আমি শেখ হাসিনারও শুভানুধ্যায়ী : জাফরুল্লাহ চৌধুরী

57

 

 

 ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পের পতিকৃত,ঔষধনীতি প্রণয়নে স্বাধীন বাংলাদেশে অসামান্য অবদান রাখেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়  বিলেত থেকে রণাঙ্গনে ছুটে যান। যুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণসহ রণাঙ্গনে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও  শরার্থীদের চিকিতসা কাজে ছিলেন নিরবিচ্ছিন্ন কর্মী ও যোদ্ধা। দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত তাঁর সাক্ষাতকার বিলেতবাংলার পাঠকদের জন্যে তুলে ধরা হলো। -সম্পাদক

 

 জাফরুল্লাহ চৌধুরীগণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর, চট্টগ্রামের রাউজানে। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে লন্ডন ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। গেরিলা প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে ডা. এম এ মবিন ও জাফরুল্লাহ চৌধুরী আগরতলার মেলাঘরে ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। যুদ্ধ শেষে এই হাসপাতালটিকেই তাঁরা প্রথমে কুমিল্লা ও পরে ঢাকায় স্থানান্তর করেন, যা আজ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৮ সালে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ফিলিপাইন থেকে ম্যাগসাইসাই এবং সুইডেন থেকে বিকল্প নোবেল রাইট লাভলিহুড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক ‘স্বাস্থ্য হিরো’ এবং মানবতার সেবার জন্য কানাডা থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট পেয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

প্রথম আলো: আপনি স্বাধীন চিন্তার মানুষ, নাকি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা?

 

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: দেশের কল্যাণে জনগণের স্বার্থে আমি চিন্তা করতে ভালোবাসি। খোলা মনে আমার বক্তব্য প্রকাশ করি। আমি বিএনপি, সিপিবি, বাসদ খালেকুজ্জামান, মাহমুদুর রহমান মান্না, ড. কামাল হোসেন, আ স ম রব, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর যেমন, তেমনি শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগেরও শুভানুধ্যায়ী। আমি বিশ্বাস করি, দেশে একটি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সাহসী বিরোধী দল থাকা দরকার। আর জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন শুধু রাজনীতিকেরাই আনতে পারেন।

প্রথম আলো: আপনি সব সময় আওয়ামী লীগের বিরোধী আর পিকিংপন্থী বামদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমি একক দল বাকশালের বিরোধিতা করেছি। ভালো কাজের জন্য তাদের লিখিতভাবে প্রশংসা করেছি। আমি নিজেকে সমাজতন্ত্রী ভাবি। যখন মেনন ও মতিয়ারা একত্র ছিলেন, তখন আমি ছাত্র ইউনিয়ন করেছি। আমি ছাত্রজীবনের পরে আর রাজনীতি করিনি।

প্রথম আলো: জিয়ার সামরিক শাসনের বিরোধী ছিলেন? সেনানিবাসে দল না করলেই কি তাঁর চলত না?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: এভাবে তুলনা করা যাবে না। জিয়া চক্রান্ত করে ক্ষমতা নেননি, আবার গণতান্ত্রিক পথে তাঁর অভ্যুদয় ঘটেনি। দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়েছিল। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল না থাকায় সেটা ছিল একটা স্বাভাবিক পরিণতি।

প্রথম আলো: চলমান সংকট থেকে উতরাতে শুধু একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারই সমাধান?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: তা নয়। এ জন্য এমনভাবে নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে, যেটি আজ্ঞাবহ হবে না। নির্বাচন কমিশনাররা নির্দলীয় ও সাহসী হবেন এবং বিবেক দ্বারা পরিচালিত হবেন। পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো যে সরকারি বা বিরোধী কোনো দলের অনুগত নয়, সেই উপলব্ধি আনতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে। শেখ হাসিনাকে নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী রাখতে হলে বিএনপিকে নিয়ে মন্ত্রিসভা করার পুরোনো প্রস্তাব টেবিলে নতুন করে আনতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপিকে তার গণতন্ত্রায়ণ চালাতে হবে। বেগম জিয়া নিয়মিত দলের মধ্যে আলোচনা করবেন, বিশেষ করে তরুণদের বক্তব্য শুনবেন।

