পঙ্কজ গুপ্তকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলেন রাগীব আলী

117

সিলেট টুডে অনলাইন পোর্টাল  সম্প্রতি ডা. পঙ্কজগুপ্ত এর একটি সাক্ষাতকার নেয়। পাঠকদের জন্য সংগ্রহ করে প্রকাশ করা হলো।

. . . . . . . . .

 

:একুশ তাপাদার:

 

শিল্পপতি রাগীব আলীর দখল থেকে রোববার (১৫ মে) উদ্ধার করা হয়েছে তারাপুর চা বাগান। উদ্ধারের পর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার এই ভূ-সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে। দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া শেষে দখলদারের কাছ থেকে বাগান উদ্ধার করতে পেরে উচ্ছ্বসিত পঙ্কজ গুপ্ত।

 

রোববার  উদ্ধার প্রক্রিয়া শেষে সিলেটটুডে’র মুখোমুখি হয়েছিলেন পঙ্কজ গুপ্ত। তাঁর সাথে কথা বলেছেন একুশ তাপাদার।

 

 

সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম: অনেক দিন পর বাগান ফিরে পেলেন। এনিয়ে আপনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানতে চাইব?

পঙ্কজ কুমার গুপ্ত: এটি একটি ঐতিহাসিক দিন, ঐতিহাসিক ঘটনা পুরো সিলেটের জন্যই। জালিয়াতি করে রাগীব আলি বাগানটা নিয়ে গিয়েছিল। আমি তারপর দেশ ছাড়তে বাধ্য হই পারিপার্শ্বিক কারণে। এতসব ঘটনার পর সব ফিরে পাওয়া, আদালতের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

 

সিলেটটুডে: কোন সালের ঘটনা?

পঙ্কজ: এটা ১৯৮৮ সালের ঘটনা।

 

সিলেটটুডে: আপনি তখন কি করতেন? কীভাবে দখলের ব্যাপারটি ঘটল?

পঙ্কজ:  আমি তখন সিলেট মেডিকেল কলেজের ডাক্তার ছিলাম। ইংল্যান্ডে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার জন্য ইংল্যান্ড যাওয়ার আগে রাগীব আলীকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে পাওয়ার অফ এটর্নি দিয়ে যাই।

 

সিলেটটুডে:  কিসের ভিত্তিতে এটা দিয়েছিলেন?

পঙ্কজ:  তাঁর সাথে এগ্রিমেন্ট (চুক্তি)  ছিল যে আমার বিদেশ থাকাকালীন সময়ে সে এটা দেখাশোনা করবে কিন্তু আমি ফিরে আসার পর আবার আমি সব বুঝে নেব।

 

সিলেটটুডে: তারপর…?

পঙ্কজ : ১৯৯০ সালে আমি যখন ফিরে আসি তখন সে এসব চুক্তির কথা অস্বীকার করে বলে সে সরকারের কাছ থেকে বাগানের লিজ এনেছে। তখন সে আমাকে বলে, “এখন আর এখানে কি করবেন আপনি চলে যান দেশ ছেড়ে।” তখন আমি বলি, আমি এই দেশের মানুষ, জন্মভূমি ছেড়ে আমি কেন যাব? তারপর সিলেটে থাকতে না পেরে আমি আমার শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ডাক্তারি প্র্যাকটিস শুরু করি।

 

সিলেটটুডে: কোথায় সেটা?

পঙ্কজ: ফেনিতে। ওখানে আমার শ্বশুর বাড়ি।

 

সিলেটটুডে: এটা ৯০ সালের পরে…?

পঙ্কজ: হ্যাঁ। ৯০ সালেই,আমার স্ত্রীও ডাক্তার। আমরা দুজনেই ওখানে প্র্যাকটিস করতাম। তারপর সিলেটে আসতাম মাঝেমধ্যেই। কিন্তু রাগীব আলী আমাকে বিভিন্নভাবে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এমনকি তখন  এনএসআই, সিআইডি ইত্যাদি বাহিনী দিয়েও শায়েস্তা করার কথা বলে। তখন এরশাদের শেষ সময় ছিল। দেশে তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। এরশাদের সময়ই মূলত রাগীব আলি সমস্ত দখলবাজি করেছিল। এই সময়েই তাঁর উত্থান হয়।

 

এরপর আমি চাকরি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে চলে যাই। ওখানে ক’বছর চাকরি করে আবার ফিরে আসি। এরপর কিছুদিন মামাবাড়ি কলকাতায়ও ছিলাম। তারপর আমি আবার ফেনিতে ফিরে আসি।

 

সিলেটটুডে: এরপর তো দেশে গণতন্ত্র ফিরল। বিএনপি ক্ষমতায় এল, ৯৬ সালে ক্ষমতায় এল আওয়ামীলীগ। আপনি কি তখন এসব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তখন?

