সাইকেলে ইশকুলে

113

মো. সাইফুল্লাহ

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাদের বাহন সাইকেলস্কুলের নাম শহীদ জমির উদ্দিন গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ। দিনাজপুর সদর উপজেলার পূর্ব রামনগরের এই বিদ্যালয়ে আমরা যখন পা রেখেছি, তখন ভরদুপুর। এলাকাবাসীর মুখে আগেই শুনেছি, দূর-দূরান্ত থেকে স্কুলের অধিকাংশ ছাত্রী সাইকেলে চড়ে পড়তে আসে। বিকেলে মেয়েদের ছুটির পর লাইন ধরে সাইকেলগুলো যখন এলাকার রাস্তা দিয়ে যায়, সেটাও একটা দেখার মতো দৃশ্য।

১০ মে মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকেই দ্বিচক্রযানগুলোর দেখা পাওয়া গেল। স্কুলমাঠের এক পাশে তিনটা ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ছাত্রীদের সাইকেল রাখার জন্য। সেখানে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে দুই চাকার বাহনগুলো। সাইকেল কীভাবে এখানকার ছাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠল? প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. আবদুল হামিদের কাছে। বলছিলেন, ‘এলাকায় মেয়েদের স্কুল আর নাই। তাই অনেক দূর থেকেও মেয়েরা পড়তে আসে। বেশির ভাগ মেয়ে খুব দরিদ্র পরিবারের। সাইকেলে আসা ওদের জন্য সহজ। আমরাও সাইকেলে আসতেই উৎসাহিত করি। কারণ, একসঙ্গে দলবেঁধে এলে নিরাপত্তা নিয়ে ভয় থাকে না।’

ভয় তো নয়ই, বরং স্কুলড্রেস পরলেই নাকি ছাত্রীদের মনে একটা অন্য রকম সাহস ভর করে। সপ্তম শ্রেণির বিউটি রায় বলছিল, ‘ড্রেস দেখলেই আমাদের সবাই চিনে!’ বোঝা গেল, সবুজ-সাদা স্কুল ইউনিফর্মটা তাদের কাছে গর্বেরও।

স্কুল ছ​ুটির পর এভাবে সাইকেল নিয়ে বের হতে দেখা যায় l ছবি: মোহাম্মদ অালীসপ্তম শ্রেণির দীপিকা রায়, ইশরাত জাহান, ষষ্ঠ শ্রেণির রওশন নাহার—সবাই আসে সাইকেলে চড়ে। ওদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। কেউ বাবার কাছে, কেউবা ভাইয়ের কাছে সাইকেল চালানো শিখেছে। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী রিয়া পারভিন তৃতীয় শ্রেণিতে থেকেই সে সাইকেল চালাতে জানে। ওদিকে সদর উপজেলার মাধবপুরের মেয়ে জুলেখা আক্তার স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পুরস্কার হিসেবেই বাবার কাছ থেকে সাইকেল পেয়েছে। সাইকেল প্রসঙ্গে এত কথা হচ্ছে শুনে একজন আগ বাড়িয়ে বলে, ‘আমি দুই হাত ছেড়ে সাইকেল চালাতে পারি।’ সঙ্গে সঙ্গে হাত উঠে গেল আরও দু-চারটা, ‘আমিও পারি! আমিও পারি!’

বিকেল চারটায় স্কুল ছুটির পর ছাত্রীরা যখন বিদায় নিচ্ছে, দেখা গেল সবার সঙ্গে একটা করে ছোট্ট টিফিন ক্যারিয়ার। কারণটা ব্যাখ্যা করলেন স্কুলের এক শিক্ষক, ‘আমাদের এখানে নিয়ম করা আছে, প্রত্যেককে বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসতে হবে। গুড়, চিড়া, মুড়ি—যা-ই হোক না কেন। কারণ, টিফিন না আনলে ওরা বাইরে থেকে খাবার খাবে। সে জন্য বাড়ি থেকে টাকা আনতে হবে। দুই দিন টাকা দিলে তৃতীয় দিন দেখা যাবে বাড়িতে বলে বসবে, “আর স্কুলে যাওয়ার দরকার নাই।” এই ভয়েও এমন নিয়ম।’

সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে টিফিন বক্সটা বেঁধে নিয়ে এগোচ্ছিল এক ছাত্রী। জানতে চাইলাম, ‘আজকে কী টিফিন এনেছিলে?’ হেসে উত্তর দিল, ‘ভাত’। ‘ভাতের সঙ্গে কী?’ হাসির দৈর্ঘ্য আরও বড় করে সে বলে ‘আর কিছু না। শুধু ভাত।’ বন্ধুরা ততক্ষণে এগিয়ে গেছে। জোরে প্যাডেল ঘুরিয়ে সে বাকিদের সঙ্গে যোগ দেয়।