প্রথম আলো: সেই ফর্মুলা বিএনপি নেয়নি। আপনি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কটের ভুল পরামর্শ দিলে এখন কী পরামর্শ দেবেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: সেটা ভুল ছিল না। ২১ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে আমি বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাতে বললাম। একই সঙ্গে তাঁকে জাতির উদ্দেশে ২২ নভেম্বরে ভাষণ দিতে বলেছিলাম। তিনি তা দিলেন ২৯ ডিসেম্বরে। আমি নির্বাচন প্রতিহত করতে পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু দুই নেত্রীর টেলিফোন সংলাপের পরে আমি লাল টেলিফোনে বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করতে উৎসাহিত করেছিলাম। তিনি আমার সামনে একবার ফোনটা তুলতে উদ্যতও হয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, কাল করব। আমি বলেছিলাম, কাল আর হবে না। চাটুকারেরা তাঁকে নিবৃত্ত করেছিলেন।

প্রথম আলো: আপনার পরামর্শ এখনো প্রযোজ্য কি?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: অবশ্যই প্রযোজ্য। আমি বিশ্বাস করি যে বেগম জিয়া যদি ফোন করেন, তাহলে অবস্থাটা বদলে যেতে পারে। আগে সম্ভাবনা বেশি ছিল, আমি তখন তাঁকে বলেছিলাম তাঁকে ফোন করে বলুন, ‘এটা কেমন দাওয়াত দিলেন, মেনু না বলেন, সময়টা তো বলবেন! নাকি, আমার নিমন্ত্রণে আমার বাড়িতেই চলে আসবেন?’

প্রথম আলো: আমাদের রাজনীতিতে অনৈক্যের মধ্যে মিল কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: দুই নেত্রীই অতিথিপরায়ণ ও অমায়িক। তাঁদের মানবিক গুণাবলি আছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাঁরা উভয়ে কাছাকাছি থাকা লোকদের দ্বারা প্রভাবিত হন।

প্রথম আলো: বিরোধীদলীয় নেতা রওশনেরও কাছাকাছি এসেছিলেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: হ্যাঁ। ঝগড়াপুর নামে একটি বই বের করার পর বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাসায় এক মধ্যাহ্নভোজে নিমন্ত্রিত হই। সেদিনই রওশন আমাদের নিজে রান্না করে খাইয়েছেন। সেদিন এরশাদ সাহেব আমাকে বলেছিলেন, ভাই, আমরা তো পাকিস্তানে থেকেও মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিলাম। পরে জেনারেল ওসমানী কয়েকবার নিজেই আমাকে বলেছিলেন, এরশাদ স্বাধীনতার সপক্ষে তাঁর কাছে চিঠি লিখেছিলেন। খালেদা জিয়াকে বাহাত্তর থেকেই জানি, নয় মাস তিনি ক্যান্টনমেন্টে আর শেখ হাসিনা (তাঁর মাসহ) ধানমন্ডিতে একটি বাড়িতে, আমাদের বাসার কাছেই গৃহবন্দী ছিলেন।

প্রথম আলো: বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে আপনি কীভাবে, কতটা জানেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: বঙ্গবন্ধু ও জিয়া উভয়ের পরিবারকে আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি। শেখ কামাল জেনারেল ওসমানীর এডিসি ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে যে সামরিক বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল, তাতে আমি তাঁদের সঙ্গে ছিলাম। শেখ হাসিনা ইডেন কলেজের নির্বাচনে আমার ছোট বোন আলেয়াকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে আমার বোন ছাড়া ছাত্র ইউনিয়নের সব প্রার্থী জয়লাভ করেছিলেন। ১৫ আগস্টের আগের দিন আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছিলাম। ১৪ আগস্ট সকাল নয়টার দিকে বঙ্গবন্ধু আমাকে সাভার থেকে গণভবনে ডেকে এনে বাকশালে যোগ দিতে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাকশাল সমাজতান্ত্রিক দল। এতে সবাই থাকতে হবে। আমি বলেছিলাম, মুজিব ভাই, আপনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। আপনি পুঁজিবাদের পক্ষে অতীতে সব মিটিংয়ে বক্তব্য রেখেছেন। পুঁজিবাদ দিয়ে দেশবাসীর বহু মঙ্গল করা যায়। যেমন হয়েছে ব্রিটেনে ও ইউরোপে। গণভবন ও সচিবালয়ে আগে বহুবার লাঠি বিস্কুট খেয়েছি। ষাটের দশক থেকে মুজিব ভাইকে জানি। জিয়ার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭১ সালের মের প্রথম সপ্তাহে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আমাকে ডেকেছিলেন। ১০ মিনিটের আলোচনা দুই ঘণ্টায় গড়িয়েছিল। আমি তাঁকে বলেছিলাম, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে বঙ্গবন্ধু যে গভর্নর-ব্যবস্থা চালু করেছিলেন তা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল। আর ভুলটা ছিল বাকশাল সৃষ্টি। শেখ হাসিনার ভালো গুণ হলো তাঁর সঙ্গে তর্ক করা যায়।

