ব্রিটিশ-বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা মনসুর আলির : ‘সংগ্রাম’

60

লন্ডনের লেস্টার স্কোয়ারে এক বড় সিনেমা হলে ‘সংগ্রাম’ ছবির প্রিমিয়ার শো। ছবি দেখানো শেষ হওয়ার পর পরিচালক মনসুর আলি দর্শকদের নানা প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। সেসময় সামনে এগিয়ে এলেন এক পাকিস্তানি তরুণী।

“তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, এই ছবিটা তৈরি করার জন্য। আর আমি খুবই দুঃখিত যে আমার দেশ তোমাদের সাথে এই কাজ করেছে। তোমার ছবিটা না দেখলে জানতাম না, কি ঘটেছে।”

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা মনসুর আলির জন্যও এক নতুন অভিজ্ঞতা এটি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প তিনি শুনেছেন তাঁর বাবা-মার কাছে। কিন্তু ছবি করতে গিয়ে এই যুদ্ধের ইতিহাস জানার সুযোগ হলো আরও অনেক দৃষ্টিকোণ থেকে।

মনসুর আলির জন্ম বাংলাদেশে, বেড়ে উঠেছেন পূর্ব লন্ডনে। স্কুল শেষ করে যখন সিদ্ধান্ত নিলেন ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা করবেন, তখন অনেকেরই চোখ কপালে উঠলো। আত্মীয়-স্বজনরা বলাবলি করছিল, ছেলেটির বোধহয় মাথা খারাপ হয়েছে।

“আমাদের বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে পড়াশোনা মানে হচ্ছে একাউন্টিং, মেডিসিন, ল’ বা এরকম কোন বিষয়েই পড়তে হবে। কাজেই আমার এই সিদ্ধান্ত অনেকে ভালোভাবে নেয়নি। কিন্তু আমার বাবা-মা কিন্তু আমাকে পুরো সমর্থন দিয়েছে,” বলছিলেন তিনি।

 “ওরা বলেছিল, তোমার যা পছন্দ সেটাই কর।”

ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে পুরোপুরি সেটাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন মনসুর আলি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার তৈরি ছবি ‘সংগ্রাম’ সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ছবিটির একটি মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউডের নামকরা তারকা অনুপম খের।

সংগ্রাম ছবির গল্পটা কি?

“এই ছবিতে অনুপম খের একজন মুক্তিযোদ্ধা। প্রেমে পড়েছিলেন এক হিন্দু মেয়ের। উনি মুক্তিযুদ্ধের পর লন্ডনে চলে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ৪০ বছর পর্যন্ত তিনি এই অভিজ্ঞতা কারও সঙ্গে শেয়ার করেন নি। উনি খুবই নিভৃতচারী। নিজের মধ্যে থাকতে ভালোবাসেন। কিন্তু লন্ডনে তার সঙ্গে দেখা হয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে। এই সাংবাদিকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইটালিয়ান তারকা আজিয়া আরজেন্টো।”

“এই সাংবাদিকের মাধ্যমেই আমরা আসলে এই মুক্তিযোদ্ধার অতীত ইতিহাস জানতে পারি।”

এত বিষয় থাকতে হঠাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি করার আগ্রহ হলো কেন?

“দেখুন, আমরা যেখানেই থাকি, নিজের শেকড় সন্ধান করার চেষ্টা করি। আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি জানার চেষ্টা করি। যখন ফিল্ম নিয়ে পড়ছি, তখন মনে হলো, আমি কে? আমি ব্রিটিশ। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য, আমি বাঙ্গালি। আমি তখন ভাবতে শুরু করি, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হিসেবে আমার যে ডাবল আইডেন্টিটি, সেটা কিভাবে কাজে লাগানো যায়।”

“তখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি করার সিদ্ধান্ত নেই। ছবি করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু জানতে এবং শিখতে পারলাম।”

পড়াশোনা শেষ করে মুনসুর আলী নিজেই একটি ছোট প্রোডাকশান কোম্পানি করেছিলেন। সেখান থেকে নানা ধরণের প্রমোশনাল ভিডিও করতেন। ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বেড়েছে। অনেক নামকরা তারকার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।

“অনুপম খের যে আমাকে সুযোগ দিলেন তাকে নিয়ে কাজ করার, ইট ওয়াজ ফ্যানটাস্টিক। উনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন এই ছবির প্রচারে।”

“বাংলাদেশে হয়তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক ছবি তৈরি হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য কিন্তু কোন ছবি তৈরি হচ্ছে না। যদি আমরা আন্তর্জাতিক দর্শকদের কথা ভেবে ছবি না করি, তাদের কাছে তো এই ইতিহাস তুলে ধরা যাবে না।”

মুনসুর আলি বিয়ে করেছেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র তারকা দিলরুবা ইয়াসমীন রুহিকে। লাইমলাইট ফিল্ম এওয়ার্ড নামে এক চলচ্চিত্র পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এবছর প্রথম তার উদ্যোগে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক চলচ্চিত্র উৎসব। সৌজন্যে বিবিসি বাংলা।