সরকারের ভূমিকায় মুক্তমনা হত্যার উৎসাহ পাচ্ছে জঙ্গিরা: জাফর ইকবাল

68

একুশ তাপাদার :

অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হাতে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্যে এরকম হত্যাকাণ্ড আরও ঘটানোর উৎসাহ পাচ্ছে জঙ্গিরা।

বুধবার (১১ মে) শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার এক বছরের প্রাক্কালে দেয়া এক সাক্ষাতকারে জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিক বলেন, “একের পর এক প্রগতিশীল মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে কিন্তু সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন তাতে খুনিরা বার্তা পাচ্ছে , যত খুনই হোক আসলে তাদের কোন সাজা হবে না।”

অনন্তের কথা স্মরণ করে জাফর ইকবাল বলেন, “অনন্ত আমার ছাত্র, ওর বোন সরাসরি আমার বিভাগেরই স্টুডেন্ট, ওর পরিবারের সাথেও আমি ঘনিষ্ঠ। ওর মতো প্রতিভাবান তরুণ লেখককে হত্যা করা হল। আমি ভেবেছিলাম এর প্রতিকার হবে।”

তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে ধর্ম অবমাননা করলে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে, হ্যাঁ কেউ অবমাননা করলে শাস্তি হতে পারে কিন্তু ভিন্ন মতের জন্য কাউকে হত্যা করলে আরও কঠোর শাস্তি হবে- এই কথা কেউ বলে না।

অনন্ত হত্যার বিচার প্রক্রিয়া ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, “কোন এক মহল থেকে আমি জেনেছিলাম  অনন্ত হত্যার বিচার ঠিকভাবে এগোচ্ছে কিন্তু কদিন আগে দুজন আসামির জামিন পেয়ে যাওয়ায় চরম হতাশ হয়েছিলাম যদিও সাথে সাথে তাদের আবার গ্রেপ্তার করা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “অভিজিতের বাবা অজয় রায়ের আক্ষেপ আমরা শুনেছি। অভিজিতের খুনিদের ধরা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন খুনিরা নাকি বিদেশে পালিয়ে গেছে।” ভয়াবহ অপরাধ করার পরও খুনিরা কীভাবে বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছে এই প্রশ্ন তোলেন জাফর ইকবাল।

 

এলজিবিটি কর্মি জুলহাস মান্নান ও নাট্যকর্মী তনয় হত্যার পর পুলিশের দেয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “পুলিশ বলছে খুনিরা পালিয়ে গেল সাধারণ মানুষ কেন এগিয়ে আসেনি, অস্ত্রধারী খুনিদের আটকাতে সাধারণ মানুষ এগুবো কোন ভরসায়”। পুলিশ খুনিদের ধরতে পারলে এমন ঘটনা ঘটত না। প্রশাসন এসব অপরাধীদের ধরতে আন্তরিক কিনা সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

 

নিজের নিরাপত্তায় থাকা সশস্ত্র পুলিশ সদস্যদের দেখিয়ে তিনি বলেন, সরকার আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, ইনারা সর্বদা আমার পাশেপাশে থাকেন। খুবই অস্বস্তির মধ্যে দিন পার করছি আমি।

 

দেশের এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয় উল্লেখ করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, “বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার মধ্য দিয়ে দেশের সংস্কৃতিটাই বদলে গেছে, বিচার পাওয়ার প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে।

 

কিন্তু যে সরকার গুরুত্বপূর্ন এসব বিচার করল তারাই আবার  ব্লগার ও মুক্তমনা হত্যার বিচার করছে না। এটা ঠিক মেনে নেয়া যায় না । সরকারের এই ভূমিকার কারণে মৌলবাদী গোষ্ঠী আস্কারা পাচ্ছে। – যুক্ত করেন এই লেখক।

 

তবে একের পর এক হতাশার ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশ ঠিকই ঘুরে দাঁড়াবে বলেও মনে করেন তিনি। বাংলাদেশের তরুন-তরুনীরাই এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করবে আশাবাদি ব্যক্ত করেন তিনি।

 

২০১৫ সালের ১২ মে সকালে অফিস যাওয়ার পথে বাসা অদূরে নিজ পাড়া সুবিদবাজারের নূরানি আবাসিক এলাকার দস্তিদার দিঘির পাড়ে কয়েকজন উগ্র ধর্মীয় জঙ্গি নির্মম ভাবে কুপিয়ে হত্যা করে অনন্ত বিজয় দাশকে। অনন্ত বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখি করতেন। তার লেখা ও সম্পাদিত একাধিক বই প্রকাশিত রয়েছে। সিলেটে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক অনন্ত ‘যুক্তি’ নামের বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিনেরও সম্পাদক ছিলেন।

 

হত্যার পরদিন অনন্তের বড় ভাই রত্নেশ্বর বাদী হয়ে সিলেট মহানগরের বিমানবন্দর থানায় অজ্ঞাত চার দুর্বৃত্তকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখির কারণে অনন্তকে ‘উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠী’ পরিকল্পিতভাবে খুন করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। মামলার তদন্তভার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিতে স্থানান্তর হলে স্থানীয় একটি পত্রিকার ফটোসাংবাদিককে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি জামিন পান।

 

গত বছরের ২৯ আগস্ট সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার পূর্ব পালজুর গ্রাম থেকে মান্নান ইয়াহইয়া ওরফে মান্নান রাহী (২৪) ও মোহাইমিন নোমান ওরফে নোমান নামে দুই ভাই এবং আবুল খায়ের ওরফে রশীদ আহমদ (২৪) নামের তাঁদের আরেক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। মামলায় বর্তমানে মান্নান রাহী নামের একজন জেলে রয়েছেন।

 

তবে নোমান ও রশীদ সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে ৫ মে সিলেট কারাগার থেকে বের হন।  ওই দিনই নাশকতার এক মামলায় আটক দেখিয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানার পুলিশ ফের গ্রেপ্তার করে তাঁদের।