প্রথম আলো: তার মানে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক ভিন্নমত পছন্দ করেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: অন্তত আমার সঙ্গে করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে আমার কাছে উপদেশ চাইলেন। আমি প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী চিন্তা গ্রহণ করে বাংলাদেশকে বিভাগে নয়, কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করুন। তিনি উত্তরে বললেন, তা হলে বিভক্তি আসবে। আমি বললাম, সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা তো পার্বত্য প্রদেশের। তারা সত্বর উপলব্ধি করবে বার্মিজদের থেকে বাঙালি বা চাটগাঁইয়ারা অনেক গুণ ভালো। বিভাগ সৃষ্টিতে কেবল আমলাতন্ত্রের সুবিধা হয়। জনগণের কোনো লাভ হয় না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের মঙ্গল চান।

আমি মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের বিষয়টি শেখ হাসিনাকে বলি। বাকশাল নিয়ে আলোচনার দিনেই বিলেতে শিক্ষারত আমার অসুস্থ স্ত্রীর কথা শুনে মুজিব ভাই তাৎক্ষণিকভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়ে আমার বিলেত-যাত্রার অনাপত্তিপত্র আনিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দেশে ফিরে আমার সঙ্গে বাকশালে থাকতে হবে। জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর কী দরকার। বললাম, হিথরো বিমানবন্দর থেকে লন্ডন শহরে পৌঁছাতে আমার ১০ পাউন্ড দরকার হবে। বঙ্গবন্ধু খুবই সারল্যভরা প্রশ্ন করলেন, পাউন্ড কে দেয়? হেসে বলি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে থাকে। অমনি তিনি ফোনে ১০ পাউন্ড আনিয়ে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। তিনি চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন, তাঁর মহানুভবতা ছিল সুবিদিত। শেখ হাসিনাকে বললাম, সেই ঋণ আমি আজও শোধ করতে পারিনি। ১৫ আগস্টের দুপুরে আমি লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্টে অপেক্ষমাণ ব্রিটিশ প্রেসের কাছে মন্তব্য করেছিলাম, তিনি নিজের রক্ত দিয়ে জাতির ঋণ পরিশোধ করে গেলেন। আর চোখে নেমেছিল অশ্রুধারা। মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বেই হয়েছিল।

প্রথম আলো: দুই প্রধান দলের মধ্যে একটা ন্যূনতম সমঝোতা এই জাতির জন্য মুখ্য বিষয় নয় কি? দুই নেত্রীকে আপনি এই লক্ষ্যে কি কখনো কোনো নির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছিলেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: অবশ্যই মুখ্য, এটা হতেই হবে। সে কারণে আমি শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম, মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে তর্ক করে আমি আজও বেঁচে আছি। আপনার সঙ্গে তর্ক করে আমি ফিরে যেতে পারব তো? তিনি বললেন, এটা কী বলেন? আমি বললাম, আপনি এমন কিছু করবেন না, যাতে এই ছবিটা কেউ নামিয়ে ফেলে। তিনি বললেন, কী করতে হবে? সেক্রেটারিয়েটে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে তাঁর মাথার ওপরে শেখ মুজিবের ছবি ছিল। আমি সেদিকে নির্দেশ করে বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডানে মাওলানা ভাসানীকে বসিয়ে দিন। আর বঙ্গবন্ধুর পায়ের নিচে জেনারেল ওসমানী ও জিয়াকে বসিয়ে দিন। এই চারটি ছবি একসঙ্গে থাকলে আর তা কখনো নামবে না। তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা কী বলেন ভাই?’

