রাজনীতির বিকাশে বাধা দুর্বৃত্তায়ন: হাই কোর্ট

112

  মহিউদ্দিন ফারুক  

রাজনীতিতে ‘দুর্বৃত্তায়ন’ এবং দলগুলোর ‘উচ্ছৃঙ্খল কর্মীনির্ভরতাকে’ বাংলাদেশে সুষ্ঠু  রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশের পথে এক বড় ‘অন্তরায়’ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে হাই কোর্ট।

আদালত বলেছে, “সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ না ঘটলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে না; মুখ থুবড়ে পড়বে গণতন্ত্র।”

এক যুগ আগের আলোচিত আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের আপিল রায়ে উঠে এসেছে হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ।

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাই কোর্ট বেঞ্চ বুধবার এই রায়ে বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, “বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অতীতে খুবই কম সংঘটিত হয়েছে। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ স্কুলে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহ থেকে সম্যক উপলব্ধি করা যায়।”

২০০৪ সালের ৭ মে ওই স্কুলের মাঠেই এক জনসভায় এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে গাজীপুরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করা হয়। তার সঙ্গে খুন হন ওমর ফারুক রতন নামে আরেকজন।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন, বিচারিক আদালতের নথি ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে হাই কোর্ট রায়ে বলেছে, ২০০৪ সালের ওই হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল মাদকের কারবার নিয়ে বিএনপির নুরুল ইসলাম সরকার এবং যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা মাহফুজুর রহমান মহলের মধ্যে বিরোধ। মহলসহ অনেকেই ওই হামলায় আহত হন।

আপাত দৃষ্টিতে শুধু মহলকে খুন করা হামলার উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হলেও আহসান উল্লাহ মাস্টারকে হত্যাও যে তাদের পরিকল্পনায় ছিল, তা এ মামলার বিচারে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেছে আদালত।

 প্রয়াত সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার আওয়ামী লীগ নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার অনেক বেশি পরিচিত ছিলেন টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের একজন শ্রমিক নেতা হিসেবে। ঘটনার সময় তিনি ছিলেন জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি।

যে স্থানে ও যেভাবে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তাকে ‘ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বা মাসকিলিং’ হিসেবে বর্ণনা করে বিচারক বলেছেন, আহসান উল্লাহ মাস্টারকে হত্যার মধ্য দিয়ে একটি আদর্শকে হত্যা করা হয়েছে।

 হাই কোর্টের রায়

>  নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড হওয়া ২২ আসামির মধ্যে ছয় জনের সর্বোচ্চ সাজা বহাল, সাতজনের সাজা কমে যাবজ্জীবন ও সাতজন খালাস। দুই আসামির মৃত্যু হওয়ায় তাদের মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

>> নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ছয় আসামির মধ্যে একজনের দণ্ড বহাল, চারজন খালাস। বাকি একজন আপিল না করায় তার দণ্ডও বহাল রয়েছে।

>> হাই কোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা একজন, যাবজ্জীবনের পাঁচজন এবং খালাস পাওয়া ১১ আসামির মধ্যে তিনজন পলাতক রয়েছেন। খালাস পাওয়া পলাতক ওই তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল নিম্ন আদালত।

বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক ওবায়দুল হাসান রায় ঘোষণার আগে বলেন, বিচারপ্রার্থী ও সকলের বোঝার সুবিধার্থে রায়টি বাংলায় দেওয়া হচ্ছে।

“রায়টি লিখেছেন সহকর্মী বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ। তার দেওয়া রায়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করে নিজস্ব কিছু বক্তব্য ও পর্যবেক্ষণ প্রদান করছি।”

রায়ের আগে হাই কোর্ট প্রাঙ্গণে জড়ো হন গাজীপুর থেকে আসা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা রায়ের আগে হাই কোর্ট প্রাঙ্গণে জড়ো হন গাজীপুর থেকে আসা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা ‘জঘন্যতম ঘটনা’

রায়ে বলা হয়, যে হত্যাকাণ্ডটিকে কেন্দ্র করে এই ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য) হাই কোর্টে এসেছে, নিঃসন্দেহে সেটি ‘জঘন্যতম’ ঘটনা।

