ইইউ-ব্রিটেন বিচ্ছেদ: ব্রিটিশদের দাবি দ্বিতীয় গণভোট, ‘স্বাধীন’ হতে চায় লন্ডনও

88

 

বিলেতবাংলা ডেস্ক, ২৬ জুন: ব্রেক্সিট এখন ভূমিকম্প হয়ে দেখা দিয়েছে খোদ ব্রিটেনেই। ইইউ জোট থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার গণভোটের পর এবার ইইউর সঙ্গে থাকতে লন্ডনের স্বাধীনতাই চেয়ে বসেছেন যুক্তরাজ্যের রাজধানীর বাসিন্দারা। কেবল দাবি তুলে বসে থাকেননি, ‘স্বাধীন লন্ডনে’র দাবিতে গতকাল শনিবার এক লাখের বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন সোচ্চার লন্ডনবাসী। এ ছাড়া ব্রিটেনে দ্বিতীয় দফা গণভোটের দাবি করে এক আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন ১১ লাখের বেশি মানুষ। এ আবেদন নিয়ে মঙ্গলবার ব্রিটেনের পার্লামেন্টে আলোচনা হবে।

তবে ব্রিটেনকে যত দ্রুত সম্ভব ইইউ ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে তাগিদ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। জোট প্রতিষ্ঠাকালীন ছয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাদের করণীয় ঠিক করতে বার্লিনে এক জরুরি বৈঠকে বসে এ তাগিদ দেন। স্কটল্যান্ডের মন্ত্রিপরিষদও ব্রিটেন থেকে পৃথক হওয়ার লক্ষ্যে আরেকটি গণভোটের আইনি প্রস্তুতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খবর বিবিসি, গার্ডিয়ান, এএফপি ও সিএনএনের।

ব্রিটেন গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা নিয়ে ইউরোপজুড়ে এখনও তোলপাড় চলছে। এমনকি ব্রিটেন খণ্ড খণ্ড হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। দেশটির জনগণ ছাড়ার পক্ষে গেলেও লন্ডন, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দা ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। গণভোটে লন্ডনে ‘রিমেইন বা থাকার পক্ষ’ পেয়েছে ৬০ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে ‘লিভ বা ছাড়ার পক্ষ’ পেয়েছে ৪০ শতাংশ। এর ফলে ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হওয়ার দাবি উঠেছে খোদ লন্ডনেই। এ প্রশ্নে একদিনেই এক লাখের বেশি মানুষ একটি আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের কাছে জমা পড়েছে এ আবেদন। এ বিষয়ে সাদিক খান বলেছেন, ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে লন্ডনবাসীরও কিছু বলার আছে। লেবার পার্টি থেকে নির্বাচিত মেয়র সাদিক খানও ইইউতে থাকার পক্ষে ছিলেন।

টেলিগ্রাফের খবরে বলা হয়েছে, লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের কাছে লন্ডনবাসী আবেদন জানিয়েছে, তিনি যেন লন্ডনকে ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্র ঘোষণা করে ইইউতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। আবেদনে মেয়র সাদিক খানকে লন্ডনের স্বাধীনতা ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ‘মেয়র সাদিক, আপনি কি প্রেসিডেন্ট সাদিক হওয়াটাই বেছে নেবেন না? অনলাইনে এ আবেদনে স্বাক্ষর সংগ্রহ চলছে এবং সমর্থন দ্রুতই বাড়ছে। আবেদনের সংগঠক জেমস ও’মেলে বলেন, লন্ডন আন্তর্জাতিক শহর। আমরা ইউরোপের প্রাণ হিসেবে থাকতে চাই।

আরেকটি গণভোট চান ব্রিটিশরা: ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের সদস্যপদ নিয়ে আরেকটি গণভোটের দাবি তুলেছেন ব্রিটিশরা। এ জন্য এক আবেদনে ১১ লাখের বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে। বৃহস্পতিবারের গণভোটে বেশির ভাগ মানুষ ইইউ ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দেওয়ার পর মানুষ এ আবেদনে স্বাক্ষর করেন। গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত আবেদনে স্বাক্ষর করেন অন্তত ১১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ।