প্রথম আলো: শেখ হাসিনার সঙ্গে ওই বৈঠকে আপনি কি ‘পায়ের নিচে’ শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: বঙ্গবন্ধুর পায়ের নিচেই বলেছি। বলেছিলাম, ওসমানীর কোনো দল নেই। তবে বিএনপি আছে। কিন্তু জিয়া থাকবে বঙ্গবন্ধুর পায়ের নিচে। আর এতেই জাতীয় ঐক্যটা আসবে। শান্তি, সম্প্রীতি ও ঐক্যের জন্য এটা আজকের প্রেক্ষাপটেও ভীষণ দরকারি। এখন আমরা যার মধ্য দিয়ে চলছি, তা থেকে বেরোতেও এটা সহায়ক, অন্তত আমি তা-ই বিশ্বাস করি।

প্রথম আলো: ওসমানীর রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থিতার বিষয়ে কোনো মন্তব্য?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমি তা সমর্থন করেছিলাম, তাঁর পক্ষে প্রচারে নেমেছিলাম।

প্রথম আলো: শেখ হাসিনাকে বলা ছবি-বিষয়ক ওই সব কথা বেগম জিয়াকে কখনো বলেছিলেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমি খালেদা জিয়াকে বলেছি। এতটা বিস্তারিত নয়। তবে আমার মনে হয়েছে জিয়াকে বঙ্গবন্ধু ও মাওলানা ভাসানীর পায়ের নিচে রাখতে বিএনপির খুব আপত্তি হবে না। এটা আমার বিশ্বাস।

প্রথম আলো: কীভাবে পায়ের নিচে বা মাথার ওপরে রাখবে? বিএনপির অনেকে কথায় কথায় জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর সমান, এমনকি চাটুকারেরা সেই মাত্রাও ছাড়িয়ে জিয়াকে আরও বড় করে তোলে। তারেক রহমান বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সেদিনও কটূক্তি করেছেন।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: তারেকের সেটা করা সমীচীন হয়নি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর কটু বক্তব্যের জন্য তারেক মাফ চেয়ে নিতে পারেন। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের মনঃক্ষুণ্ণের কারণ নেই। এটা তো সত্যি যে ওসমানী, তাজউদ্দীনের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে মুজিব ভাই ৩২ নম্বর ধানমন্ডি বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সে রাত্রিতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়েছিলেন। শেখ মুজিবের তো জানা ছিল জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে জন্য তো মুজিব ভাই জিয়াকে ভর্ৎসনা করেননি। বরং তাঁকে বীর উত্তম খেতাব দিয়েছেন। উপসেনাপ্রধানও করেন। বঙ্গবন্ধুর যে মহানুভবতা ছিল, তারই অনুসরণ আজ বড় প্রয়োজন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কয়েক দিন পরেই আমার সঙ্গে শেখ হাসিনার দীর্ঘ সময় কথা হয়। তিনি তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে গণবিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ প্রদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

প্রথম আলো: ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় বেগম জিয়া ও তারেক ব্যক্তিগতভাবে জড়িত নয় কি? অনেকের মতে, ক্ষমতার রাজনীতি বাদেও এই ঘটনার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে স্তব্ধ করতে উদ্যমী হয়েছেন। আপনি কীভাবে দেখেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: তাঁর বর্তমান শাসনে তার একটা প্রভাব তো থাকতেই পারে। ওই জঘন্য হামলা বিএনপি সরকারের একটা ব্যর্থতা ছিল। কিন্তু দুজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে যতটা জানি, তাতে আমার মন বিশ্বাস করতে চায় না যে তাঁরা এ বিষয়ে জড়িত থাকতে পারেন।

প্রথম আলো: আপনি নিশ্চিত? আর যদি প্রভাব থাকে, তাহলে সেটা দূর করতে রাজনৈতিক উদ্যোগ কোথায়?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমি তদন্ত করিনি। আমি আমার আস্থার জায়গা থেকে বলতে পারি। কে বা কারা করেছে, সেটা বের করতে পারলে খুব ভালো হয়, যাতে সতর্ক থাকা যায়। তবে মধ্যযুগীয় কায়দায় তোমার ভাই আমার বাবাকে মেরেছিল, সেটা চিরকাল মনে রাখব—এমন অবস্থান যথাযথ নয়, এ থেকে উত্তরণে একটা পথ খোঁজা দরকার। সেই সঙ্গে একটাÿক্ষমার জায়গাও লাগবে। ক্ষমা ছাড়া এটা সমাধান হবে না।

