হকচরিতামৃত

95

কবি মুজিব ইরম আমাদের বিলেতের কবিকূলের এক মনছোঁয়া সংবেদন অঙ্কনের কবি। বিলেতবাসী এই কবি রচনা করেন নিয়তই বাংলার মানুষের মননামৃত। কবি সৈয়দ শামসুল হক বাঙালির স্বজন। অসুস্থ হয়ে লন্ডনের হাসপাতালে। বিলেতের গাছগাছালি শীতের পর সবুজ পাতায়  পল্লবিত হচ্ছে। কবিও আবার পল্লবিত হবেন।এই তৃঞ্চা বুকে নিয়ে মুজিব ইরমের অমৃত শৈলী।বিলেতবাংলার পাঠকের জন্যে. . . .।

 

মুজিব ইরম

প্রতিদিনের মতোই রোদ ওঠা এই সকাল বেলায় পার্কে হাঁটতে বের হই, আর দেখতে থাকি চারপাশের ম্যাগনোলিয়া ফুলগুলো ফুটে আছে কী আশ্চর্য আনন্দে! বৃষ্টি ভেজা গাছগুলো নিয়ত নতুন, মনানন্দে দেখি, চোখানন্দে দেখি, যেন এই প্রথম দেখা, যেন আর দেখিনি আগে কখনও কোথাও কোনোদিন! তারা বড়ো আশ্চর্য ফুল, আশ্চর্য ফুলগাছ! পাতার আগে ফুল আসে। শুভ্রসাদা-গোলাপি-লাল ম্যাগনোলিয়া ফুটে থাকে, যেন গাছগুলো ফুটে থাকে। কী বড় বড় গাছ, অথচ গাছ দেখি না, ডাল দেখি না, দেহ দেখি না, দেখি শুধু আশ্চর্য ফুল, ফুলের গৌরব। আর প্রিয়জন, কবি, মাহবুব আজীজ, আপনি ঠিক সেই মুহুর্তে ইনবকক্সে লিখেন: হক ভাইর ক্যান্সার হয়েছে, এই ম্যাগনোলিয়া ফুলের দেশে চিকিৎসাধীন আছেন, পরানের গহীন ভিতর থেকে কিছু একটা  লিখুন, হক ভাইকে নিয়ে লিখুন, যা আসে মনে।

 

আমি রোডোডেন্ড্রন ফুলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকি, আমার পা নড়ে না, মন নড়ে না, জানা খবরটিকেই আমার অজানা মনে হয়। আবারও আমি অস্বীকার করতে চাই। না, হতেই পারে না। হক ভাইর ক্যান্সার! হতেই পারে না। যার দৃঢ় কণ্ঠে সুমেশ্বরী কলকল করে, যে টানটান উচ্চতা নিয়ে হক ভাই বাংলা সাহিত্য শাসন করেন, জিন্স পরা, চেইন পরা চির তরুণ যে হক ভাই কবিবংশের পৌরোহিত্য করেন, তার কোনো অসুখ হতেই পারে না।

 

এই বৃষ্টি ভেজা উজ্জ্বল সকাল বেলা, এই ম্যাগনোলিয়া ফুলের গৌরব, রোডোডেড্রন ফোটা রোদের বাগান নিমেষেই নাই হয়ে যায়। করোটির ভিতর ফুটে ওঠে স্মৃতি। আমি বেগানা গাছের নিচে বসে পড়ি। আমার পাশেই বসে পড়ে প্রাচীন গির্জা ও কবর। আর মাথার ভিতর ভিড় করে দেশ, জেগে ওঠে কবিতা, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা। মনে আছে, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা বের হলে, সেই কলেজ জীবনে, সিলেট থেকে ঢাকা এসেছিলাম শুধুমাত্র বইটি সংগ্রহ করতে। কোনো এক গ্রীষ্মের চান্দি ফাটা মধ্য দুপুরে ঘামে ভেজা আমি বাংলা বাজারে হাজির হয়েছিলাম। নসাস থেকে কিনেছিলাম বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা। অভুক্ত, ঘর্মাক্ত এই আমি রেলের কামরায় বসে বারবার পড়ছিলাম, আর দেখতে পাচ্ছিলাম জিওল মাছের স্রোত, বৈশাখের প্রথম ডাকে কেমন হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ছে জিওল শব্দেরা, উজানের স্রোতে বেঁহুশ সব উজাইয়ের মাছ। আহা কবিতা, আহা বৈশাখের ডাকে ঘর ছাড়া রঙ্গিন শব্দেরা, নয়া পানির উজাইয়ের মাছ! পড়ি, ভাবি, আর বেদনা বাড়াই, খায়েস বাড়াই, যদি লিখতে পারতাম, যদি পারতাম, কোনো এক দিন, এরকম এক বই, দীর্ঘ কবিতার বই, মাছের মিছিল! আহা!

