পাকা ধান তলিয়ে যায় হাওরে: শ্রমিক পাওয়া যায় না

121

শামস  শামীম

হাওরে শ্রমমূল্য হিসেবে ধানের ভাগ নিয়ে যারা ধান কাটে তাদেরকে ভাগালু ডাকেন গৃহস্থরা। অনেকের কাছে ধান কাটা শ্রমিকরা বেফারি হিসেবেও পরিচিত। ধানভান্ডার হিসেবে খ্যাত সুনামগঞ্জ জেলার হাওর এলাকায় বৈশাখ শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভাগালু বা বেফারিরা নৌকায় করে এসে জড়ো হতেন। দল বেধে আসতেন তারা। গৃহস্তরা তাদের স্থান দিতেন বাংলো ঘরে। যাবার সময় গৃহস্তরা তাদেরকে ধান কাটার ভাগ দিয়েও উপহার হিসেবে ‘খাসি’ ‘ষাড়’ দিতেন। সেটা সাজিয়ে নৌকায় করে ধানের সঙ্গে গান-বাদ্যের মাধ্যমে বাড়ি ফিরতের বেফারিরা। সেই দৃশ্য গত দেড়যুগ ধরে অনুপস্থিত সুনামগঞ্জের হাওরে। এখন প্রতি বছর শ্রমিকের অভাবে শ্রমঘামে ফলানো সোনার ধান পাহাড়ি ঢলে, শিলায় ও জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায়। এবারও শ্রমিকরা না আসায় হাওরের কৃষকদের আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে। বোরো ফসলের মোট যে ক্ষতি হয়েছে তার অর্ধেক শ্রমিক সংকটের কারণে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে গত ২২ এপ্রিল দেখার হাওরের ৩০০ কোটি টাকার ফসলের মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ফসল ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। এর আগে শনির হাওরের প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সময়ে শ্রমিক পাওয়া গেলে ক্ষতি কিছুটা কমতো বলে তারা জানান।

 

হাওর এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নব্বই দশকের শেষ সময় পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বোরোধান কাটার মওসুমে শ্রমিকরা দল বেধে আসতেন। কুমিল্লা, ফরিদপুর, নরসিংদী, নোয়াখালি, জামালপুর, বরিশাল, বগুরা, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে চৈত্র মাসের শেষ দিকে আসতেন তারা। ধান কাটার ভাগ নিয়ে গৃহস্তদের সাথে দরদাম করতেন। সঙ্গে নিয়ে আসতেন মাটির তৈজসপত্র এবং নানা ধরনের সব্জি। দলের সবাই হাওরে ধান কাটতে বের হলে যিনি রান্না বান্না করতের তিনি হাওরে খাবার দিয়ে এসে গ্রামে গ্রামে এসব বিক্রি করতেন ধানের বিনিময়ে। রাত হলে ফিরে ভাগালুরা আনন্দ আসরে মাততেন। দলের অনেকে বিভক্ত হয়ে ধান মাড়াই শেষ করে ভাগের ধান নিয়ে আসতো। এভাবে সকাল হলে আবার হাওরে ধান কাটতে ছুটতো ভাগালুর দল। তাদের উপস্থিতিতে হাওরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করতো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গানও এই অঞ্চলে গাইতেন তারা। এতে সাংস্কৃতিক বিনিময়ও ঘটতো বলে গবেষকরা জানান।

 

হাওর গবেষকরা জানান, বাংলাদেশের আর্তসামাজিক উন্নতির ফলে এখন দেশের বিভিন্ন স্থানেই উন্নয়ন অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। গড়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চল। ফলে শ্রমিকরা এখন আর ধান কাটার মওসুমে হাওরে মৌসুমী শ্রম দিতে আসেন না। তারা নিজ নিজ এলাকায়ই বিকল্প কর্মকসংস্থান বেছে নেওয়ায় মৌসুমী এই শ্রমের সময় আসার আগ্রহ ফুরিয়েছে। তাছাড়া হাওরাঞ্চলের নদ-নদী গুলো ভরাট হয়ে যাওয়া যাতায়াত ব্যবস্থা বিঘিœত হওয়ার কারণেও বেফারিরা না আসার কারণ বলে অনেকের মত।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে প্রতি বছর পাহাড়ি ঢল ও শিলাবৃষ্টিতে হাওরের বোরো ফসলের যে ক্ষতি হয় তার বেশির ভাগই হয় শ্রমিক সংকটের কারণে। শ্রমিকরা না আসায় দিনদিন ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। চলতি মওসুমে বৈশাখের শুরুতেই আধাপাকা বোরো ধান পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শিলায়ও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শ্রমিক থাকলে প্রাকৃতিক এই দুর্যোগেও ক্ষতি কমিয়ে আনা যেতো বলে কৃষকরা জানান।

