হোম অফিসের নিষ্ঠুরতা : তিন বছরে এক লাখ বিদেশি শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিল: মানবাধিকার কনভেনশন ত্যাগ করতে চান থেরেসা মে

106

লন্ডন, ২৫ এপ্রিল : প্রথমে কলেজ বন্ধ করে দেয়া হলো, এরপর টয়েক পরীক্ষায় অনিয়মের নামে হাজার হাজার স্টুডেন্টের ভিসা বাতিল করা হলো। তারপর শুরু হলো নানা অজুহাতে স্টুডেন্টদের ভিসার মেয়াদ কমিয়ে দেওয়া। ব্রিটেনে পড়তে আসা বিদেশী শিক্ষার্থীদের প্রতি একের পর এক এমনই নিষ্ঠুর আচরণ করেছে হোম অফিস। হোম অফিসের এমন আচরণ কেবল হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ধ্বংসই করেনি, আর্থিকভাবে তাদের নিঃস্ব করেছে।

গত শনিবার (২৩ এপ্রিল) হোম অফিসের প্রকাশিত এক পরীসংখ্যানে দেখা যায়, গত তিন বছরে প্রায় এক লাখ বিদেশি শিক্ষার্থীর ভিসার মেয়াদ কর্তন (কার্টেইল) করেছে যুক্তরাজ্য। এমন তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্রিটেনের আচরণ নিয়ে নতুন করে হইচই শুরু হয়েছে।

অনিয়ম কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে ভিসার মেয়াদ কমিয়ে দেয়াকে বলা হয়েছে ভিসা কারটেইলমেন্ট বা ভিসার মেয়াদ কর্তন। ভিসার মেয়াদ কর্তনের কারণে অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীকে কোর্স শেষ না করেই ব্রিটেন ছাড়তে হয়েছে। ভূক্তভোগী এসব শিক্ষার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীও রয়েছে।

আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে হোম অফিস ইচ্ছামাফিক বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে। এর আগে ইংরেজি দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রায় ৪৬ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটে। বাংলদেশি বংশোদ্ভূত এক শিক্ষার্থীর মামলায় আদালত গত মাসে হোম অফিসের সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে। ওই ঘটনা বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি যুক্তরাজ্যের আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন বিন্দুমাত্র নমণীয় নন হোম সেক্রেটারি থেরেসা মে। গত সোমবার (২৫ এপ্রিল) বিবিসির একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ব্রিটেনকে যে কোনোভাবে হোক ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মানবাধিকার বিষয়ক কনভেনশন থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মানবাধিকার কনভেনশনের কারণে অভিবাসন বিষয়ে যথেষ্ট কঠোর হওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন। তিনি বলেন, আগামী ২৩ জুন অনুষ্ঠেয় ইইউ বিষয়ক গণভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন-ব্রিটেনকে ইউরোপিয় ইউনিয়নের মানবাধিকার বিষয়ক কনভেনশন থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

অবশ্য বিরোধী দল লেবার পার্টি থেরেসা মের এমন বক্তবের তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, মানবাধিকার রক্ষায় ব্রিটেনের ৬৮ বছরের ঐতিহ্যকে তোয়াক্কা না করে রক্ষণশীল দলের প্রধান হওয়া স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ নিয়ে কাজ করছেন থেরেসা মে। হোম সেক্রেটারির বক্তব্যকে তিনি মুক্ত ভাবনা ও সহনশীলতাবিরোধী বলে মন্তব্য করেন।

স্টুডেন্ট ভিসার মেয়াদ কমিয়ে দেয়ার বিষয়ে হোম অফিস দাবি করছে, অভিবাসন আইনের অপব্যবহার বন্ধে ওইসব শিক্ষার্থীদের ভিসার মেয়াদ কর্তন করা হয়েছে। যাতে তারা দ্রুত যুক্তরাজ্য ছেড়ে যায়। তবে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এমন ব্যখাকে নাকচ করে দিয়ে সমালোচকরা বলছেন, অভিবাসন কমিয়ে আনতে ক্ষমতাসীণ রক্ষণশীল দলের বেঁধে দেয়া লক্ষ্য পূরণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছে।

তথ্য অধিকার আইনের অধীনে বিবিসির করা অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসার মেয়ার কর্তনের তথ্য প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত গত তিন বছরে মোট ৯৯ হাজার ৬শ ৩৫জন শিক্ষার্থীর ভিসার মেয়াদ কাটছাট করা হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৩ সালে ৩৩ হাজার ২শ ১০, ২০১৪ সালে ৩৪ হাজার ২শ ১০ এবং ২০১৫ সালে ৩২ হাজার ২শ ১৫ জন শিক্ষার্থীর ভিসার মেয়াদ কর্তন করা হয়।

এছাড়া, গত তিন বছরে দেশটির ৪১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদনও (স্পন্সরশিপ লাইসেন্স) বাতিল করা হয়। এর ফলে ওইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার বিদেশি শিক্ষার্থীকে নিজ দেশে ফেরত আসতে হয়েছে কিংবা নতুন করে অর্থ খরচ করে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হয়েছে।

হোম অফিস বলছে, ভিসার মেয়াদ কর্তন কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ৬০ কর্মদিবসের সময় বেঁধে দেয়া হয়, যাতে তারা ওই সময়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় যুক্তরাজ্য ত্যাগ করে অথবা নতুন করে ভিসার জন্য আবেদন করে। এটি করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিতাড়নে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

‘ইউকে কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স’ (ইউকেসিআইএসএ) এর প্রধান নির্বাহী ডমিনিক স্টক বিবিসিকে বলেন, ‘প্রকাশিত তথ্য থেকে মনে হচ্ছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নিষ্ঠুরতা আমাদের অনুমানের চাইতেও মারাত্মক।’জাতীয় ছাত্র জোটের (ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টস) মোস্তফা রাজাই বলেন, ‘প্রকাশিত তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। তারা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকারের তোয়াক্কা করছে না। গত ছয় বছর যাবত বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি যে আচরণ চলছে তাতে উচ্চ শিক্ষার গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাজ্য আকর্ষণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে।’