 

…তবু আমি বারবার সাধবো কবিতা।

গ্রীষ্মের চাতালে, শীতরাত্রির পাথারে,

বিপন্ন বর্ষায়, প্রতি বসন্ত বিভ্রমে,

বিপুল শহরে আমি হেঁটে যাবো

শব্দের প্রদীপ হাতে অক্লান্ত, নিয়ত।

আবার মৃত্যুকে নেবো, আবার জীবন।…

আবার উঠবো জেগে খরচৈত্রে চর

হয়ে তোমার পদ্মায়। পিঙ্গল জটায়

স্রোতের প্রপাত নিয়ে হেঁটে যাবো আমি-

স্মৃতির সাগরে। জন্মে জন্মে বারবার

কবি হয়ে ফিরে আসবো আমি বারবার।

 

এই সকালবেলায়, পরবাসে, আবারও আমি উচ্চারণ করি বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা, উচ্চারণ করি ‘কবি হয়ে ফিরে আসবো আমি বারবার’। আর মখমল ঘাসের মাঠে চোখ রাখি। কী সবুজ, কী শান্ত নীরবতা! অথচ এই কয় দিন আগেও শীতে ও বরফে গাছগুলো কী কংকাল হয়েছিলো। পাতাহীন, পুষ্পহীন ছিলো। শীত গেলো আর পাতা ও ফুলে ভরে উঠলো চারপাশ। মাটি ফুঁড়ে বের হলো ড্যাফোডিল, বের হলো জীবনের রং। আর এখন তো চারপাশে পাতার চেয়ে ফুল বেশি। ফুলের চেয়ে জীবন। চারপাশে রোদ ওঠা দিন, চারপাশে ফুলের মৌসুম। দেখি আর মনে হয়, হক ভাইর কিচ্ছু হয়নি, কিচ্ছু হয়নি। কবির কোনো অসুখ হয় না, হতে পারে না!

 

হক ভাইর সাথে খুব যে একটা দেখা সাক্ষাৎ হয়, বা হয়েছে, তা না, তবে করোটির ভিতর হক ভাই সব সময় এক জীবন্ত নাম, কী স্মৃতিতে, কী কবিতায়, কী গদ্যে! সেই ৯৯-এর এক বিমর্ষ সকালে যে দিন দেশ ছাড়া হই, প্রিয় হক ভাই, আপনার কাব্যনাটক সংগ্রহ, উপন্যাস সংগ্রহ, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা, পরানের গহীন ভিতর, কবিতাসংগ্রহ এই অধমের সঙ্গি হয়েছিলো। আপনার এসব আউট বই পড়ে পড়েই কি না আপনার সাথে সাথে থেকেছি। বন্ধুরা যখন আপনার সাথে আড্ডায় মশগুল, আমি তখন শীতের দেশে শীত হয়ে আপনার রচিত আউট বই পড়ি, পরানের গহীন ভিতর, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা পড়ি, আপনার ঈর্ষা পড়ি, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের সারাজীবন পড়ি, আর মনে পড়ে মেস জীবনের সেই টানাটানির দিনগুলোতে খাবারের পয়সা বাঁচিয়ে এক শীত ওঠা সন্ধ্যায় নিউ মার্কেট থেকে কিনে এনেছিলাম আপনার কাব্যনাটক সংগ্রহ। আহা, এক জীবনে কী করে সম্ভব এত এত কালজয়ী রচনা লিখে যাওয়া! আপনার আত্মজীবনী, গল্পের কলকব্জা, মার্জিনে মন্তব্য, আর এতসব কবিতা-গল্প-উপন্যাস! আহা জীবন, প্রণীত জীবন!