 

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে এ পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলে, শিলাবৃষ্টিতে প্রায় ৫শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বেসরকারি হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ ১৫শ কোটি টাকার উপরে। সংশ্লিষ্টদের মতে ক্ষতির অর্ধেকটা হয়েছে কেবল শ্রমিক সংকটের কারণে। মওসুমের শুরুতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের বিভিন্ন শাখা বিজ্ঞপ্তি প্রচার, মাইকিং করে কৃষকদের ধান কাটার পরামর্শ দিলেও শ্রমিকের কারণে আধাপাকা ধান গোলায় তোলতে পারেননি তারা। সময়ে শ্রমিক পাওয়া গেলে কিছু ফসল বাচানো সম্ভব হতো বলে কৃষকরা জানান।

 

তাহিরপুরের শনির হাওরপাড়ের কৃষক বাবরুল হাসান বলেন, দশ দিন আগে পাহাড়ি ঢলে বাধ ভেঙ্গে পুরো শনির হাওরের ৯৫ ভাগ তলিয়ে গেছে। উচু এলাকার জমি ডুবতে দুইদিন লাগে। কিন্তু শ্রমিকের অভাবে উচু শ্রেণির সেই জমির ধানও কাটতে পারিনি আমরা। এভাবে বিদেশের ভাগালুরা না আসায় প্রতি বছর কৃষকের ক্ষতি বাড়ছে। তিনি হাওরের ধান কাটার উপযোগী মেশিন তৈরির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

 

দেখার হাওরপাড়ের কিষাণী নেকজান বিবি বলেন, ‘আগের দিন ভাগালুরা আইতো দলে দলে। দিনে ধান কাটতো, রাতে ঘুমাইবার আগ পর্যন্ত ডেগ-ডেকচি বাজিয়ে গান গাইতো। খুব ফুর্তি করতো তারা। নৌকা ভর্তি ধান দিয়ে সরদারের গলায় মালা পরিয়ে গৃহস্তরা তাদের বিদায় দিতো। আমরা খুশি হয়ে তাদেরকে ভাগের চেয়েও কিছু বেশি ধান বিদায়ের সময় দিতাম। এতে তারা খুশি অইতো। এখন আর কোন ভাগালু হাওরে আসেনা। আমরা ধান হিলে, পাইন্যে নেয়।

 

জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তাদীর আহমদ বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেফারিরা এসে হাওরে ধান কাটতো। দল বেধে আসতেন তারা। সঙ্গে নিয়ে আসতেন বিক্রির জন্য নানা উপকরণ। যাবার সময় নৌকা ভরে ধানের ভাগসহ গৃহস্তরা তাদেরকে উপহার হিসেবে খাসি ষাড় দিতেন। আগামী বছর ফেরার ওয়াদা করে তারা যেতেন। হাওরের নদ-নদী ভরাট হয়ে যাওয়াসহ আর্ত সামাজিক উন্নতির ফলে তারা এই অঞ্চলে আসার আগ্রহ দেখাননা। অনুন্নত এলাকা উন্নয়নের ফলে সেখানকার শ্রমিকরা এই অঞ্চলের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও কৃষি নির্ভর সম্ভাবনাময় এই এলাকার অবস্থা আরো নিম্নের দিকে। ভেঙ্গে পড়ছে হাওরের কৃষি অর্থনীতি।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহেদুল হক বলেন, এক সময় সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিকরা আসতেন। গত দেড় দশক ধরে তারা আর আসছেনা। এখন প্রতি বছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের শ্রমিকের অভাবে ক্ষেতে ফসল নষ্ট হয়। এবারও ক্ষতির প্রায় অর্ধেক শ্রমিক সংকটের কারণে নষ্ট হয়েছে।