প্রথম আলো: পাকিস্তান বা তার গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত থাকতে পারে?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: সেটা হলেও হতে পারে। এই আশঙ্কা আমার আছে।

প্রথম আলো: তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ কী? তাঁর দেশে ফেরা?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: তাঁর ভবিষ্যৎ বিএনপির ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত তারেককে দেশে ফিরতে দেওয়া, এতে তিনি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।

প্রথম আলো: আরাফাতের মৃত্যুর পরে শোক জানাতে শেখ হাসিনা যখন যান, তখন আপনি সেখানে ছিলেন।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমি ছিলাম, কিন্তু সেদিন আমি চিকিৎসক হিসেবে গিয়েছিলাম। আমার পকেটে ডায়াজিপাম ট্যাবলেট ছিল, হাতে ছিল ব্লাডপ্রেশারের যন্ত্র। আমার কামনা ছিল বেগম জিয়া যেন প্রধানমন্ত্রীকে সাক্ষাৎ দেন, সেদিনও চাটুকারেরা জয়ী হয়েছিল। পরে আমি তাঁকে বলেছি, আপনার দেখা করাই উচিত ছিল। আর তখন প্রধানমন্ত্রীকে আপনি বলতে পারতেন, আপনি তারেককে দেশে আসতে দিন। আর তারেক দেশে এলে আরাফাতের জানাজায় জনতার আরও বেশি ঢল নামত, যদিও শেখ হাসিনার পক্ষে আপনার কথা রাখা সম্ভব হতো না। কিন্তু পত্রিকায় সে খবর ছাপা হলে আপনি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতেন। শুনে তিনি রাগত স্বরে বলেছিলেন, ‘আপনি পাগল হয়েছেন?’

প্রথম আলো: আপনি বেগম জিয়ার সঙ্গে মোট কতবার সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেয়েছেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: প্রায় আট-দশবার হবে।

প্রথম আলো: আপনি কি নির্দিষ্ট করে একটি পরামর্শের কথা বলতে পারেন, যেটি বিএনপি নেত্রী রক্ষা করেছেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: (হাসি) তিনি আমার পরামর্শ নিলে তাঁর ভালোই হতো। আমি সব সময় তাঁকে বলি, আপনারা ক্ষমতায় আসবেন কিন্তু তাতে জনগণের কী লাভ হবে, কোথায় কী সংস্কার করবেন, তা পরিষ্কার করে তো বলছেন না। প্রবাসী সরকারের নেতাদেরসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে বলেছিলাম, তিনি কিন্তু বিএনপির কাউন্সিলে শেখ মুজিবের নাম উল্লেখ করেছেন। প্রাদেশিক সরকারের কথা বলেছি, সে সম্পর্কে তিনি পরিষ্কারভাবে কাউন্সিল, জাতীয় কমিটি ও স্থায়ী কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেননি। সালমান এফ রহমানের প্ররোচনায় তাঁর একটি ছোট ভুলে, ওষুধ কোম্পানিগুলো হরির লুট করছে, তারা ক্রমাগত ওষুধের মূল্য বাড়াচ্ছে। আর তাতে ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতির বরখেলাপ ঘটছে। আওয়ামী লীগ তা শুধরে নিতেও চাইছে না। ওষুধের ঊর্ধ্বমান মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধের লক্ষ্যে খালেদা জিয়ার এ সম্পর্কে পরিষ্কার বক্তব্য দেওয়া উচিত।

প্রথম আলো: আপনি বেগম জিয়াকে কখনো কি বলেছেন যে ১৫ আগস্টে জন্মদিন পালনের ব্রত ত্যাগ করাই উত্তম?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: না, বলিনি। অধিকাংশ বাঙালি মুসলমানদের জন্মতারিখ নেই। তবে গত আগস্টে একটু ভিন্নভাবে পালন করেছেন, সেটাকে আমি একটি অগ্রগতি হিসেবে দেখি।

