বিলুপ্তির পথে প্রচলিত টিভি: মোস্তাফা জব্বার

101

আমরা সবাই জানি যে গণমাধ্যমের আয়ের সিংহভাগ আসে বিজ্ঞাপন থেকে। কাগজের পত্রিকা যা আমরা দাম দিয়ে কিনি তারও দাম কেবল অতি সামান্য ব্যয় কভার করতে পারে। বিজ্ঞাপন যদি না থাকে তবে কাগজ বন্ধ হয়। বিজ্ঞাপন না থাকলে টিভি-রেডিও বন্ধ হতে বাধ্য।

বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের অবস্থাটি কি তা আমি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর একটি মন্তব্য থেকে বুঝে নিতে পারি। তিনি সম্প্রতি এটিএন নিউজে একটি আলোচনা সভায় বলেছেন যে, এখন আর সাড়ে চার লাখের কাগজের পত্রিকায় কোনো প্রচারণা করে লাভ নেই যেখানে ডিজিটাল মিডিয়াতে তারও কম খরচে ৩০ লাখ লোকের কাছে পৌঁছানো যায়। এক্ষেত্রে আরো বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে বিজ্ঞাপনের টার্গেট যদি নতুন প্রজন্ম হয় তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই হওয়া উচিত সেরা মাধ্যম। যুক্তরাজ্যভিত্তিক টিভি মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান থিনবক্সের গবেষণা ও পরিকল্পনা পরিচালক ম্যাট হিল এ সম্পর্কে বলেন, টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে যে পরিমাণ খরচ হয়, বর্তমানে সে তুলনায় ক্রেতাদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যায় না। অপরদিকে, ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে অনেক বেশি সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

এ সময় টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন হিল। তিনি বলেন, টিভি বিজ্ঞাপন অবশ্যই অনেক বেশি মানুষের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারে এবং সর্বোচ্চ মুনাফা দিতে পারে। তবে এজন্য টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের মান আরো বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে বিনিয়োগও। ইউটিউবের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। এখানে বিজ্ঞাপনের বাজারটিও ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে। যা টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের জন্য ইতোমধ্যেই হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ হুমকি মোকাবেলায় টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রিকে আরো সক্রিয় হতে হবে।

কোনো রকমের গবেষণা ছাড়াই সহজ-সরলভাবে এটি বলা যায় যে, প্রচলিত টিভির প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দিনে দিনে কমছে। বিষয়টি যে প্রচলিত সম্প্রচারকরা অনুভব করেন না সেটিও নয়। তারা খুব ভালোভাবেই এটি বোঝেন যে ডিজিটাল প্রযুক্তির স্পর্শের বাইরে তারা থাকতে পারবেন না। এজন্য প্রথমে তারা ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন। সেখানে কিছু টেক্সট ও কিছু গ্রাফিক্স দিয়ে তাদের চ্যানেল ও অনুষ্ঠানাদির খবরাখবর দিতেন। এখন তারা নিজেরাই আইপি টিভিতে পরিণত হয়েছেন। এমনকি ইউটিউবে চ্যানেল খুলে তাদের অনুষ্ঠানগুলোও সেখানে তুলে দিচ্ছেন। অন্যদিকে সেখান থেকে করা হচ্ছে লাইভ স্ট্রিমিং। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব অঘটন ঘটানোর নায়ক হচ্ছে ইন্টারনেট। এটি নিয়ে নতুন ভাবনাটির নাম হচ্ছে ইন্টারনেট অব থিংস। এই ভাবনার মানে দাঁড়ায় আমাদের চারপাশে যেখানে যে যন্ত্রই থাকুক সেটি ইন্টারনেটে যুক্ত থাকতে পারবে। যদি সেটিই বাস্তবায়িত হয় তবে হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন-গলার হার বা আংটি টিভি দেখার উপযোগী হয়ে যাবে। তখন কে কষ্ট করে টেলিভিশন সেট নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। হতে পারে ভিডিও-টিভির প্রচণ্ড আগ্রাসনের পরও সিনেমা যেমনটি বেঁচে আছে টিভি তেমন করে আরো কিছু সময় বেঁচে থাকবে। কিন্তু প্রচলিত টিভি হয়তো এক সময় জাদুঘরেই দেখতে হবে।

