বানানো প্রতিবেদন: তনুর বাবার প্রত্যাখ্যান

59

  কাজী এনামুল হক

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের যে প্রতিবেদন চিকিৎসকরা দিয়েছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন তার বাবা ইয়ার হোসেন।

রোববার তিনি বলেন, “যেইটা বলছে, সেইটা ভুয়া বলছে, বানায়ে বলছে।”

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান কামদা প্রসাদ সাহা নেতৃত্বাধীন মেডিকেল বোর্ড তাদের এই প্রতিবেদনে মৃত্যুর আগে তনুর ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ হওয়ার কথা বলেছে।

এর মাধ্যমে তারা ‘ধর্ষণ’ বোঝাচ্ছেন কি না- সাংবাদিকদের এই প্রশ্ন তারা এড়িয়ে গেছেন।

প্রতিবেদন দেওয়ার পর কামদা প্রসাদ সাহা সাংবাদিকদের বলেন,“যেহেতু দশ দিন পর ময়নাতদন্ত করা হয়েছে, মৃতদেহ পচা ছিল, দশ দিন পর পচা গলা মৃতদেহ থেকে নতুন করে কোনো ইনজুরি বোঝা সম্ভব হয়নি।”

তনুর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে পুলিশকে আরও তদন্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

সেনানিবাস বোর্ডের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ইয়ার হোসেন বলেন, চাকরির কারণে তাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার আগে অনুমতি নিতে হয়। এ কারণে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে পারছেন না।

তবে তনুকে হত্যার আগে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে জানিয়ে এ মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেটি ‘সঠিক’ বলে মনে করছেন ইয়ার হোসেন।

দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, “আলতু ফালতু কথা কইয়া লাভ আছে?

তনু হত্যার ঘটনাক্রম

>> ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে নিজেদের বাসা থেকে অন্য কোয়ার্টারে ছাত্র পড়াতে গিয়ে খুন হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তনু । সেনানিবাসের অলিপুর এলাকায় একটি ঝোঁপে তার লাশ পাওয়া যায়।

>> ইয়ার হোসেন সে সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তনুর নাক ও মাথা থেঁতলানো ছিল, মাথার কিছু চুল ছিল কাটা। অলিপুর কালো পানির ট্যাঙ্কির রাস্তায় তনুর ব্যবহৃত জুতা, ছেঁড়া চুল ও ছেঁড়া ওড়না পাওয়া গিয়েছিল।

>> পুলিশ সে সময় বলেছিল, ১৯ বছর বয়সী তনুকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে লাশ ও পারিপার্শ্বিক আলামত দেখে তাদের ধারণা হয়েছে।

>> কিন্তু ৪ এপ্রিল কুমিল্লা মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক শারমিন সুলতানা প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলেন, তনুর মৃত্যুর কারণ তাদের কাছে স্পষ্ট নয়, ধর্ষণের কোনো আলামতও তারা পাননি।  ভিসেরা পরীক্ষায় বিষক্রিয়া বা রাসায়নিকের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

>> সেনানিবাসের মতো সুরক্ষিত এলাকায় নাট্যকর্মী তনু খুন হওয়ার পর ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ওঠে। সারাদেশে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত হয় গত ৩০ মার্চ।

>> এদিকে ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালায় সিআইডি। ১৬ মে সিআইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ডিএনএ পরীক্ষায় তারা ধর্ষণের আলামত পেয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা নমুনায় কয়েকজন পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

>> রোববার দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দিয়ে অধ্যাপক কামদা প্রসাদ সাহা বলেন, “দেখা গেছে, মৃত্যুর পূর্বে তার সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স হয়েছে।…উদ্ধারের দশ দিন পর পচা-গলা লাশ দেখে মৃত্যুর কারণও জানা যায়নি।”

>> হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় তিন মাস হতে চললেও খুনি শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষীদের সনাক্ত করতে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে সিআডি।

চিকিৎসকরা দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের আড়াই মাস পর যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তাতে কুমিল্লায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়া হয়েছে তনুর বাবার মতই।

কুমিল্লা গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র খাইরুল আনাম রায়হান বলেন, “৭৪ দিন অপেক্ষার পর এ ধরনের ময়নাতদন্ত  রিপোর্ট অত্যন্ত দৃষ্টিকটূ। মৃত্যুর কারণ উদঘাটন- তাদের সেই প্রথম কাজই কিন্তু করেনি। রিপোর্টটি অত্যন্ত আপত্তিকর।”

যত দ্রুত সম্ভব এর সুরাহা করে হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে রায়হান বলেন, হত্যাকাণ্ডের ৯০দিন পূর্ণ হলে তারা আবারও আন্দোলনে যাবেন।

কুমিল্লা নাগরিক কমিটির নেতা অধ্যাপক মীর শাহ আলম বলেন, “লাশের ময়নাতদন্ত করে মৃত্যুর কারণ বের করাই ফরেনসিক বিভাগের দায়িত্ব। তাহলে তারা কেন তনুর মৃত্যুর কারণ বের করতে পারল না? তাহলে তনু মরিল কেমনে?”

দ্রুত এর মীমাংসা করে জনগণের সামতে তা তুলে ধরার আহ্বান জানান চৌদ্দগ্রামের একটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই শিক্ষক।