পঙ্কজ : হ্যাঁ, অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে জালিয়াতি করে এরশাদের কাছ থেকে এমনভাবে লিজ নিয়েছিল যে খুব বেশি কিছু আগাতে পারিনি।

 

সিলেটটুডে: মামলা-টামলা তো তখন হয়নি?

পঙ্কজ: না মামলা তো হল ২০০৫ সালে

 

সিলেটটুডে: আপনি কীভাবে চেষ্টা করছিলেন?

পঙ্কজ: আমি তখন মিনিস্ট্রিতে তাঁর বিরুদ্ধে লিখেছিলাম। ভূমি মন্ত্রণালয়ে। যে সে এটা জালিয়াতি করেছে, আমি তখন সব কাগজপত্র দিয়েছিলাম। কিন্তু রাগীব আলী সরকারি কর্মকর্তাদের বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে সব ধামাচাপা দেয়। তারপরও ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে সব আড়ালে পড়ে যায়। ২০০৫ সালে মামলা হলেও তা স্টে করে রাখা হয়। মূলত ২০০৮ সালে গিয়েই এটা নাড়াচাড়া শুরু হয়।

 

সিলেটটুডে: এখন তো উদ্ধার হল। আপনার পরিকল্পনা কি?

পঙ্কজ:  এখন ত বাগান চালু রাখতে হবে। বাগান তো বন্ধ রাখা যায় না।

 

সিলেটটুডে: বাগান চালু রাখার সব ব্যবস্থা আছে তো?

পঙ্কজ: না সে মেশিন টেশিন সব খুলে নিয়ে গেছে। আবার মেশিন কিনতে হবে, এসব অনেক খরচের ব্যাপার।

 

সিলেটটুডে: এখন কি সেটআপ চেঞ্জ করবেন?

পঙ্কজ: আমি দেখব আগে। বাগানের স্টাফ কোয়ার্টার সব ধ্বংস করে তো হোস্টেল করে ফেলছে। এসব ঠিক করতে হবে নিজের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন বাগান চালু রাখাই মূল ফোকাস। আমার কাছে একটা টাকাও নাই। বাগানের সব একাউন্ট তার (রাগীব আলী) কাছে।  সপ্তাহ শেষে যেন শ্রমিকরা উপোষ না থাকে এটাই এখন মূল চিন্তা। কাল (সোমবার) জেলা প্রশাসকের সাথে এসব ব্যাপারে আলাপ হবে। আপাতত সিলেট শহরে থেকেই সব পরিচালনা করার কথা ভাবছি।

 

সিলেটটুডে: এই এলাকায় তো মেডিকেল কলেজের মত স্থাপনাও আছে।

পঙ্কজ: এসব সরানোর জন্য ৬ মাস সময় আছে। এসব ডিসির ব্যাপার। উনারা বাকি সব উদ্ধার করে এনে দেবেন।

 

সিলেটটুডে: আপনার পরিবারে কথা কিছু বলুন।

পঙ্কজ: আমরা বড় তিন ভাই ছিলেন, বোন ছিলেন। বাবা -মা সবাই। মুক্তিযুদ্ধে সকলে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হন। আমি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই।

 

সিলেটটুডে: কীভাবে বাঁচলেন?

পঙ্কজ: আমি মরতে পারতাম। তবে ঐ সময় কৌশলে মরার ভান করে শুয়েছিলাম। বিভীষিকাময় সেসব দিন।

 

সিলেটটুডে: এখন কি কোন নিরাপত্তার অভাব আছে? কোন শঙ্কা?

পঙ্কজ: অন্যায়কারী সবসময়ই অনিষ্ট করার চেষ্টা করবে, তবে আপাতত ভালোই আছি।

 

সিলেটটুডে: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেয়ার জন্য।

পঙ্কজ: আপনাদের অনলাইনকেও ধন্যবাদ।