প্রথম আলো: সরকারের সমালোচক হিসেবে মন্ত্রিসভার মূল্যায়ন করবেন কি?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিতে অবসরে যাওয়া উচিত। ইনু ও মেননকে আর দরকার নেই। তাঁদেরই উচিত সরে দাঁড়ানো। মতিয়া চৌধুরীর কাজের প্রশংসা করি কিন্তু তাঁর সহনশীলতার অভাব আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল পুলিশ বাগে রাখতে না পারলেও খুবই সফল বলব। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিম তো প্রমাণ করেছেন যে চিকিৎসক স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের চেয়ে তিনি ভালো কাজে অনেক এগিয়ে আছেন। আর জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের আগেই ইস্তফা দেওয়া উচিত ছিল। তাঁরা সরকারে থেকে দল পচিয়েছেন।

প্রথম আলো: বিএনপি ক্ষমতায় গেলে মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হবেন? এরশাদ ও জিয়ার প্রস্তাব তো পেয়েছিলেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: বিএনপি আমাকে কেন তা করতে যাবে? দলে আমার ভূমিকা কী? তবে আদৌ কখনো প্রস্তাব পেলে আমার শর্ত থাকবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, পুলিশি আচার-আচরণে ব্যাপক পরিবর্তনের; পূর্ববর্তী সব দুর্নীতির বিচার এবং ‘বিভাগ’ বাতিল করে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক প্রাদেশিক সরকার গঠন এবং সব সরকারি কর্মকর্তা বিচারক/বিচারপতিদের প্রতিবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করা। এতে জনস্বার্থ রক্ষা ও সমাজতন্ত্রের বিধান প্রতিষ্ঠার শর্ত পূরণ হবে।

জিয়া আমাকে মন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন, আমার মায়ের কাছে লোক পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি শফিউল আজমদের মতো কতিপয় স্বাধীনতাবিরোধীদের ভিড়িয়েছিলেন বলে আমি তাঁকে চার পৃষ্ঠার একটা চিঠি দিয়েছিলাম। আলাপকালে বঙ্গভবনে আমাকে জিয়া বলেছিলেন, আপনাকে ব্লাংক চেক দেব। আমি বলেছি, যারা ব্লাংক চেক দেয়, তাদের ব্যাংকে টাকা থাকে না।

প্রথম আলো: তাহলেও আপনার নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কারণ, শফিউল আজমদের জন্য আপনি জিয়ার মন্ত্রিসভায় যাননি আর নিজামী-মুজাহিদদের মন্ত্রী করেছেন বেগম জিয়া। প্রতিবাদ করেছেন? চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে পতাকা ওড়ানো নিয়ে বেগম জিয়ার কাছ থেকে কি একই ব্যাখ্যা পেয়েছিলেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: কোনো ব্যাখ্যা পাইনি। তবে তাদের (স্বাধীনতাবিরোধী) সঙ্গে আমার কখনো কোনো যোগাযোগ ঘটেনি। মনে রাখবেন, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে বিনা বিচারে আমার ফাঁসি চেয়ে পোস্টার দিয়েছিল। আমার সদস্য বাতিল করেছিল আমি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম বলে।

প্রথম আলো: জামায়াতকে নিয়ে সরকার করায় আপনি অসন্তুষ্ট, এ কথা বেগম জিয়াকে না বলার মানে আপনি অপ্রিয় সত্য উচ্চারণে ভীরু?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আপনাকে এটা ভুললে চলবে না যে বেগম জিয়া যখন প্রথম সরকার গঠন করেন, তখন আমি কঠিন খারাপ অবস্থার মধ্যে ছিলাম। এরশাদের স্বাস্থ্যনীতি করেছিলাম বলে বিএমএ আমার ফাঁসি চেয়েছে। তারা এমনকি ডা. মিলন হত্যায় আমাকে অভিযুক্ত করেছিল। সেই ওষুধনীতির কারণে আমাদের ওষুধ তৈরির সামর্থ্য বেড়েছে। এখন ৯০ শতাংশ ওষুধই দেশে তৈরি হচ্ছে। আর সেই ওষুধনীতির ৪০ শতাংশ এখনো কার্যকর আছে। আপনারা তো জানেন, আমি এরশাদের মন্ত্রী হইনি, আমার পরামর্শে তিনি ডা. আজিজুর রহমানকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করেছিলেন। তাঁর অবদান ও চেষ্টায় অধ্যাপক এস আই জি মান্নান, জেনারেল এম আর চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং আমি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ১৯৯০ তৈরি করেছিলাম, যা সংসদে পাস হয়েছিল। অত্যন্ত অন্যায়ভাবে প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দীন তা বাতিল করেছিলেন, এতে দেশের ভয়ানক ক্ষতি হয়েছে।