 

হক ভাই, আপনি আমাদের বংশের গৌরব, কবিবংশের উজ্জ্বল বাতি, সব্যসাচী, অর্জুন, ধনুর্বিদ্যাবিদ। কিছুতেই আপনার কোনো রোগ হতে পারে না। আপনি লালনের সমান বয়সী হতে চেয়েছেন। অবশ্যই হবেন। অবশ্যই আপনি, প্রিয় হক ভাই, আমাদের বংশপ্রধান, কুলপতি, কুলাচার্য, অচিরেই নিরোগ টান টান দেহ নিয়ে, সুদৃঢ় কণ্ঠ নিয়ে ঢাকা ফিরবেন। আপনি তো নিজ পরিচিতিতেই লিখেন- বসবাস: ঢাকা-লন্ডন। আপনি লন্ডনে আছেন, সাময়িক বসবাস করছেন, হসপিটাল-ডাক্তারের কুশলাদি জিজ্ঞেস করছেন, আর করোটির ভিতর জমা করছেন সুমেশ্বরীর নতুন গল্প, নতুন কবিতা, নতুন উপন্যাস। এই ম্যাগনোলিয়া ফুল, এই রোডোডেড্রন ফুলের ঝোপ, এই টিউলিপ ফুলের বাগান, এই পাতাবাহার, ক্যামেলিয়া, গোলাপ, আর চারপাশের নাম জানা না-জানা শত সহস্র ফুল, ফুলের শয্যা, লেকের পাড়ে ঝুলে থাকা উইলো বৃক্ষের ডাল, রেশমি লতা, শতবর্ষী গাছ, প্রাচীন গির্জা, শ্যাওলা ধরা এপিটাফ, জলে ভাসা হাঁস, আমাকে বলছে আপনার কোনো রোগ হয় নি, হক ভাই, হতে পারে না। অবশ্যই না। আপনি তো বড় বাজিকর, জীবন ও শব্দের বাজিকর: ‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর/যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর’। আপনি খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠুন, হক ভাই, খুব তাড়াতাড়ি! আপনার করোটিতে জন্ম নেওয়া নতুন শব্দেরা প্রাণ পাক। আপনার কলমে তারা অনুদিত হোক। আমরা আপনার অপেক্ষায় আছি। জীবন বড়ো মায়াময়। জীবন বড়ো শিল্পময়। শুভ কামনা।

 

 

সংযোজন: প্রিয় হক ভাই, আপনার ‘প্রণীত জীবন’, হকচরিতামৃত পড়ছি আবারও। আপনি লিখেছেন: ‘আমি আমার ভাগ্যনক্ষত্রকে ধন্যবাদ দিই প্রতিনিয়ত যে, শরীর যখন দ্রুত জীর্ণ হচ্ছে প্রতিপলে, ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার যখন ক্রমেই হয়ে আসছে অবনত ও খিন্ন, তখনো আমি নতুন থেকে নতুনতর বিষয় প্রতিদিন পাচ্ছি করোটির ভেতরে, কলমে তারা অনূদিত হবার জন্যে আমাকে তাড়া দিচ্ছে বিষম এবং আমি নিয়তই হিমসিম খাচ্ছি কোনটি ফেলে কোনটিকে আগে সময় দেব। এর তুল্য পরিস্থিতি বোধহয় আরব্য রজনীর সেসব বাদশাহের যাঁদের হারেমে অগণিত কন্যা, কাকে ফেলে কার সঙ্গে আজ রাতে শয্যায় যাবেন তিনি! শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহকেও তাঁর ঘোর পতিত অবস্থায় এবং দারুণ বার্ধকেও এই আতান্তরে পড়তে হয় বলে আমরা তার সভাসদ হাকিম আহসানউল্লাহর রোজনামচা বরাতে জানি; জীবন প্রায় সাঙ্গ করে আনা এই বয়সেও আমি যেন তাঁরই মতো, প্রথম দিনের এক কবি-যুবকের মতো মহাগুচ্ছ ভাবনার সম্মুখে এখনো বেসামাল হয়ে পড়ি শিল্পে তাদের অনুবাদ করে নেবার প্রায় জৈবিক তাড়নায়। বাহাদুর শাহের একটি গজলের চরণ ঈষৎ বদলে নিলে কথাটা তবে দাঁড়ায়- এত পুষ্পের ঠাঁই কী করে দেবো এতটুকু এই বাগানে?’ হক ভাই, আপনার জয় হোক, শত পুষ্পের ঠাঁই হোক বাগানে, আপনার কলমে।