শহীদ জননী জাহানারা ঈমাম ও তাঁর নির্দেশনা

167

নিলুফা ইয়াসমীন হাসান

সর্বজন শ্রদ্ধেয় জাহানারা ঈমাম ছিলেন এক অসাধারণ লেখিকা, অতুলণীয় শিক্ষাবিদ, সর্বোপরি তিনি আমাদের সকলের কাছে পরিচিত,  বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় ও সুচারু নেতৃত্বের জন্য। তিনি আমাদের কঠিন সময়ে অসামান্য সাহসিকতার সাথে সঠিক ও সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। আজ ২৬ জুন শহীদ জননী জাহানারা ঈমামের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী।

জাহানারা ঈমাম ১৯২৯ সালের ৩রা মে মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন।  মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের পর ১৯৪৭ সালে তিনি কলকাতার লেডী ব্রাবোর্ণ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ময়মনসিংয়ের বিদ্যাময়ী সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জীবন শুরু করেন। সে বছরই তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন সিভিল ইঞ্জিনিয়র শরীফ ঈমামের সাথে। বিয়ের পর তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন এবং জাহানারা ঈমাম সিদ্দেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন।

তাঁর দুই সন্তান রুমী ও জামির জন্মের পর ১৯৬০ সালে তিনি চাকরী ছেড়ে দেন। কিন্তু সাংসারিক দায়িত্বের ফাঁকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে যথাক্রমে ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী করেন ৬২ ও ৬৩ সালে।

মেধা, বুদ্ধিমত্তা, সৌন্দর্য্য ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের জন্য সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি ঢাকার সুচিত্রা সেন বলে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৬৬ সালে টিচার্স ট্রেনিং কলেজে তিনি আবার শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পার্ট টাইম শিক্ষকতা করেন।

এরপর আসে ১৯৭১ সাল। শুরু হল আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ। অগ্নিঝরা মার্চ মাসে পাকিস্তানের রক্তপিপাসু হায়েনা হানাদার বাহিনী  নিরস্ত্র বাঙালীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রাতের আাঁধারে। শুরু হয় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। তাদের সাথে সহযোগিতায় নামলো স্বদেশের কিছু নরপিশাচ। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত হলো  রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী।

জাহানারা ঈমামের বড় ছেলে ১৯ বছর  বয়সী উজ্জ্বল প্রাণবন্ত তরুণ রুমী মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে সফল গেরিলা যুদ্ধ চালান। রুমী আগস্ট মাসে ঢাকায় আসেন এক গেরিলা অভিযানে, কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে তিনি গ্রেফতার হন। এক ব্যাপক ধরপাকড় অভিযানে অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে সেই রাতে জাহানারা ইমামের স্বামী শরীফ ইমাম ও ছোট ছেলে জামীও গ্রেফতার হন।

উৎকন্ঠা আর অপেক্ষার সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জাহানারা ইমাম লিখে রাখেন ডায়েরীতে। তাঁর স্বামী ও ছোট ছেলে ফিরে এলেন সেপ্টেম্বর মাসে কিন্তু রুমী ফিরে আসেনা। অকথ্য নির্যাতনের শিকার, সন্তানের শোক, বিদ্বস্ত ভগ্ন হৃদয়ে জাহানারা ঈমামের স্বামী স্বাধীনতা লাভের তিন দিন আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। শোকের পরে শোক।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, রুমী আর ফিরে এলোনা। মায়ের এই অপেক্ষা, বেদনা ও শোকের কথা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় জাহানা ঈমাম লিখে গেছেন তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি‘ বইয়ে।

 ‘জীবন মৃত্যু‘ নামে তাঁর অন্য একটি বইতে তিনি লিখেছেন ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের দিনের কথা। দিনটি যেন একই সাথে আনন্দের ও বেদনার। তিনি তার ছোট ছেলেকে নিয়ে ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উড়ান। তিনি লিখেছেন, সবার চোখে পানি ছিল কিন্তু তাঁর চোখ ছিল অশ্রুশুন্য। স্বামী সন্তান হারিয়ে তিনি পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। রুমীর সহযোদ্ধারা তাঁকে ডাকলো শহীদ জননী বলে।

