সফলদের স্বপ্নগাথা: ‘তুমি কে’ নয়, বরং খোঁজো ‘তুমি কে নও’!: ম্যাথিউ ম্যাকনহেই

98

 

অস্কারজয়ী অভিনেতা ম্যাথিউ ম্যাকনহেই। ছিপছিপে দেহেরে রোগা তরুণ, টেকো মাথার ভূবিজ্ঞানী কিংবা সুদর্শন মহাকাশচারী—কত বিচিত্র সব চরিত্রেই না পর্দায় দেখা গেছে তাঁকে! রুপালি পর্দায় চরিত্রের প্রয়োজনে বারবার নিজেকে বদলেছেন এই পরিশ্রমী অভিনেতা। নিজের জীবন থেকে নেওয়া শিক্ষার কথা বলেছেন গত বছর ১৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হস্টনের সমাবর্তন বক্তৃতায়।

 

ম্যাথিউ ম্যাকনহেই: তোমরা যে ডিগ্রিটা পেলে, এর অর্থ কী?

অর্থ হলো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে তোমার বিশেষ জ্ঞান আছে। কিন্তু এর আদৌ কি কোনো মূল্য আছে? আজকের দিনে? চাকরির বাজারে? আমরা জানি এখন চাকরির বাজার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতামূলক। তোমরা কেউ হয়তো ইতিমধ্যেই চাকরি পেয়ে গেছো, কেউ পাবে, আবার কারও কারও কখনোই কোথাও চাকরি হবে না। অনেক প্রশ্ন তোমার মাথায়, যার উত্তর তুমি জানো না, ব্যাপারটা ভীতিকর বটে!

আজ আমি তোমাদের বলব, জীবনের এই যাত্রা থেকে আমি কী কী শিখেছি। কিছু শিখেছি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে, কিছু লোকের মুখে শুনেছি—কিন্তু এর সবটাই সত্য।

এক: জীবনটা সহজ নয়। একে সহজ করার চেষ্টাও কোরো না। দুঃখ-দুর্দশার শিকার কি শুধু তুমিই হলে কি না, এই হিসাব-নিকাশের ফাঁদে পোড়ো না। বরং মোকাবিলা করো। যথেষ্ট ঘাম ঝরলে তবেই পুরস্কারের আনন্দটা পাওয়া যায়।

দুই: ‘অবিশ্বাস্য’ ডিকশনারির সবচেয়ে অর্থহীন একটা শব্দ। আমরা বলি ‘অবিশ্বাস্য একটা খেলা’, অবিশ্বাস্য বই, ছবি, শক্তি…সত্যিই কি? হতে পারে দর্শনীয়, বিস্ময়কর, সবচেয়ে সুন্দর, অসাধারণ…কিন্তু অবিশ্বাস্য কী করে হয়? নিজের আর অন্যের ওপর আরও একটু বিশ্বাস রাখো। আমরা মানুষেরা পৃথিবীতে যা কিছুই করি না কেন, সেটা অবিশ্বাস্য হতে পারে না। অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ আমরাই পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী।

তিন: সুখ আর আনন্দ এক নয়। সব সময় শুনি লোকে বলে, ‘আমি শুধু সুখী হতে চাই।’ কিন্তু সুখ আসলে কী? সুখ এমন একটা জিনিস যেটা সব সময় কোনো কিছুর ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। জয়ী হলে আমি সুখী হব, না হলে নয়। কিন্তু আনন্দ ভিন্ন জিনিস। আমি একটা কাজ আনন্দ নিয়ে করতে পারি, তাতে ফলাফল যা-ই হোক না কেন। ব্যক্তিগতভাবে একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমি আমার কাজটা আনন্দ নিয়ে করি। আমি সুখী হলাম তখন, যখন আমি প্রতিটা কাজের ফলাফল খোঁজা বন্ধ করলাম। এই ছবিটা বক্স অফিসে হিট হতে হবে, এই চরিত্রটা বিখ্যাত হতে হবে, সহকর্মীদের কাছ থেকে সম্মান পেতেই হবে—এত চাওয়া কী দরকার!

চার: নিজের মতো করে সফলতার সংজ্ঞা খুঁজে নাও। আমরা সবাই সফলতা চাই। কিন্তু তোমার কাছে সফলতা কী? আরও টাকা? সুখী পরিবার? একটা সাজানো সংসার? খ্যাতি? আত্মার শান্তি? আরও একটু ভালো থাকার মতো একটা জায়গা খুঁজে পাওয়া? নিজেকে সব সময় প্রশ্নটা করো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো প্রশ্নের উত্তরটা বদলে যাবে, তবু। আগে সফলতার সংজ্ঞাটা খুঁজে বের করো, তারপর সে অনুযায়ী কাজ করো। এটা মেনে নাও, আমাদের ভেতর দুই ধরনের নেকড়ে বাস করে। একটা ভালো নেকড়ে, একটা মন্দ নেকড়ে। দুটো নেকড়েই খেতে চায়। আমাদের শুধু মন্দ নেকড়েটাকে একটু কম খাইয়ে ভালো নেকড়েটাকে বেশি খাওয়াতে হবে।

 

পাঁচ: তুমি কোথায় নেই তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তুমি কোথায় আছ। ‘আমি জানি আমি কে?’ এটা জানার অর্থ নিজের পরিচয় জানা নয়। তোমাকে বরং জানতে হবে, ‘তুমি কে নও?’

 

ধরো, এমন এক দল বন্ধুর সঙ্গে তুমি চলো, যাদের সঙ্গে তোমার ঠিক বনে না। এমন এক রেস্তোরাঁয় তুমি যাও, যেখানে তোমার খুবই বাজে একটা সময় কাটে। অথবা ধরো সেই কম্পিউটার স্ক্রিনটার কথা, ‘সামাজিক’ হওয়ার ছুতোয় তুমি যেটার মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকো। এই সব মানুষ, এই সব জায়গা কিংবা এই সব বস্তুর পেছনে তোমার সময় আর শক্তি খরচ করা বন্ধ করো। সেই জায়গাটায় যাও, সেই মানুষগুলোর সঙ্গে মেশো, সেই কাজটাই করো, যা তোমাকে সত্যিকার অর্থেই উৎফুল্ল করে। দেখবে শান্তি পাবে। কারণ যে কাজ, যে মানুষ বা যে জায়গার সঙ্গে তোমাকে মানায় না, সেসব তুমি বর্জন করতে পেরেছ! তুমি কে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা কঠিন। বরং খোঁজো, তুমি কে নও! (সংক্ষেপিত)

 

সূত্র: টাইম সাময়িকী

 

ইংরেজি থেকে অনুবাদ:

 

মো. সাইফুল্লাহ