অন্যদিকে টেলিভিশনের কনটেন্ট বিষয়টিও বর্তমানের রূপটাতে থাকছে না।

আমি আর্নেস্ট এন্ড ইয়ং নামক একটি প্রতিষ্ঠানের একটি প্রতিবেদন এখানে ছোট করে তুলে ধরছি। তারা তাদের প্রতিবেদনে সামনের দিকে তাকিয়ে টিভির কথা ভাবতে বলেছে। তাদের মতে সামনের দিনে ছয়টি প্রবণতা টিভির জগতটাকে বদলাবে। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয় যে, এজন্য টিভি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দর্শকদের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এমনকি তাদের দর্শক-শ্রোতার পছন্দ-অপছন্দ জানার জন্যও বিনিয়োগ করতে হবে। আমি মনে করি, বস্তুত টিভি বলি, সিনেমা বলি, রেডিও বলি বা পত্রিকা বলি তার বাহন হিসেবে ইন্টারনেটের একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে ওঠার পর এর বিষয়বস্তুর কোনো সীমানা থাকবে না। ফলে বিনোদন বা তথ্য-উপাত্ত যার যা খুশি তার সবটাই ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে বিদ্যমান টিভি ব্যবস্থার আমূল রূপান্তরটা আসলে দেশে ইন্টারনেটের প্রসারের ওপর নির্ভরশীল। এখনো আমরা দেশের জেলা শহরগুলোতে থ্রিজি পৌঁছাতে পারিনি। খুব সামান্য গতিতে আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহƒত হয়। এটির পরিবর্তন মানে বাংলাদেশটারই পরিবর্তন। আমরা যে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি সেটি কেবলমাত্র দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মাঝে এর মূল্য আসার ওপর নির্ভরশীল। টিভি-পত্রিকা-রেডিও-সিনেমা সব মিডিয়ারই একটি গন্তব্য ইন্টারনেট।

খুব সঙ্গত কারণেই আমি মনে করি যে টিভি দেখার যন্ত্র এবং সম্প্রচারের উপায়ে পরিবর্তনের পাশাপাশি রূপান্তরটা এর বিষয়বস্তু বা চরিত্রেও হবে। আমি নিজে একাত্তর নিউজটিভি নামক একটি আইপি টিভির শুভেচ্ছাবাণীতে লিখেছি, ‘রেডিও-টিভি তো ইন্টারনেটেই থাকবে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ৮ লাখ সেখানে ২০১৪ সালের অক্টোবরে সেই সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সোয়া চার কোটি। অঙ্কের হিসাবে এই ধারাবাহিকতা যদি অব্যাহত থাকে এবং যা থাকাই স্বাভাবিক তবে সামনের পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ১১ কোটি অতিক্রম করবে। আমার মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে সারা দুনিয়াতে এমন একজন মানুষ পাওয়া যাবে না যার ইন্টারনেট ব্যবহার করার ক্ষমতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন না। ২০১৬ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৬ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। মোবাইল ব্যবহারকারী ১৩ কোটি ছাড়িয়েছে। কেবল ফেসবুক ব্যবহারকারী ২ কোটি ছাড়িয়েছে।’ কেউ কি চোখ বুজে কখনো ভেবে দেখেছেন যে, এর প্রভাবটা কোথায় কিভাবে পড়বে? অর্থাৎ পুরো জীবনটাই ইন্টারনেট নির্ভর হবে। আর এটিকে অবশ্যই ইন্টারনেট সভ্যতা বলতে হবে। এমন দুনিয়াতে জীবনটা কেমন হতে পারে? বাসাবাড়িতে ইন্টারনেটের গতি থাকবে ২ গিগাবিট। ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প-কলকারখানা পরিচালিত হবে ইন্টারনেটে। জ্ঞানার্জন ইন্টারনেটে। সরকারও ইন্টারনেটে। প্রেম-ভালোবাসা-সামাজিকতা-বিনোদন; তথা জীবনধারা সবই ইন্টারনেটে।

তাহলে রেডিও-টেলিভিশন কি হবে? কেউ টেলিভিশন সেটে টিভি দেখবে না? কোনো এক ধরনের ডিজিটাল ডিভাইসেই থাকবে সম্প্রচার মাধ্যম এবং অন্যান্য মিডিয়া? বিটিআরসি থেকে তরঙ্গ বরাদ্দ নেয়ার প্রয়োজন হবে না। সেই কাজটি ইন্টারনেট সেবাদানকারীর জন্য সীমিত থাকবে। সম্প্রচারকারী ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইদথ কিনবেন। দর্শক-শ্রোতা রেডিও-টিভির সঙ্গে ইন্টারএ্যাক্ট করবে। সম্প্রচারের সময় বলতে কিছু থাকবে না। চব্বিশ ঘণ্টা বলতে কিছু নেই। ৩৬৫ দিন নামকও কিছু নেই। খবর, নাটক-প্রামাণ্য চিত্র-চলচ্চিত্র; কোনোটাই কখনো মারা যাবে না। নিজের ডিজিটাল যন্ত্রে নয়, এর সবাই থাকবে সাইবার আকাশে। ইন্টারনেটের মতোই সম্প্রচবার বা মিডিয়ার রাষ্ট্রীয় সীমানা বলতে কিছু থাকবে না। হতে পারে ভাষার সীমানাটাও বিলীন হবে। এসব মাধ্যমে কনটেন্টস কেবল যে সম্প্রচারকারীই তৈরি করবেন তা নয়- সাধারণ মানুষ-দর্শক শ্রোতাও অংশ নেবে এই মহাযজ্ঞে। তবে পেশাদারিত্ব বা সৃজনশীলতার সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং হবে সম্প্রচার মাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাণের মূল স্রোত। সম্ভবত এরচেয়ে বেশি কিছু আমি এখন কল্পনাও করতে পারি না। তবে সহসাই ইন্টারনেটও থাকবে না- অন্য কোনো নেটওয়ার্ক ইন্টারনেটের স্থলাভিষিক্ত হবে।

অনেকেই এটি জানেন যে, টিভি সেটের বাইরে টিভি দেখার নানা ধরনের উপায় আছে। খুব সম্প্রতি কালারস অব বাংলাদেশ নামক একটি প্রতিষ্ঠান আড্ডা আইপি টিভি নামের একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছে, যেটি দিয়ে এন্ড্রয়েড ও আইওএস অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা ভাষার সাতটি টিভি চ্যানেল দেখা যায়। এসব টিভির মাঝে আছে বাংলাদেশ টেলিভিশন, একাত্তর, চ্যানেল আই ও দেশ। ভারতের তারা এবং আকাশ ত্রিপুরা টিভিও এতে দেখা যায়। অতি সাধারণ ব্যান্ডউইদথ দিয়েই এসব টিভি দেখা যায়। আমি নিজে এই ল্যাপটপটি ব্যবহার করে খুশি হয়েছি। যদিও মোবাইল ইন্টারনেটের জন্য অনেক স্থানেই টিভি দেখা বাধাগ্রস্ত হয়েছে তথাপি আমি মনে করি যে দুনিয়াতে টিভি দেখার যন্ত্রটা বদলে যাচ্ছে এবং স্মার্ট ফোনটাই টিভি দেখার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

যিনি বা যারাই সামনের আগামী এক দশকের জন্য সম্প্রচার মাধ্যমে বসবাস করতে চান তার কাছে সবিনয়ে আবেদন হচ্ছে কথাগুলো মনে রাখার জন্য। অ্যাপল কম্পিউটারের প্রধান নির্বাহী টিম কুক সম্প্রতি টিভির ভবিষ্যৎ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। গত ২৪ মে ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত তার এই মন্তব্যে তিনি বলেন, অ্যাপস হচ্ছে টেলিভিশনের ভবিষ্যৎ। তিনি আমস্টার্ডামে একটি সেমিনারে বক্তব্য পেশকালে আরো বলেন, নতুন নতুন ডিজিটাল ডিভাইস মানুষের জীবনধারাকেই বদলে দেবে।

বাংলাদেশের টিভি মিডিয়াকে পর্যবেক্ষণ করে আমি একটি বিষয়ে নিশ্চিত দিতে পারি যে, আমাদের এই সম্প্রচার মাধ্যমটি সময়ের চেয়ে তেমন পিছিয়ে নেই। দেশের অনেক টিভি চ্যানেল খবর ও অনুষ্ঠানাদি নির্মাণ ও সম্প্রচারে কেবল প্রচলিত মাধ্যম নয়, ইন্টারনেটকেও ব্যবহার করছে। ক্যামেরার সঙ্গে ইন্টারনেট মডেম ব্যবহার করে দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কোনো খবর বা অন্য ঘটনা সম্প্রচার করা হচ্ছে। অনেকেই অনলাইনে তাদের সম্প্রচার ব্যাপকভাবেই শুরু করেছে। অনেকে ইউটিউবকে ব্যবহার করছে। এদের সবার জন্যই তাদের পুরো সম্প্রচার কাঠামোকে ইন্টারনেটে নিয়ে আসা তেমন বড় কোনো চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে হয় না। অন্যদিতে তারুণ্যনির্ভর সম্প্রচার সাংবাদিকতার জগতটাও বদলে গেছে। এখনকার টিভি কর্মীরা প্রায় সবাই ইন্টারনেটকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম। ফলে আমরা এই খাতে আশার আলোই দেখতে পাই। (সমাপ্ত)

মোস্তাফা জব্বার : লেখক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট।