সাক্ষাৎকার: আমি বলতে চাই না অতীত খারাপ বা বর্তমান ভালো : শাহীন আখতার

97

শাহীন আখতার। জন্ম ফেব্রুয়ারি ১৯৬২, কুমিল্লায়। ইতিহাস-পুরাণ খনন করে তুলে আনেন নারী সাম্যের সূত্রগাথা। গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, ‘শ্রীমতির জীবন দর্শন’, ‘বোনের সঙ্গে অমরলোকে’, ‘আবারো প্রেম আসছে’ প্রভৃতি। উপন্যাস- ‘তালাশ’, ‘সখী রঙ্গমালা’, ‘ময়ূর সিংহাসন’ প্রভৃতি। এছাড়া ‘সতী ও স্বতন্তরা’ তিন খণ্ডে বাংলা সাহিত্যে নারীকথনের নির্বাচিত সংকলন। প্রকাশিত হয়েছে ‘গল্পসমগ্র-১’ ও ‘গদ্যসংগ্রহ-১’। পেয়েছেন আইএফআইসি পুরস্কারসহ ভারত থেকে ‘সাহিত্য সেরা বাঙালি’ পুরস্কার। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, শাহনাজ নাসরিন ও জাহিদ সোহাগ।

প্রশ্ন : তালাশ-এর মধ্যে এক ধরনের ফিল্ডওয়ার্ক দেখা যায়, আপনি এটা কিভাবে করলেন বা নিজে করলেন নাকি?

উত্তর : আমি তালাশ লেখার আগে মুক্তিযুদ্ধের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পে কাজ করেছি। প্রকল্পটি আমার কর্মস্থল ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ শুরু করে ১৯৯৬ সালে। শেষ হয় ১৯৯৯ নাগাদ। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ২৫ বছর পর এমন একটি প্রকল্প শুরু করার কারণ ছিল- যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর বয়ান লিপিবদ্ধ করা। ৬-৭ জনের একটি টিম সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাজ করে তখন। আমি তাদের মধ্যে একজন। কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের শেষ দিকে যখন উপন্যাস লেখার চিন্তাটা মাথায় আসে, তখনও কিছু গবেষণার কাজ করতে হয়েছে। কারণ দুই লাখ ধর্ষিত নারীর কথা বলা হলেও এটি মুক্তিযুদ্ধের একটি আড়াল করা অধ্যায়। উপন্যাসের জন্য আমার কিছু ডিটেইলের প্রয়োজন ছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতি ভালোভাবে অনুধাবন করারও কোনো বিকল্প ছিল না। এ পর্বে সে সময়কার খবরের কাগজের ছোট ছোট শিরোনাম, নিউজের সূত্র ধরে আমাকে এগোতে হচ্ছিল। প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ আর জটিল। বেশ কাঠখড় পোড়ানোর পর কয়েকজন ধর্ষণের শিকার নারীর সাক্ষাৎকার নিতে সক্ষম হই। একেকটা সাক্ষাৎকারে সময়ও লেগেছে বিস্তর। তাতে প্রায় প্রতিদিনই অবাক হওয়ার মতো ঘটনা থাকত। নতুন নতুন তথ্য থাকত। পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে মেয়েরা শুধু ধর্ষণের শিকার হননি। গা-ভর্তি বেয়নেটের খোঁচা তারা কাপড় সরিয়ে দেখাতেন। যশোর সেনানিবাসের বন্দি একজন মেয়ে বলেছিলেন- তাঁকে অস্ত্রের মুখে কবর খুঁড়তেও হয়েছিল। আমি তালাশ লিখতে শুরু করি ২০০১ সাল নাগাদ। বই আকারে ছাপা হয় ২০০৪ সালের একুশে বইমেলায় মাওলা ব্রাদার্স থেকে।

প্রশ্ন : এই কাজ করে লিখতে সুবিধা হয়েছে কিনা?

