সক্রিয় রয়েছে। এই প্রথিতযশা ঔপন্যাসিকের জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী সরকারী উদ্যোগে পালিত হয় না । এ নিয়ে শিক্ষিত ও সচেতন মহলে রয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ।

১৯১১ সালের ৬ জুন পিতা সত্য রঞ্জন গুপ্তের কর্মস্থল কলকাতায় ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্ত জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান কলকাতায় হলেও তাঁর পৈত্রিক নিবাস নড়াইলের লোহাগড়ার উপজেলার ইতনা গ্রামে। প্রায় ৭০ শতক জমির ওপর তাঁর পৈত্রিক বাড়িটি অবস্থিত। এখানে রয়েছে একটি দ্বিতল বাড়ি, পুকুরসহ গাছ পালা। প্রখ্যাত এই বাঙালি সাহিত্যিকের পৈত্রিক বাড়িটি এখনও অরক্ষিত। ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্তের শেষ স্মৃতি চিহ্নটুকু বাড়িটি পরিণত হয়েছে মাদকসেবিদের আড্ডাস্থল হিসেবে। বাড়িসহ তাঁর সম্পত্তি ভূমিদস্যুরা গ্রাস করার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্তের পিতা সরকারী চাকুরীজীবী হওয়ার সুবাদে তিনি গাইবান্ধা হাইস্কুলসহ বেশ কয়েকটি স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৩০ সালে তিনি কোন্ন নগর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে কৃষ্ণনগর কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই তিনি আইএসসি পাস করেন। তিনি আরজিকর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে এমবিবিএস পাশ করেন। ডাক্তারি পাস করে বেশ কিছুদিন প্রাকটিস করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সামরিক বাহিনীতে ডাক্তার হিসেবে যোগদান করেন। চাকরির বাঁধাধরা নিয়ম তাঁর কাছে বিরক্তিকর মনে হওয়ায় তিনি এ চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুনরায় কলকাতায় ডাক্তারি  পেশা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেন।

 

নীহাররঞ্জন গুপ্তের সাহিত্যে হাতেখড়ি হয়ে ছিল সুদূর শৈশবেই। ১৬ বছর বয়সেই তাঁর প্রথম লেখা ওপন্যাস ‘রাজকুমার‘ প্রকাশিত হয়। রহস্য উপন্যাস লেখায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্ধন্ধি। কেবলমাত্র রহস্য উপন্যাস নয়, তাঁর সামাজিক ঔপন্যাস গুলি সুখপাঠ্য, যা পাঠককুলকে আকৃষ্ট করেছিল।

তাঁর লিখিত উপন্যাসের সংখ্যা দুইশতেরও অধিক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের  মধ্যে ‘মঙ্গলসূত্র’, ‘উর্বশী সন্ধ্যা’, ‘উল্কা’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘অজ্ঞাতবাস’, ‘অমৃত পাত্রখানি’, ‘ইস্কাবনের টেক্কা’, ‘অশান্ত ঘূর্ণি’, ‘মধুমতি থেকে ভাগীরতী’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘অহল্যাঘুম’, ‘ঝড়’, ‘সেই মরু প্রান্তে’, ‘অপারেশন’, ‘ধূসর গোধূলী’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’, ‘কালোভ্রমর’, ‘ছিন্নপত্র’, ‘কালোহাত’, ‘ঘুম নেই’, ‘পদাবলী কীর্তন’, ‘লালু ভুলু’, ‘কলঙ্ককথা’, ‘হাসপাতাল’, ‘কাজললতা’, ‘অস্থি ভাগীরথী তীরে’, ‘কন্যাকুমারী’, ‘সূর্য তপস্যা’, ‘মায়ামৃগ’, ‘ময়ূর মহল’, ‘বাদশা’, ‘রাত্রি নিশীথে’, ‘কনক প্রদীপ’, ‘মেঘকালো’, ‘কাগজের ফুল’, ‘নিরাল প্রহর’, ‘রাতের গাড়ী’, ‘কন্যা কেশবতী’, ‘নীল তারা’, ‘নূপুর’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘মধুমিতা’, ‘মুখোশ’, ‘রাতের রজনী গন্ধা’ উল্যেখযোগ্য।

নীহার রঞ্জন গুপ্তের ৪০টিরও অধিক উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। এ গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘উল্কা’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘লালুভুলু’, ‘হাসপাতাল’, ‘মেঘ কালো’, ‘রাতের রজনী গন্ধা’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘নূপুর’, ‘ছিন্নপত্র’, ‘বাদশা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘মায়ামৃগ’, ‘কাজললতা’, ‘কন্যাকুমারী’, ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ প্রভৃতি।

তাঁর এই চলচ্চিত্রায়িত উপন্যাস গুলো আমাদের চলচ্চিত্র জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘লালুভুলু’ পাঁচটি ভাষায় চিত্রায়িত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে উপন্যাসটি বাংলাদেশেও চিত্রায়িত হয় এবং দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। নীহার রঞ্জন গুপ্তের বহু উপন্যাস থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘উল্কা’ থিয়েটারের দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে।

চিকিৎসক হিসেবে কর্মচঞ্চল জীবনযাপনের মধ্যেও নীহার রঞ্জন রেখে গেছেন অসংখ্য সাহিত্যধর্মী সৃষ্টি, যা আপন সত্তায় ভাস্কর হয়ে থাকবে যুগের পর যুগ। নীহার রঞ্জন গুপ্ত ১৯৮৬ সালের ২০ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতা শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৯০ দশকে ডাক্তার নীহার রঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক বাড়িতে ইতনার চিত্রশিল্পী আলী আজগর রাজা ও শিক্ষক নারায়ন চন্দ্র বিশ্বাস ‘শিশু স্বর্গ-২’ গড়ে তোলেন এবং এটির উদ্বোধন করেন বিশ্ব বরেণ্য চিত্রশিল্পী প্রয়াত এস এম সুলতান। ওই বাড়িতে শিশুদের চিত্রকলার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। পরবর্তীতে পৃষ্টপোষকতার অভাবে শিশু স্বর্গ-২ এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর থেকেই ওই বাড়িটি সমাজ বিরোধীদের আড্ডা স্থল হিসেবে ব্যবহার  হচ্ছে। তা ছাড়া স্থানীয় ভূমিদস্যূ চক্র ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক বাড়িটি নামে বেনামে দখল করার  চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইতনা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা বিশ্বনাথ গাঙ্গুলী বলেন, ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহন করেও তাঁরা আমাদের কবি। তাঁদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য ভাবে পালিত হচ্ছে। অথচ এই বরেণ্য ঔপন্যাসিক আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করলেও আমরা তাকে ভুলতে বসেছি। আমাদের প্রজন্ম জানেই না, নীহার রঞ্জন গুপ্ত কে এবং তিনি কি ছিলেন। তিনি অবিলম্বে তাঁর পৈত্রিক বাড়িটি রক্ষা করে তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় সরকারিভাবে পালন করার দাবী জানান’।

সিনিয়র সাংবাদিক রূপক মুখার্জি ‘জাতীয়ভাবে এই বরেণ্য ঔপন্যাসিকের জন্ম ভিটা রক্ষাসহ তাঁর জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী পালনের দাবী জানান।

লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সেলিম রেজা বলেন, ‘আমি নিজে ডা. নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়িটি পরিদর্শন করেছি। বাড়িটি সংস্কারের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে। প্রতি বছর তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী সরকারিভাবে পালন করার জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।