“এই মামলায় একজন উল্লেখযোগ্য অভিযুক্ত হলেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা জনাব নুরুল ইসলাম সরকার। ওই মোকদ্দমার ঘটনা থেকে দেখা যায়, নুরুল ইসলাম সরকারের সঙ্গে তখনকার সময়ের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন এবং আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা মাহফুজুর রহমান মহলের সঙ্গে যতটুকু না ছিল রাজনৈতিক বৈরিতা তার চেয়েও বেশি ছিল অর্থনৈতিক সংঘাত। নুরুল ইসলাম সরকার স্থায়ীভাবে একজন ব্যবসায়ী, মাহফুজুর রহমান মহলও একজন ব্যবসায়ী।

“উভয়ের মধ্যে স্থানীয়ভাবে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রতিযোগিতা চলছিল। মহলের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলেও যেহেতু তিনি নুরুল ইসলাম সরকারের বিচ্ছিন্ন মাদক ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি করেছিলেন, সেহেতু নুরুল ইসলাম সরকার ও সঙ্গীগণ মহলকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।”

সেই পরিকল্পনার কথা আসামি মাহবুবুর রহমানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসেছে এবং দুজন সাক্ষী তা সমর্থন করেছেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যার ষড়যন্ত্র

রায়ে বলা হয়, মাহবুবুর রহমানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিশ্লেষণ করলে আপাত দৃষ্টিতে মনে হয়, নুরুল ইসলাম সরকার ও তার সঙ্গীরা শুধু মহলকে হত্যারই পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ২০০৪ সালের ৭ মে নুরুল ইসলাম দিপু ও শহীদুল ইসলাম শীপু গং সভাস্থলে গিয়ে আহসান উল্লাহ মাস্টারকে লক্ষ্য করে গুলি করে।

“ঘটনার দিন এই দুইজনকে নুরুল ইসলাম সরকারের গাড়িতে করে বয়ে নিয়ে আসা এবং সেখান থেকে তার দ্বারা উৎসাহিত হয়ে সভাস্থলে গিয়ে দিপু ও শিপু কর্তৃক আহসান উল্লাহ মাস্টারকে গুলি করার ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে মাহফুজুর রহমান মহলকে হত্যার ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি তারা আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপিকেও হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাকে হত্যা করার মধ্য দিয়েই।”

জননেতা থাকাকালে আহসান উল্লাহ মাস্টার গাজীপুরে মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।

 তিন ফাঁসির আসামি- নুরুল ইসলাম সরকার, নুরুল ইসলাম দিপু ও শহীদুল ইসলাম শিপু তিন ফাঁসির আসামি- নুরুল ইসলাম সরকার, নুরুল ইসলাম দিপু ও শহীদুল ইসলাম শিপু ‘দ্বিধাহীন, বেপরোয়া’

রায়ে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, “প্রশ্ন হলো এইরকম জনসভায়, যেখানে আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপিসহ টঙ্গী পৌরসভার মেয়র ও অন্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দসহ শত শত আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকবেন, তা জেনেও সাজাপ্রাপ্ত অভিযুক্তরা মাহফুজুর রহমান মহলকে মারার জন্য ওই স্থানটিই কেন বেছে নেয়?

“কারণ সাজাপ্রাপ্ত অভিযুক্তগণের মধ্যে কোনো দ্বিধা কাজ করেনি যে এই সভায় বিক্ষিপ্তভাবে গোলাগুলি করলে প্রচুর লোক মারা যেতে পারে। এমনকি তারা প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত ওই ঘটনার সময় কোনো রকম মুখাবরণ (মাস্ক) পর্যন্ত ব্যবহার করেননি।”

বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, আসামিরা তখন এতটাই ‘বেপরোয়া’ ছিল এবং তারা ‘ভেবেছিল’ যে, তাদের চেহারা অনাবৃত থাকার কারণে কেউ যদি চিনেও ফেলে, তাদের কিছু হবে না।