এদিকে দেশ স্বাধীন হলো ঠিকই কিন্তু বাঙালীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থামলোনা, সক্রিয় হয়ে উঠলো অন্ধকারের শক্তিগুলো। হত্যা করা হলো জাতির জনককে। জেনারেল জিয়ার শাসনামলে জামাতে ইসলামসহ ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ লাভ করে। রাজাকাররা দর্পের সাথে তাদের কর্ম শুরু করলো বাংলার মাটিতে। বাংলাদেশকে অস্বীকারকারী পাকিস্তানের নাগরিক, রাজাকারের হোতা, ঘৃণ্য গোলাম আজম ফিরে এলো বাংলাদেশে। নাগরিকত্ব পেয়ে হলেন জামাতে ইসলামীর আমীর। শুরু হল রগ কাটা, নাশকতা ও প্রগতিশীলদের হত্যার পাশবিক রাজনীতি।

সেই কঠিন সময়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতৃত্ব দৃঢ় হাতে তুলে নেন নির্ভিক জাহানারা ঈমাম। দেশবাসী জেগে উঠলো, আন্দোলন উঠলো তুঙ্গে। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে ঢাকার সোরয়ার্দী উদ্যানে গণআদালত বসলো। প্রতীকী বিচারে জনগণ এককন্ঠে রায় দিল যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে। গোলাম আজমের বিরুদ্ধে ফাঁসীর রায় হল। জনগণ যখন জেগে উঠলো তখন নির্লজ্জ শাসক গোষ্ঠী অর্থাৎ বিএনপি সরকার এই সাহসী মানুষদের হেনস্তা করার সিদ্ধান্ত নিল। জাহানারা ঈমামসহ গণআদালতের সাথে সংশ্লিষ্ট ২৪জন নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহীতার মামলা করলো।  কিন্তু হুমকী, ধামকী, ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে জাহানারা ঈমামকে থামানো যায়নি।

 মরণব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত জাহানারা ঈমামের মুখের ক্যান্সারের বেশ কয়েকটি অপারেশন করা হয়, তাঁর কথা বলাই দূরূহ হয়ে উঠে। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। আন্দোলনের কাজে ছুটে গেছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ক্যান্সারের সাথে তার এই ব্যক্তিগত লড়াইয়ের কথা তিনি লিখেছেন তাঁর ‘ক্যান্সারের সাথে বসবাস‘ বইতে। শেষ দিনগুলি তিনি কাটান তাঁর ছেলের কাছে। ১৩ বছর ক্যান্সারের সাথে এই যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগ মাথায় নিয়ে ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন আমেরিকার ডেট্রয়েট-এ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মরদেহ দেশে দাফন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে। জাহানারা ঈমামের মৃত্যুর দুই বছর পর ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ তুলে নেয়।

জাহানারা ঈমাম অনেকগুলো বই লিখেছেন এবং ইংরেজী থেকে বাংলায় অনেক বই অনুবাদ করেছেন। ১৯৯৭ সালে তিনি মরনোত্তর স্বাধীনতা পদক ও ৯৮ সালে মরনোত্তর রোকেয়া পদক লাভ করেন। এর আগে ১৯৮৮ সালে তিনি বাংলাদেশ রাইটার্স এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পদক এবং ৯১ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরষ্কার লাভ করেন।

মৃত্যুর পূর্বে শহীদ জননী দেশবাসীর প্রতি যে আহ্বান ও নির্দেশ দিয়ে চিঠি লিখেছেন  তা হলো –

 সহযোদ্ধা দেশবাসীগণ,

আপনারা গত তিন বছর ধরে একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমসহ স্বাধীনতা বিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। এই লড়াইয়ে আপনারা দেশবাসী অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আন্দোলনের শুরুতে আমি আপনাদের সঙ্গে ছিলাম, আমাদের অঙ্গীকার ছিল লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ রাজপথ ছেড়ে যাবোনা। মরণব্যাধি ক্যান্সার আমাকে শেষ মরণ কামড় দিয়েছে। আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি। রাজপথ ছেড়ে যাইনি। আপনারা আপনাদের অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূরণ করবেন। আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে থাকবেন। আমি না থাকলেও আপনারা আমার সন্তান-সন্ততিরা , আপনাদের উত্তরসূরীরা সোনার বাংলায় থাকবেন। এই আন্দোলনকে এখনো দূস্তর পথ পাড়ি দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র ও যুব শক্তি, নারী সমাজসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ এই লড়াইয়ে আছে। তবু আমি জানি জনগণের মত বিশ্বস্ত আর কেউ নয়। জনগণই সকল শক্তির উৎস। তাই একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী বিরোধী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও  ‘৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল সমন্বয় আন্দোলনের দায়িত্বভার আমি আপনাদের তথা বাংলাদেশের জনগণের হাতে অর্পন করলাম। জয় আমাদের হবেই।