মানবাধিকার আইন বিলুপ্ত হলে বিশ্বসভ্যতা বিপর্যস্ত হবে

307

M-G-KIBRIA-300x273

মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া

(১)
বেঁচে থাকতে হলে আপনার কী প্রয়োজন?
প্রথমেই শ্বাস গ্রহণ। তাহলে আপনার প্রয়োজন অক্সিজেন। আপনি যে সারাউন্ডে বসবাস করছেন, সেখানে যদি পর্যাপ্ত পরিমানে অক্সিজেন না থাকে তাহলে আপনি হাঁসফাঁস করবেন। ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারবেন না। তাহলে ঠিকমতো শ্বাস গ্রহণের জন্য আপনাকে এমন এক স্থানে বসবাস করতে হবে যেখানে পর্যাপ্ত পরিমানে অক্সিজেন আছে।
শ্বাস গ্রহণের পর আপনার ভেতরের অর্গানগুলো আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে ওঠবে। আপনার তখন খাদ্য গ্রহণের প্রয়োজনয়ীতা দেখা দেবে। আপনার দেহের কল-কব্জাগুলোর সঠিক কাজের জন্য আপনাকে পর্যাপ্ত পরিমানে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করতে হবে।
তারপর আসলো সামাজিক কায়দা কানুন।
মানুষ জন্মগতভাবেই জোটবদ্ধ প্রাণী। জোটের মধ্যে থাকার জন্য তারা নিজেদের সেরকমভাবেই প্রস্তুত করে তোলে। ফলে সমভাবাপন্ন মানুষগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জোটের সৃষ্টি হয়। জোটবদ্ধ হয়েই তারা সুখে শান্তিতে বসবাসের প্রেরণা খোঁজে। সমভাবাপন্নহীনতায় জোট ভাঙ্গে, নতুন নতুন জোটের সৃষ্টি হয়।
এভাবেই অনেকগুলো জোট মিলে একটি সমাজ, আর, অনেকগুলো সমাজ নিয়ে একটি রাষ্ট্রের উৎপত্তি।
একটি সুস্থ-সবল দেহের জন্য যেমন দুষণমুক্ত আবহাওয়া ও উপযুক্ত খাদ্য এবং সুন্দর সামাজিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজব্যবস্থা প্রয়োজন তেমনি একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানবিক ন্যায়বিচার, দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন, মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার ইত্যকার বিষয়াদিও সমান প্রয়োজন। সংক্ষেপে বললে এভাবে বলা যায়, একটি রাষ্ট্রেকে অবশ্যই মানবিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হতে হবে। অন্যথায়, অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসকষ্টের মতো, খাদ্যের অভাবে অপুষ্ট দেহের মতো-মানবিকতা ও কল্যাণকামিতার অভাবে একটি রাষ্ট্রের সার্বিক কার্যকলাপ অসুস্থতায়, পুষ্টিহীনতায় এবং অন্যায় অত্যাচারে ডুবে যেতে বাধ্য।
বাস্তব অর্থে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আজ অন্যায় অত্যাচারে নিমজ্জিত। অনেক দেশে ‘‘বিচারহীনতাই বিচার’’ এর সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক মানবিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়ে গেছে। তা দেখেও আমরা না দেখার ভান করছি। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা নিরুপায়ের মতো সেগুলো মেনে নিচ্ছি। আমাদের অনেকেরই সেই শক্তি নেই, যা দিয়ে আমরা সামাজিক মানবিক মূল্যবোধ গঠণে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।

(২)
এই সময়ে বিশ্বকে খুব বড় করে ভাবা যায় না। বিশ্ব এখন মানুষের কাছে কেবলি একটি দেশ। কারণ, মুহূর্তেই বিশ্বের যেকোন প্রান্তে ঘটে যাওয়া যেকোন ঘটনা যেকোন দেশের মানুষ সহজেই জানতে পারছে, অন্যকে জানাতে পারছে, এমনকি, সেই ঘটনার পক্ষে বিপক্ষে সে তার মতামত দিতেও পারছে। শুধু তাই নয় ঘটনার পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে গণ-আন্দোলনও গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে। তাহলে আমরা বলতে পারি, বিশ্ব আমাদের কাছে কেবলি একটি ভূখণ্ড-একটি দেশ। একুশ শতকের বিজ্ঞানমনষ্ক, জ্ঞানী-গুণী ও বুদ্ধিমানদের নিকট বিশ্ব একটি গ্লোব্যাল ভিলেজ। অর্থাৎ, বিশ্ব কেবলি একটি গ্রাম।
কেউ যদি আরো বড় করে ভাবতে পারে, তাহলে বলা যায় পুরো বিশ্বটি একটি পরিবার মাত্র। হ্যাঁ, কেবলি একটি পরিবার।
তাহলে পুরো বিশ্বটাকেই আমি যদি পরিবার বলে মনে করতে পারি, তাহলে পরিবারের কাছে আমার কতগুলো চাহিদা থাকবে। আমার কাছেও পরিবারের কতগুলো চাহিদা থাকবে। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের একে অপরের প্রতি কঠিন একটি মেলবন্ধন থাকবে। বিশ্বপরিবারের সদস্যরা একে অপরের সুখে-দুখে কাছে আসবে, মমতার হাত প্রসারিত করবে, ভালোবাসবে, প্রেম-প্রীতি আর সুন্দর সহাবস্থানের একটি মানবিক বলয় গড়ে তুলবে।
বিশ্ব পরিবারের কোথাও যদি কোন ঘাটতি দেখা দেয় তাহলে সকলে সম্মিলিতভাবে সেই ঘাটতি পূরণে কাজ করবে। কোন সদস্য যদি ভালো কাজ করে তাকে পরিস্কৃত করবে, কেউ খারাপ কাজ করলে তাঁর উপযুক্ত সংশোধনের ব্যবস্থা করবে। যদি সে সংশোধিত না হয় তাহলে তাকে বিধিমতো শাস্তির ব্যবস্থা করবে। তবে সেই শাস্তিুটিও মানবিকতা বজায় রেখে হতে হবে।
বিশ্বপরিবারের বিভিন্ন অংশ, বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার বেশিরভাগ স্থানই আবহমান কাল থেকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নামের ভাগিদার। ইউরোপের অনেকাংশে মানবাধিকারকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ফলে এবং এ অংশের মানুষগুলো মানবাধিকার নিশ্চিন্ত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কারণে বিশ্বপরিবারের অনেক সদস্যই ইউরোপকে সুনজরে দেখেন।
ধর্ম ও রাজনীতির বাইরে গিয়ে চিন্তা করেই অনেকে ইউরোপকে মানবাধিকারের দেশ বলে আখ্যায়িত করেছেন। যারা বিশ্বপরিবারের এই কোণে এসে বসবাস করেন, তারাও জানেন, মানবতাবোধটুকুকে এখানে গুরুত্ব দেয়া হয় বলেই অনেক অমানবিক কাজ করার পরেও তাদের অনেকেই এখানে এসে মানবাধিকারের সুযোগে নিজেদের নতুনভাবে ভাবতে পরেছেন, নতুন একটি জীবনের সন্ধ্যান পেতে মনোযোগি হতে পেরেছেন। যদি এই অঞ্চলে মানবাধিকারটুকুকে গুরত্ব না দেয়া হতো তাহলে এশিয়া, আফ্রিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশের দাগি আসামী থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক বিপর্যস্থ রাষ্ট্রনায়ক, অনেক স্বৈরাচারি, মানবতা লুণ্ঠনকারী মানুষগুলো এখানে এসে আশ্রয় পেতেন না। নিজেদের দেশে থেকেই তারা জনরোষে কিংবা কারারোষে প্রাণপাত করতেন।
অর্থাৎ, মানুষ যেভাবে অক্সিজেনের অভাবে অক্সিজেনের খোঁজে দুষণমুক্ত পরিবেশ কামনা করে, মানুষ যেভাবে খাদ্যের জন্য কঠিন-কঠোর কষ্ট করে, তেমনি, মানবাধিকার ভোগের জন্যও মানুষ বিশ্বপরিবারের আনাচে কানাচে ছোটে যাবার চেষ্টা করে। এই চেষ্টাটুকু জন্মগত। শ্বাস-প্রশ্বাস, জীবন ধারন এবং মানবাধিকার একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। হউক সে নিখাদ ভালো মানুষ, হউক সে দাগি আসামি। আমরা কখনোই বলতে পারি না, মানবাধিার ভোগ করার অধিকার কেবলি ভালো মানুষের।

(৩)
সম্প্রতি, ব্রিটেনে মানবাধিকার আইন (হিউম্যানরাইটস) বিলুপ্ত হচ্ছে বলে সংবাদ বেরুচ্ছে।
ধরলাম সংবাদটি সত্য এবং ইংল্যান্ডের কনজারভেটিভ সরকার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মানবাধিকার আইন বিলুপ্ত করে দিয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মতো আইন করে নতুন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দিলো। কিন্তু তার ফলাফল কি হবে?
আগেই বলেছি, বিশ্ব একটি পরিবার। পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের সঠিক পথে চালানোর দায়িত্ব পরিবারের কর্তার। অর্থনৈতিক উন্নত অবস্থান, সামাজিক ন্যায় পরায়নতা ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বপরিবারের অনেক দেশই ব্রিটেনের দিকে চোখ রাখে। এখানে কোথায় কী হচ্ছে, আইন আদালত কেমন চলছে, মানবাধিকারকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে এই দেশটি কী কী পদেক্ষেপ নেয় এবং তা কিভাবে প্রয়োগ করে সে দিকেও অনেকের নজর থাকে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের এক অবিশ্বাস্য সহাবস্থান গড়ে ওঠেছে ব্রিটেনে। এখন ব্রিটেন যদি মানবাধিকারের পতাকাটিকে নামিয়ে ফেলে তাহলে বিশ্বের সামাজিক অবস্থানে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। মানুষের মধ্যে তখন মানবাধিকার নিয়ে একটি নেতিবাচক ধারনার সৃষ্টি হবে।
বিশ্বের অনেক দেশের বিচার ব্যবস্থা, সামাজিক অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদে মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য ব্রিটেনের পার্লামেন্টের সামনে মানুষ জড়ো হয়, স্মারকলিপি প্রদান করে, ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে ধরনা দেয়। এখন ব্রিটেন নিজেই যদি মানবাধিকার আইনকে বিলুপ্ত করে কিংবা সংকোচিত করে, তাহলে বিশ্বপরিবারের সদস্যগুলোর মধ্যে একটি বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।
বিভিন্ন দেশের অপরাধীরা পালিয়ে ব্রিটেনে এসে এ্যাসাইলম গ্রহণের চেষ্টার পরিবর্তে নিজ দেশেই টিকে থাকার চেষ্টায় আরো বিধ্বংসী হয়ে ওঠবে। নতুন নতুন অপরাধী জোটের সৃষ্টি হবে। অপরাধীরদের মধ্যে টিকে থাকার প্রাণপন লড়াই শুরু হবে। সমাজে অপরাধের বিস্তার ঘটবে। পরিবারগুলো আরো বেশি অসহায় হয়ে পড়বে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ ও অনাচার বড়বে। বিশ্বপরিবারের মানবাধিকারের ধ্বজাধারী ব্রিটেনের নিজস্ব অবস্থান থেকে সরে আসার অর্থ কেবল নিজেদের ধ্বংস নয়, বরং এর মাধ্যমে বিশ্বমানবসমাজে সৃষ্টি হবে নতুন নতুন অপরাধপ্রবণতা।
পরিবারে কর্মিরা নয়, ভাবতে হবে কর্তাকে। ব্রিটেন সেই কর্তার ভূমিকায় শত বছর অতিক্রম করেছে।

(**লেখাটি কিন্তু অরাজনৈতিক। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে শর্ষের ভূতনাথ পাওয়া যাবেই।