প্রথম আলো: তাহলে বেগম জিয়ার চলতি জামায়াত-নির্ভরতাকে কেন পাকিস্তানি যোগসূত্রের দায় হিসেবে দেখা হবে না। বিএনপির পাকিস্তান কানেকশন নাকচ করেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমি সম্পূর্ণরূপে নাকচ করি। তবে বিএনপি কেন তাঁদের মন্ত্রী করেছিল, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে। এরশাদের বিদায়ের পরে আশা করেছিলাম, মেননরা আওয়ামী লীগের পিছু ছেড়ে বিএনপির পাশে আসবেন। কিন্তু তাঁরা সুবিধাবাদী, ভেবেছিলেন আওয়ামী লীগ জিতবে।

প্রথম আলো: জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে বিএনপির ক্ষতি কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আওয়ামী লীগ তার সুযোগ নিতে পারে। ক্ষুদ্র দল হলেও রাজনীতিতে তাদের একটা জায়গা থাকে। ভোটের হিসাবে জাপা ও জাসদকে আওয়ামী লীগের দরকার নেই, কিন্তু তাদের সরকারে রাখার দরকার পড়ে। একই ধরনের হিসাবনিকাশ থেকে জামায়াতকে বিএনপির দরকার।

প্রথম আলো: তাহলে জামায়াত টিকে থাকবে? আপনি যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডে সন্তুষ্ট?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছি। দলের কতিপয় জ্যেষ্ঠ নেতার ভুল সিদ্ধান্ত ও অমানবিক কার্যকলাপের জন্য জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে আরও ক্ষতির আশঙ্কা আছে। আবার এও ঠিক, জামায়াতের উচিত হবে তাদের একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া। জামায়াতের বর্তমান নবীন নেতারা তো বিনা দ্বিধায় বলতে পারেন, আওয়ামী লীগের বয়োজ্যেষ্ঠ কিছু নেতা যেমন পাকিস্তান চাইতেন, গোলাম আযম প্রমুখরা তেমনি পাকিস্তানের সমর্থন করে ভুল করেছেন। আমি আশা করি তাঁদের পরবর্তী নবীন নেতারা কোনো রকম দ্বিধা না করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইবেন, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতন্ত্র, সমতা ও ন্যায়বিচারে পূর্ণ বিশ্বাসী হবেন। তাঁরা নিয়মিতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের কবর জিয়ারত করবেন।

প্রথম আলো: অনেকের আশঙ্কা বেগম জিয়াকে সাজা দিয়ে তাঁকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সরানো হবে।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আওয়ামী লীগ যেদিকে যাচ্ছে, তাতে তাদের লাভ হবে না। এটা বেগম জিয়াকে একা নয়, শেখ হাসিনাকেও বুঝতে হবে। উভয়কে সহাবস্থানের নীতি মানতে হবে।

প্রথম আলো: পরের নির্বাচন কবে?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: ২০১৭-২০১৮ সালের মধ্যে দিলে ভালো। আশা করব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুদ্ধিমতী হবেন। কারণ, তাতে তাঁর মধ্যমেয়াদি নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথাটাও রাখা হবে। প্রদেশ করার ভাবনাটও জরুরি। কারণ, তাতে স্থিতি ও ভারসাম্য তৈরি হবে। কোনো প্রদেশে বামেরাও জিতবে। দুটোয় বিএনপি, ছয়টায় আওয়ামী লীগ জিতুক না, তাতে কী।

প্রথম আলো: ‘হাসিনামুক্ত’ নির্বাচন থেকে বেগম জিয়া সরে আসবেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: তার থেকেও বড় কথা ইসির পুনর্গঠন লাগবে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বেচ্ছায় নির্বাচনকালে কিছু ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। পুলিশ-আর্মির নিয়ন্ত্রণ তখন তাঁর হাতে থাকবে না। দৈনন্দিন কাজ ছাড়া আর কিছু করতে পারবেন না। মন্ত্রিসভায় বিএনপির যোগদান নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।