নিয়ম অনুযায়ী কোনো ইস্যুতে এক লাখ মানুষ আবেদনে স্বাক্ষর করলেই সে ইস্যু নিয়ে পার্লামেন্টে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ফলে দ্বিতীয় গণভোটের দাবিতেও পার্লামেন্টে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে মঙ্গলবার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। হাউস অব কমন্সের মুখপাত্র বলেন, ‘একটি আবেদনে এত পরিমাণ স্বাক্ষর আগে কখনও দেখা যায়নি। এই পিটিশনে স্বাক্ষরের হার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।’

এ উদ্যোগ নিয়েছেন উইলিয়াম অলিভার হিলে। তিনি বলেন, এমন একটি আইন করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষে ৬০ শতাংশের বেশি ভোট না পড়ে এবং মোট ভোট পড়ার হার ৭৫ শতাংশের বেশি না হয়, তাহলে আরেকটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। যারা এখানে স্বাক্ষর করেছেন তাদের দাবি এটাই, ২৩ জুনের গণভোটে ৭২.২ শতাংশ ভোট পড়েছে এবং ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট পড়েছে ৫২ শতাংশ আর বিপক্ষে পড়েছে ৪৮ শতাংশ।

দ্রুত ইইউ ছাড়ূন: ব্রিটেনে গণভোটের দু’দিন পর শনিবার ইইউর প্রতিষ্ঠাকালীন ছয়টি দেশ- জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বার্লিনে ব্রেক্সিট ইস্যুতে করণীয় নিয়ে আলোচনায় বসেন। জরুরি এ বৈঠক থেকে ব্রিটেনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, ইইউর সঙ্গে আলোচনা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেরে ফেলার জন্য।

বৈঠক শেষে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক ভল্টার স্টেইনমায়ার বলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্রিটেনকে ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত। কারণ তাদের ইউরোপের ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

যদিও জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল একটু ভিন্ন সুরে বলেছেন, বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রিটেনের তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। আবার এই প্রক্রিয়া চিরকালের জন্য চলতে থাকবে, সেটাও নয়। এ বিষয়ে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ব্রিটিশ জনগণ তাদের রায় জানিয়ে দিয়েছে। সে কারণে এ বিষয়ে ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলার’ কোনো প্রয়োজন নেই।

আরও একটু কঠিন করে ইউরোপীয়ান কমিশন প্রধান জেন ক্লদ জোঙ্কার বলেন, ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগের পরিকল্পনা কৃত্রিম নয়। ছেড়ে যাওয়াটা এখন দ্রুতই ঘটা উচিত। আর একটি দিনও ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একসঙ্গে চলা সঠিক হবে না।

এ পরিস্থিতিতেই ইইউর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আগামী বুধবার। সেখানে আলোচনার কেন্দ্রে ব্রেক্সিট থাকলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন উপস্থিত থাকবেন না। তার আগে ক্যামেরন ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের নেতাদের সঙ্গে আলাদা করে আলোচনায় বসবেন।

ইইউতে থাকতে দ্রুত বৈঠক চায় স্কটল্যান্ড: ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, তখন দেশটির অন্যতম রাজ্য স্কটল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায়। এ লক্ষ্যে জোটের সদস্য দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে স্কটল্যান্ড। গতকাল শনিবার স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারজন এ ইস্যুতে ইইউ নেতাদের সঙ্গে দ্রুত জরুরি বৈঠকে বসতেও আগ্রহ প্রকাশ করেন।

স্কটল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থেকে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে।

স্কটিশ মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকের পর এডিনবার্গের কার্যালয় থেকে নিকোলা স্টারজন বলেন, ব্রাসেলসে জরুরি বৈঠকে বসার চেষ্টা করবে স্কটল্যান্ড। স্কটিশরা গণভোটে যে অভিমত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে এ বৈঠক জরুরি হয়ে পড়েছে। ইইউ ছেড়ে যাওয়ার জন্য স্কটল্যান্ডকে জোর করা যাবে না।

স্টারজন তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, স্কটিশদের ইচ্ছা বাস্তবায়নে যদি ব্রিটেন বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি দ্বিতীয় দফা গণভোটের ডাক দেবেন। সমকাল ডেস্ক