সেলিম ওসমান বললেন, আমি দুঃখিত লজ্জিত

79

বিলেতবাংলা ডেস্ক, ২৬ মে: শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় ‘দুঃখ ও লজ্জা’ প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান বলেছেন, ‘আমি দুঃখিত ও লজ্জিত। কিন্তু পেছনের ঘটনা কেউ প্রকাশ করেনি। শিক্ষককে যখন আমি জনরোষ থেকে রক্ষা করেছিলাম তখন ওই শিক্ষক নিজেই অবস্থা থেকে রক্ষার জন্য আমাকে অনুরোধ করেছিল। আমি সে কাজটিই করেছি। সেই শিক্ষককে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পুনর্বহাল করেছে তাতে আমার কোনো আপত্তি নাই।’ তদন্তের বিষয়ে সেলিম ওসমান বলেন, ‘বারবার স্কুলের শিক্ষার্থীদের বক্তব্য নিয়ে তাদের টর্চারিং করা হচ্ছে। তাদের মিথ্যেবাদী বানানো হচ্ছে।’

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে উঠবোস করানোর ঘটনার ভিডিওচিত্র কোনো সাংবাদিক ধারণ করেননি বলে জানিয়েছেন সেলিম ওসমান। তিনি বলেন, ‘সেদিনের ঘটনায় আমার মনে হয় আমি রাজনৈতিক শিকার হয়েছি। আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। একটি গ্রুপ প্রচণ্ড মেধা খাটিয়ে কাজটি সেরেছে। কারণ ঘটনার পর যেভাবে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতারা আমার বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছেন তাতে অনেক কিছু সন্দেহ পোষণ হয়।’

বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সেলিম ওসমান আরো বলেন, “আমার কাছে অনেক প্রমাণাদি ছিল। সেগুলো আমি সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলাম। আমি গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করতে চাইলেও আমার দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে সেই সংবাদ সম্মেলন করা থেকে বিরত হই। এরশাদ স্যারকে আমি কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেলিম তো আল্লাহর ওলি হয়ে গেছ। দেশের কোটি কোটি মানুষ তোমার জন্য দোয়া করছে। সংবাদ সম্মেলন করে কী হবে? তোমার জন্য মানুষ দুই হাত তুলছে। তোমার সঙ্গে দেশের মানুষ আছে, তোমার সঙ্গে আমি আছি, জাতীয় পার্টি আছে, আল্লাহ আছে। তুমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আছো ও থাকো। এখন এসব নিয়ে কথা বলতে যেও না।”

সভায় নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, ব্যবসায়ী সমাজ, সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শ্রমিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পেশাজীবী পরিষদ, নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতি, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, নারায়ণগঞ্জ মহিলা সংস্থা ও মহিলা নেতৃবৃন্দ, নারায়ণগঞ্জ শিক্ষক সমিতি এবং বিএমএ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সভা শুরু হওয়ার আগে অনেক এলাকা থেকেই দলীয় স্লোগান নিয়ে কর্মীরা সভায় যোগ দেন।

সেলিম ওসমান বলেন, ‘বন্দরের ঘটনায় আমি রাজনৈতিক শিকার বলে মনে করছি। আর সে কারণেই আমার সন্দেহ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা সেতু কেন প্রধানমন্ত্রী বলার পরেও কাজ শুরু হচ্ছে না।’ তিনি প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ‘আমি শিক্ষককে কানে ধরে উঠবোস করানোর কারণে যদি অন্যায় করে থাকি তাহলে এক ছাত্রকে মারধর করেও তো শিক্ষক অন্যায় করেছেন। কই এখন তো হাইকোর্ট কিছু বলেন না। এখন তো কেউ বলে না শিক্ষার্থী প্রহারে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করা হচ্ছে। বিচার কী শুধু একটাই?’ তিনি বলেন, ‘এখনো পঞ্চায়েত, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। বন্দরের ঘটনায় স্থানীয় সবাই আমাকে চাপ দিয়েছিল। সে কারণে আমি একজন নাস্তিকের বিচার করেছি। যদি সেটা করা না হয় তাহলে ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কার্যক্রম কোনো জনপ্রতিনিধিরা করবেন না। এ বিচারের জন্য যদি আমাকে ফাঁসির কাষ্ঠেও যেতে হয় তাহলেও আমি যেতে প্রস্তুত।’ সভায় তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি নারায়ণগঞ্জকে অস্থিতিশীল না করতেও হুঁশিয়ারি দেন।

সেলিম ওসমান বলেন, ‘ঘটনার পর আমি শ্যামল কান্তি ভক্তের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলাম। ভারতের ভেলুরে পাঠানোর ব্যবস্থা করছিলাম। পকেট খরচের জন্য ২০ হাজার টাকাও দিয়েছি। কিন্তু উনি ফোন করে জানালেন, ওনার তিন মেয়ের বিয়ে বাবদ ৩০ লাখ করে ৯০ লাখ ও তাঁকে আরো ১০ লাখ—এ এক কোটি টাকা দিতে হবে। এ প্রস্তাব পাওয়ার পর থেকেই আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। তাই তো আমি বলি আমার বিএনপি, আমার জাতীয় পার্টি, আমার আওয়ামী লীগ।’

বন্দরের ঘটনার পর সর্বত্র আন্দোলন ও কর্মসূচি প্রসঙ্গে সেলিম ওসমান বলেন, ‘শুনেছি ২৭ মে শুক্রবার নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন মাদ্রাসার লোকজন আন্দোলন করবে। আমি সবাইকে অনুরোধ করব এখন থেকে সব আন্দোলন-কর্মসূচি বাদ দিয়ে দোয়া করুন আমার জন্য। আমি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’

সেলিম ওসমান বলেন, ‘এত বড় ঘটনা ঘটে গেল অথচ আমার সংসদের কোনো বন্ধুই আমাকে টেলিফোন করে জানতে চাননি। কোনো আলোচনাও করেননি। তাঁরা তো আমাকে ডাকতে পারতেন, শাসন করতে পারতেন। কিন্তু সেটি তাঁরা করলেন না।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের উদ্দেশ্যে সেলিম ওসমান বলেন, ‘ও নাসিম ভাই, একদিন নারায়ণগঞ্জ আসেন। আমিই আপনার কাছে ক্ষমা চাই। আসেন, বসেন, আপনিসহ যাঁরা আমাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা তো আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতা। মনে রাখবেন এ নারায়ণগঞ্জের বায়তুল আমান (সেলিম ওসমানের দাদা সাবেক এমএলএ খান সাহেব ওসমান আলীর বাসভবন) থেকেই আওয়ামী লীগের জন্ম। দাওয়াত রইলো একদিন আসেন। আমাকে জুতা দিয়ে মারেন। কারণ আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী আপনার কাছে কৃতজ্ঞ এ কারণে আপনি নারায়ণগঞ্জে ডিজিটাল টেলিফোন দিয়েছেন, ৪০০ বছরের কলঙ্ক পতিতাপল্লী উচ্ছেদে সহায়তা করেছেন।’

সভায় উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য অ্যাডভোকেট হোসনে আরা বাবলী, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী, বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি আসলাম সানি, এনসিসিআইয়ের সহসভাপতি মঞ্জুরুল হক, সদর উপজেলার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস, বন্দর উপজেলার চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল প্রমুখ।সূত্র:কালেরকণ্ঠ