উত্তর : তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ৭১-এর ওর‌্যাল হিস্টি প্রজেক্টে কাজ না করলে আমার তালাশ লেখাই হতো না।

প্রশ্ন : নারীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারটা বাংলাদেশে হাইট করা হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশে যেমন রাশিয়ার বিপ্লবে কিন্তু তা করা হয় নাই।

উত্তর : নারীর ধর্ষণ হওয়ার ব্যাপারটা বাংলাদেশেই শুধু লুকানো হয় না, দুনিয়ার অনেক দেশেই হয়। আমি এশিয়ার কিছু দেশের নারীর কথা জানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁরা নৃশংসভাবে জাপানি সৈন্যদের যৌন নির্যাতনের শিকার হন। তাঁদের কমফোর্ট উইমেন বলা হয়ে থাকে। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে টোকিওতে ‘উইমেন্স ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল’ নামে এ বিষয়ে একটি প্রতীকী ট্রাইব্যুনাল অনুষ্ঠিত হয়। আমি ওখানে এটেন্ড করি এবং ট্রাইব্যুনালের তিনদিনের শুনানিতে ৩৫ জন কমফোর্ট উইমেনের টেস্টিমনি শুনি। তাঁরা ছিলেন কোরিয়া, চীন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার। এবং প্রত্যেকেই ছিলেন নিম্নবিত্তের, যাদের কাছে সমাজের মান-ইজ্জত রক্ষার দাবিটি ক্ষীণ। কমফোর্ট উইমেনের টেস্টিমনিতে যুদ্ধোত্তর সময়ে সামাজিকভাবে তাঁদের বয়কট ও নির্যাতনের কথা ছিল। কারণ তাঁরা শুধু যুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্ত নারী নয়, ধর্ষণের শিকার নারী।

প্রশ্ন : তালাশ-এর মধ্যে যুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর ইতিহাস মানে সামরিক শাসন পর্যন্ত আছে। এবং ভবিষ্যত রাজনীতির প্রবণতাও। সেটা কি আপনি এই প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে করতে অনুভব করেছেন?

উত্তর : তালাশ-এ যুদ্ধোত্তর সময়টা আমি সামরিক বা গণতান্ত্রিক শাসনামল বিবেচনা করে আনি নাই। যুদ্ধে ধর্ষিত নারীর যুদ্ধোত্তর সময়ের অবস্থাটা আমি উপন্যাসে আনার প্রয়োজন অনুভব করে লিখেছি। এটা আমার মূল পরিকল্পনায়ই ছিল। নয় মাসে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ধর্ষিত নারীর নিপীড়ন যুদ্ধকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তা চোরাবালুর তল দিয়ে অদৃশ্যভাবে বইতে থাকে, যদ্দিন ওই নারীটি বেঁচে থাকেন। তাই তালাশ-এ যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী দু’ধরনের বাস্তবতা আছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়কাল প্রায় আটাশ বছর- মূল চরিত্র মরিয়মের অন্তর্ধান পর্যন্ত।

প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধকে একজন নারীর দৃষ্টিতে দেখার ব্যাপার আছে তালাশ-এ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক সাহিত্যের বিবেচনায় বিষয়টি নতুন কিনা?

উত্তর : আমার মনে হয় না এ ব্যাপারে তালাশ একমাত্র উপন্যাস। তালাশ-এর অভিনবত্ব, তাতে যুদ্ধ-পরবর্তী সময় বিশাল পরিধি জুড়ে আছে। আর সেটা ধর্ষিত মেয়েদের নিয়ে লেখা উপন্যাস বলে।

প্রশ্ন : সখী রঙ্গমালা-লেখা হয়েছে পুরনো একটি লোক কাহিনিকে ভিত্তি করে। প্রায় দু’শ বছরের পুরনো একটি লোক কাহিনি নিয়ে উপন্যাস লেখার ভাবনার শুরুটা জানতে চাই।

উত্তর : দক্ষিণ সমতট অঞ্চলের একটি কিংবদন্তিকে উপজীব্য করে লেখা আমার তৃতীয় উপন্যাস সখী রঙ্গমালা। এটি দুই শতাধিক বছর আগেকার একটি ঐতিহাসিক ঘটনাও বটে, যার কথা নোয়াখালী জেলার গেজেটিয়ারে কয়েক ছত্রে উল্লেখ আছে। এই ঘটনা নিয়ে অজস্র গীত বাঁধা হয়েছে, পালাগান রচিত হয়েছে। আমি ড. দীনেশচন্দ্র সেনের ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’য় যে পালাগানটি পাই, এর নাম চৌধুরীর লড়াই। চৌধুরীর লড়াই পড়তে পড়তে সখী রঙ্গমালা লেখার ভাবনাটা মনে আসে। রঙ্গমালার দুভার্গ্যই মনে হয় আমাকে টেনেছে বেশি। সামান্য বারবনিতা- গীতিকারদের দয়ামায়াও জোটে নাই। এ জায়গায় অতীতের সঙ্গে হালের দুনিয়ার গভীর মিল। কিন্তু অন্যভাবে মানুষ তাকে মনে রেখেছে। রঙ্গমালার ভিটেয় এখন যারা থাকেন, তারা তাকে মহিয়সী নারী ভাবেন। আমি রঙ্গমালার খুন হবার দৃশ্যটি লিখে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। বিশ্বাস হচ্ছিল না- এত গ্রেসফুল, এত মর্যাদাসম্পন্ন! হাড়িকাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দৃপ্তপায়ে। আমি হয়ত এভাবেই ওকে কল্পনা করি। আমার এ ভাবনাটা পরে ফুলেশ্বরীর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। আমি কোনোভাবে চাই নাই যে, একজন পুরুষ মানুষের জন্য ফুলেশ্বরী-রঙ্গমালা একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াক। জলটুঙ্গি ঘরে স্বামী রাজচন্দ্রের বাহুলগ্না সুন্দরী রঙ্গমালা- এ দৃশ্য দেখার পর স্ত্রীর বিরাগ বা কৌতূহল, যা-ই বলি, ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। রঙ্গমালাকে নিজের আরেকটি সত্তা হিসেবে ভাবতে শুরু করে ফুলেশ্বরী। সে এক আশ্চর্য সম্পর্ক, রঙ্গমালার প্রয়াণেও যার লয় হয় না। অন্ধকার ঘরে, ঘুমহীন রাতে সে বারবার ছায়া হয়ে আসে। নিঃসঙ্গতায় সঙ্গ দেয়। রঙ্গমালার প্রতি অপার সখীত্ববোধ- চরম দুর্দশায়ও রাইয়ের বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। এক কথায় রঙ্গমালাই আমার এ উপন্যাস লেখার আদি প্রেরণা।

প্রশ্ন : ময়ূর সিংহাসন- উপন্যাসে সম্রাটের অবহেলিত পুত্র সুজাকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, কাতিব চরিত্রটির বাস্তবতা সম্পর্কে আপনার মত কি?

উত্তর : ময়ূর সিংহাসন- উপন্যাসে কেন্দ্রিয় চরিত্র একাধিক। নানাজনের বয়ানে বলা কাহিনি এটি। অবশ্য উপন্যাসের কেন্দ্রিয় বিষয় বা যে বিষয়টি উপন্যাসে গুরুত্ব পেয়েছে, তা হচ্ছে মোগল শাহজাদা শাহ সুজার সিংহাসন নিয়ে লড়াই, পরিশেষে সপরিবারে মৃত্যুবরণ, আজকের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে। তখনকার নাম আরাকান, যার রাজধানী ছিল রোসাঙ্গ। তবে ময়ূর সিংহাসনকে যদি মোগল শাহজাদার আরাকানে পলায়ন, ভিনদেশে মৃত্যু বরণের কাহিনি বলি, এর পুরোটা বলা হয় না। ময়ূর সিংহাসন উপন্যাস যুদ্ধ-বিগ্রহের আড়ালে মোগল হারেমেরই কাহিনি। যে স্থান নিয়ে আমাদের কৌতূহলের শেষ নাই। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের দৌলতে এর একটা বিকৃত চেহারা দেখতে পাওয়া যায়- যা মুসলমান বাদশাদের ভোগ-বিলাস আর ব্যভিচারের লীলাক্ষেত্র। মেয়েরা সেখানে অসতী, না হয় জড়বস্তু। এর প্রতিফলন আমরা বঙ্কিমের সাহিত্যে ব্যাপকভাবে দেখি। মোগল হারেমের বিকৃতিকরণের চ্যালেঞ্জটুকু ময়ূর সিংহাসন উপন্যাসে মোকাবেলা করতে হয়েছে। কাতিব মোগল দরবারের একজন কর্মচারী- কলমজীবী। এটা তাঁর পদবী। বাস্তবে শাহ সুজার দরবারে কাতিব অবশ্যই ছিল। কিন্তু ময়ূর সিংহাসনের কাতিব সম্পূর্ণ কাল্পনিক চরিত্র। সে একজন নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক, যে গোটা বাংলা অঞ্চলের নানা মানুষের ধূলি-মলিন কাহিনি নিয়ে এগিয়ে যায় রাজমহল থেকে রাখাইন রাজ্যের দিকে। উপন্যাসের উপসংহারে তাঁর ভূমিকা অনেক।

প্রশ্ন : সতী ও স্বতন্তরায় চর্যাপদ থেকে আধুনিক সময়ের নারীত্বের অবস্থান, পরিস্থিতি, দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান করা হয়েছে…সেই সময় থেকে এই সময়ে নারীর প্রতি রাষ্ট্র, সমাজ, পুরুষের ভাবনায় খুব পরিবর্তন হয়েছে কিনা, কোন বিশেষ পরিবর্তনগুলি চিহ্নিত করবেন…বিস্তারিত জানতে চাই।

উত্তর : ‘সতী ও স্বতন্তরা’য় বিষয় ধরে অধ্যায়-বিভাজন করা হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রাচীন সাহিত্যিক থেকে নব্যসাহিত্যিকের রচনা। তাঁদের ভাবনা-চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে সে সব বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়গুলিতে। তা থেকে তূলনামূলক পাঠ অবশ্যই সম্ভব। কাজটা আমি পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিতে চেয়েছি। আমি কখনো বলতে চাই না যে, অতীত খারাপ বা বর্তমান ভালো। এ ব্যাপারে আমার মনোভাব এটুকু বলাই মনে হয় যথেষ্ট।

প্রশ্ন : আমাদের আখ্যানে কল্পনা বলেন বা রূপকথা বলেন এসব নেই। সবাই খুব সিরিয়াস লেখেন, মানে লেখাটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চায়। অথচ আমাদের অভিজ্ঞতায় ঠাকুরমার ঝুলি বা আরব্য রজনীও আছে। আরব্য রজনীর মতো করেও কি কোনো চরিত্র আমরা দাঁড় করাতে পেরেছি? নাগিব মাহফুজের এরাবিয়ান নাইটস এন্ড ডেজও তো আছে। এটা কি পাঠক সমাজের প্রতি লেখকদের আস্থাহীনতা কিনা?

উত্তর : আমাদের আখ্যানে কল্পনা নেই? রূপকথা নেই বলা যায়। আমার মনে হয় এর মূল কারণ আমাদের ঔপনিবেশিক শিক্ষা-দীক্ষা। যা যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক হতে বলে। আমাদের প্রাক-ঔপনিবেশিক সাহিত্য, যা ‘মধ্যযুগ’এর সাহিত্য নামে পরিচিত, তা রূপকথা, অলৌকিকতায় ভরপুর। ‘সতী ও স্বতন্তরা’ নামের সংকলন করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে- হাজারোর্ধ্ব সময়কালে বাংলা সাহিত্যের বেশ কিছু অস্পষ্ট বাঁক আছে। উনিশ শতকের সূচনাকালকে বাঁক না বলে বিপর্যয়ই বলা যায়। নাট্যকার সেলিম আল দীনের ভাষায় যার নাম মধ্যখণ্ডন। এত বছর পরও এর মধ্যে আমরা সেতু গড়তে পারি নাই। গার্সিয়া মার্কেস ও ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্য প্রভাবিত ম্যাজিক রিয়ালিজমের চর্চা চোখে পড়ে। তার মধ্যে শহীদুল জহীরের ‘ডুমুর খেকো মানুষ’ তুলনাহীন। সৌজন্যে,বাংলাট্রিবিউন