সবাইকে ভোগাবে যে বিচ্ছেদ!

81

কামাল আহমেদ

কী বিচিত্র বিভাজন! লন্ডনের ভোটের ফল ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে। একইভাবে স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ৬০ শতাংশের বেশি ভোট ইউরোপের পক্ষে। কিন্তু ইংল্যান্ডের বাকি অংশ এবং ওয়েলস চায় বিচ্ছেদ। মধ্য ইংল্যান্ডের লেস্টার পক্ষে, পাশের শহর বার্মিংহাম বিপক্ষে। পুরো দেশের হিসাব ৫২ বিপক্ষে, ৪৮ পক্ষে। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন, বিরোধী নেতা করবিন এবং প্রধান প্রধান দলের প্রথম সারির নেতারা একজোট হয়ে ইউরোপের সঙ্গে জোটভুক্ত থাকতে চাইলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রিটিশ জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই গণভোটে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই বিপন্ন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ গ্রহণে কেউ এগিয়ে আসছেন না। বিরোধী নেতা করবিনের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সামর্থ্য এ মুহূর্তে নেই। ফলে, ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্থিরতা চলবে আগামী কয়েক মাস।

ইউরোপের সঙ্গে এই বিচ্ছেদের উপরি হিসেবে এখন উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর উত্থান আসন্ন। অভিবাসনবিরোধী অনেকটাই আত্মমুখী নতুন ব্রিটেনের আর্বিভাব ঘটছে। ফলে, অভিবাসীদের জন্য ব্রিটেনের চেহারা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা এখন আরও প্রকট হতে বাধ্য।

বিশ্বনেতাদের এবং বৈশ্বিক অর্থবাজারগুলোর দুঃস্বপ্ন এখন রূঢ় বাস্তবের রূপ নিল। আজ শুক্রবার বিশ্বের অর্থবাজারগুলোতে অভূতপূর্ব অস্থিরতা চলছে। ইতিমধ্যেই যে প্রবণতা শুরু হয়েছে তা গত ৩১ বছরে দেখা যায়নি। লন্ডনে শেয়ার লেনদেন বন্ধ রাখতে হতে পারে। ব্যাংকগুলোকে রক্ষার জন্য লেনদেনে নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হতে পারে। সুদের হার বাড়া এবং সরকা​রিভাবে পাউন্ডের দরপতন ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা হতে বাধ্য। ২০০৮ সালের মহামন্দার মতোই আরও এক দফা মন্দাই এখন ভবিতব্য?

স্কটল্যান্ড আজ ভোরেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে স্কটিশরা ইউরোপে থাকার পক্ষে মত দিয়েছে এবং সে কারণে ইংল্যান্ডের সঙ্গে মতপার্থক্য মেটার নয়। ব্রিটেনের মধ্যে ভাঙনের সম্ভাবনা এখন আরও প্রকট হবে।

এই ভোটের ফল হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ​ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। অন্য ছোট ইউরোপীয় দেশগুলোতেও একই ধরণের গণভোটের দাবি উঠবে। সুতরাং, এই গণভোটের ফলে ইউরোপও ভাঙনের পথে যাত্রা শুরু করতে পারে। ইউরোপের যেসব দেশে চরম ডানপন্থী বর্ণবাদী দলগুলো ধীরে ধীরে শক্তি অর্জন করছিল তারা নতুন করে উজ্জীবিত হবে এবং ইউরোপজুড়েই অভিবাসীরা বিশেষত মুসলিম শরণার্থীরা হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হবেন।

ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, বার্লিন, প্যারিস এবং মস্কোতে সবাই এখন নড়েচড়ে বসতে বাধ্য। মুক্তবিশ্বের নেতা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইউরোপে বিশ্বস্ত এবং সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল ব্রিটেন। এবং সে কারণে ইউরোপে ব্রিটেনের নেতৃত্বের যে ভূমিকা ছিল তা এখন দুর্বল হয়ে পড়বে এবং বিশ্বব্যবস্থায়, বিশেষত নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক প্রভাব হয়তো ততটা ব্যাপক নয়। তা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে প্রভাবটা অনেক বড় হতে পারে। বিস্ময়করভাবে পাউন্ডের সঙ্গে টাকার দরও পড়ে গেছে প্রায় ১০ শতাংশ। ব্রিটেনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা একটা বড় সময়ের জন্য মন্দাবস্থার মুখোমুখি হবেন। ফলে, বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের ওপরও তার কিছুটা প্রভাব পড়তে বাধ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

সবমিলিয়ে বলা যায়, ব্রিটেন তার কথিত নয়া স্বাধীনতা অর্জনে ইউরোপের সঙ্গে যে ঐতিহাসিক বিচ্ছেদ ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিল তার পরিণতিতে নিকটভবিষ্যতে তাদের সমৃদ্ধির সম্ভাবনা যতটা না উজ্জ্বল তার বদলে সংকট বাড়ার আশঙ্কাই বেশি। একই সঙ্গে তারা বাকি বিশ্বকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল।