‘তৃতীয়বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ ’ ১১ – : মাহমুদ এ রউফ

150

 

বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনীতিক,কমিউনিটি নেতা মাহমুদ এ রউফ দেশে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিতে যুক্তছিলেন। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের  সক্রিয়  কর্মী ও ছাত্রনেতা। সিলেটের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মদনমোহন  কলেজের শিক্ষার্থী  ছিলেন ষাটের দশকের গোড়ার দিকে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে লন্ডনে আসেন ষাটের দশকের  শেষার্ধে। জড়িয়ে পড়েন বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিলেত হয়ে ওঠে তৃতীয় রণক্ষেত্র। মাহমুদ এ রউফ বিলেতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সংঘটিত আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন প্রথম সারির নেতা। তাঁর  লেখনিতে উঠে আসছে  ‘তৃতীয় বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ‘।

বিলেতবাংলা২৪.কম ধারাবাহিক প্রকাশ করছে বিলেতে বাঙালির প্রত্যয়দীপ্ত এই আগুনঝরা দিনের ইতিহাস। প্রতি সপ্তাহে  থাকছে ‘তৃতীয়বাংলায়  মুক্তিযুদ্ধ ‘।-নির্বাহী সম্পাদক।

১১ তম কিস্তি

বাংলাদেশ মহিলা সমিতি

ব্রিটেনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী মহিলারা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা  রেখেছেন। তারা ষাটের দশক থেকে প্রত্যেকটা আন্দোলনে জড়িত ছিলেন একনিষ্টভাবে। দেশের সুখে দু:খে বা দুর্দিনে জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাদের  মধ্যে রোকেয়া কবির,তালেয়া রহমান, রিজিয়া চৌধুরী, সুরাইয়া খান, নুরুন্নেছা চৌধুরী, খালেদা উদ্দিন, পুষ্পিত চৌধুরী, আনোয়ারা জাহান, লুলু বিলকিস বানু,  সোফিয়া রহমান, ফেরদৌস রহমান, জেবুন্নেছা বকস, শেফালি হক, মুন্নি রহমান, সেলিনা মোল্লা, কুলসুম উল্লা,জোতসনা হাসান, জেবুন্নেছা খায়ের ও  নোরা শরীফ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের খবর পাওয়ার আগে যখন আন্দোলন চলছিলো তখন থেকেই এই সচেতন মহিলারা সংঘবদ্ধভাবে দেশের জন্য কাজ করার চিন্তা ভাবনা করছিলেন। হত্যাযজ্ঞের ঘটনার পর ২রা এপ্রিল কালবিলম্ব না করে মহিলারা মিসেস জেবুন্নেছা বকসের বাসভবন পশ্চিম লন্ডনের ১০৩ লেডব্যারি রোডে এক বৈঠকে মিলিত হন। সেই বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে মিসেস জেবুন্নেছা বকসকে আহবায়ক, মিসেস  সোফিয়া রহমানকে সেক্রেটারি এবং ফেরদৌস রহমান, আনোয়ারা জাহান ও মুন্নি রহমানকে জনসংযোগের দায়িত্ব দিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির নাম দেয়া হয়Ñবাংলাদেশ মহিলা সমিতি।

বিলাতে বাংলার রাজনীতি বইয়ের লেখক বিশিষ্ট গবেষক ফারুক আহমেদের সাথে এক সাক্ষাতকারে মহিলা সমিতির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপার্সন মিসেস জেবুন্নেছা বকস ১৯৮৯ সালে বলেছিলেনÑ ‘পঁচিশে মার্চের আর্মি ক্রাকডাউনের আগে থেকেই আমরা বুঝতে পারছিলাম দেশে ভয়ঙ্কর একটা কিছু হতে যাচ্ছে। এদেশের খবরের কাগজে কিছু কিছু সংবাদ আসছিলো। তাই আমরা মহিলাদের পক্ষ থেকে একটা কিছু করার কথা ভাবছিলাম। এরপর এলো ২৫ মার্চের সেই ভয়াল  রাত। আমরা বুঝলাম, আর নয়,অপেক্ষা করার দিন শেষ হয়ে গেছে। এবার রাস্তায় নামতে হবে। এর জন্য চাই একটা সংগঠন। আমরা কয়েকজন আলাপ-আলোচনা করতে থাকলাম। অবশেষে ২রা এপ্রিল আমার বাড়িতে (১০৩ লেডব্যারি রোডে)  মিসেস ফেরদৌস রহমান,উর্মি রহমান,লুলু বিলকিস বানু এবং আরো দুএকজন একত্র হলাম এবং সেই দিনই আমাকে কনভেনার করে ‘বাংলাদেশ উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন ইন গ্রেটব্রিটেন‘( বাংলাদেশ মহিলা সমিতি) গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে প্রায় তিন মাস এটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন মিসেস সোফিয়া রহমান।  জনসংযোগের দায়িত্ব পালন করেন ফেরদৌস রহমান, আনোয়ারা জাহান ও মুন্নি রহমান। পরবর্তীকালে পারিবারিক অসুবিধার কারণে সোফিয়া রহমান সংগঠনের কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে জেবুনেচ্ছা বখস প্রেসিডেন্ট,আনোয়ারা জাহান সেক্রেটারি ও খালেদা উদ্দিন টেজোরার হিসেবে দাযিত্ব লাভ করেন।‘

সংগঠনটির   জন্মের সাথে সাথেই তারা বাংলাদেশের পক্ষে আন্দোলনে নেমে পড়লেন। আহবান করলেন ৩রা এপ্রিল বিক্ষোভ মিছিল ও জনসভা। এই বিক্ষোভ মিছিলে বিভিন্ন শহর থেকে কমপক্ষে ১ হাজার মহিলা অংশগ্রহণ করেন। তারা হাউডপার্ক কর্নারে জমায়েত হয়ে সদ্য ঘোষিত স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতির সমর্থন আদায়ের জন্য দেশীবিদেশী জনতা ও বিদেশী সরকারের প্রতিনিধিদের প্রতি আহবান জানান। রঙবেরঙের শাড়ি পরিহিত মহিলাদের দেশের জন্য আন্দোলন বিদেশী পথচারিরা খুব উতসাহের সাথে লক্ষ্য করছিলো। একটা বিরল দৃশ্য ছিলো এটি। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এর সদস্যরা মহিলা সমিতির এই বিক্ষোভ মিছিলে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেন। মহিলা সমিতি মুক্তিযুদ্ধচলাকালে অক্লান্ত ও বিরামহীনভাবে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ করে যান। তাদের কার্যকলাপের বিভিন্ন উদাহরণের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত প্রচারপত্র বিলি, সভার আয়োজন, স্মারকলিপি পেশ,বিশ্বনেতৃবৃন্দ, রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানদের নিকট তারবার্তা  প্রেরণ ও বিক্ষোভ মিছিলসহ  মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা কর্মসূচী পালন।চলবে