উচ্ছৃঙ্খল রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত

হত্যাকারীদের বেপরোয়া ভূমিকার কারণ বিশ্লেষণ করে বিচারক বলেন, “তাদের এই ধরনের ভাবনার কারণ হল তাদের পেছনে এমন একটি শক্তি রয়েছে যে বা যারা তাদের সকল প্রকার সম্ভাব্য ঝামেলা থেকে রক্ষা করার শক্তি রাখে।”

রায়ে বলা হয়, “স্থানীয় বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা এ ধরনের চিন্তা করতে পারে, কারণ আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদেরকে পরিহার করার প্রবণতা দেখা যায় না এবং অনেকাংশে তারা এদের উপর নির্ভরশীল, যা কিনা দেশে সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরাট অন্তরায়।”

বিচারক বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে মানুষের চাওয়া পাওয়া ও বিভিন্ন দাবি-দাওয়া  মেটানোর জন্য, তথা মানুষের কল্যাণে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সুচারুরূপে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার থাকে সেই রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে।

“রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দলটির সংসদ সদস্যগণে মধ্যে থেকেই মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। সংসদ সদস্যগণ বা উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের উপর নির্ভরশীল থাকতে দেখা যায়। আবার বিপরীতভাবে এও বলা চলে, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা কর্মীগণই তাদের সমর্থন ও কর্মকাণ্ডে উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে পরিচালিত করে থাকেন।”

রায়ের আগে হাই কোর্ট প্রাঙ্গণে গাজীপুর থেকে আসা আওয়ামী লীগ কর্মীদের গায়ে দেখা যায় আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছবি। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ রায়ের আগে হাই কোর্ট প্রাঙ্গণে গাজীপুর থেকে আসা আওয়ামী লীগ কর্মীদের গায়ে দেখা যায় আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছবি। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ ‘মাস কিলিং’

রায়ে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন, “যে স্থানে ও যেভাবে ওই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, এইরূপ হত্যাকাণ্ডকে এক কথায় বলা চলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বা মাসকিলিং।”

এর ব্যাখ্যায় আদালত বলেছে, “যেখানে কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম দ্বারা হত্যার উদ্দেশ্যে নিরস্ত্র ও বৃহৎ সমাবেশে আক্রমণ করা হয় এবং যেখানে অসংখ্য লোক নিহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যদি সেখানে একজন লোকও নিহত হন- এই ধরনের হত্যাকাণ্ডকে বলা যায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বা মাস কিলিং।”

আর নুরুল ইসলাম সরকার ও তার সহযোগীরা এই ‘মাস কিলিংয়ের’ জন্য ‘সরাসরি দায়ী’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে রায়ে।

 হত্যা করেছে এক আদর্শকে

আহসান উল্লাহ মাস্টারের কর্মময় জীবনের বর্ণনাও উঠে এসেছে হাই কোর্টের এই রায়ে।

এতে বলা হয়েছে, আহসান উল্লাহ মাস্টার জীবনের শুরুতে ছিলেন একজন শিক্ষক; পরে প্রধান শিক্ষক এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে শুরু করে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সবশেষে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

“তিনি ছিলেন দল-মত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধাভাজন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি পালন করেছেন গুরু দায়িত্ব। তিনি টঙ্গী গাজীপুর এলাকায় মাদকবিরোধী প্রচার ও কার্যক্রমে ছিলেন সচেষ্ট। মাদক ব্যবসায়ী তথা সন্ত্রাসীদের নির্মূল করার বিষয়ে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও তিনি বলে গেছেন, যা সাক্ষীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়।”

আদালত বলেছে, আহসান উল্লাহ মাস্টারের মতো একজন ‘আদর্শবান ব্যক্তি’ সংসদ সদস্য হিসেবে বেঁচে থাকলে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জনকল্যাণে আরও অনেক ‘ভালো কাজ’ করতে পারেতন, যা থেকে জাতি উপকৃত হত।

“অভিযুক্তরা আহসান উল্লাহ মাস্টারকে হত্যার মধ্য দিয়ে জাতিকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। আজকের সমাজে আহসান উল্লাহ মাস্টারের মতো আদর্শবান রাজনৈতিক নেতার বড়ই অভাব।”