প্রথম আলো: বর্তমান সরকারের সব থেকে বড় সাফল্য কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: তাদের সব থেকে বড় সাফল্য সমুদ্রসীমাসংক্রান্ত মামলায় জয়লাভ করা। আর সব থেকে বড় ব্যর্থতা হলো সর্বত্র দুর্নীতির বিস্তার ঘটানো। কুইক রেন্টাল তার অন্যতম উদাহরণ। আর সার্বিক বিচারে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সব রাজনৈতিক দলকে বোকা বানিয়েছেন।

প্রথম আলো: এই মুহূর্তের চাওয়া কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: জাতীয় ঐক্য, দুর্নীতি হ্রাস ও জনগণের প্রকৃত ভোটে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। সাধারণ মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে যে বড়লোকের গণতন্ত্র, তা টিকবে না। মাথা উঁচু করতে হলে বিচার বিভাগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংস্কারে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। এশিয়ার বৃহত্তম হাসপাতাল সৃষ্টি কেন্দ্রিকতার উদাহরণ, এটা আজকের দিনে অচল। এতে চমক আছে, কিছু চিকিৎসকের রাজধানীতে পাকা আসন হবে কিন্তু গণস্বাস্থ্য সেবার উন্নতি হবে না।

আর সামরিক বাহিনীর মতো পোশাক খাতসহ শ্রমিকদের রেশন দিতে হবে সামরিক বাহিনীর দরে। তাহলে আমাদের উৎপাদনশীলতা বেড়ে যাবে, যেখানে আমরা ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে পিছিয়ে আছি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক চাই। আবার একই সঙ্গে সতর্কতাও চাই।

প্রথম আলো: আপনি চিন্তায় সমাজতন্ত্রী, মিত্ররা সব দক্ষিণপন্থী।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমাকে ঠেস দিয়ে লাভ নেই, বাস্তববাদী, দক্ষিণপন্থী সরকারগুলোকে দিয়ে আমি দেশের জন্য কিছু ভালো কাজ করিয়ে নিতে চেষ্টা করেছি। এপ্রিল-মে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছিল। এসব মিটিংয়ের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বিচারপতি আবু সাইয়িদ চৌধুরী ও জেনারেল এম এ জি ওসমানী। বঙ্গবন্ধু ঠিক সকাল নয়টায় অফিসে আসতেন। তিনি জানতে চাইতেন বিলেতের শাসনব্যবস্থা। বিকেন্দ্রীকৃত সেবাব্যবস্থা, জনপ্রতিনিধিমূলক কাউন্টি শাসনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। আমি তাঁকে জানিয়েছিলাম বহুজাতিক কোম্পানির আকাশচুম্বী লাভ ও দুর্নীতির কথা। এ দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে ওষুধ আমদানিতে। আর একটি তথ্য দেব। আজকে যে আমাদের ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ দেখছেন, সেই নামটি বঙ্গবন্ধুর দেওয়া। যুদ্ধকালীন ফিল্ড হাসপাতালের কথা মনে রেখে তিনি এই নামকরণ করেছিলেন। সহায়তা দিয়েছিলেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের জন্য প্রায় ৫০ বিঘা জমি সরকারিভাবে দিয়েছিলেন। ১ মে ১৯৭৭ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. লায়লা পারভীন বানু ও সন্ধ্যা রায়ের নেতৃত্বে ৪০ নারী কর্মী ৪০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে শহীদ মিনারে পৌঁছানোর খবর জিয়া বিটিভিতে দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং ঢাকা পুলিশে মহিলাদের নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন। দেশের প্রথম দুই নারী পুলিশ—হোসনে আরা ও চামেলী বেগম কিন্তু গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মী ছিলেন।

এরশাদ সাহেবকে রাজি করিয়ে আমি পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিকনেতা আবুল বাশারকে পাঠিয়েছিলাম সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক আন্দোলনের পর্যবেক্ষণের জন্য। আমার পরামর্শে তিনি পোস্টার, বিলবোর্ড সব বাংলায় লিখিয়েছিলেন। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা, উপজেলাব্যবস্থা ও সফল জাতীয় ওষুধনীতি চালু করেছিলেন, জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁর সরকারের পতন হয়েছিল। ডাক্তারদের আন্দোলনে একটি জনকল্যাণমূলক নীতি কবরস্থ হয়েছিল।

আবু সাইয়িদ চৌধুরীকে আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম বিলেতে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের পক্ষে পাসপোর্ট ইস্যু করে বিলেতের এক লাখ বাঙালির কাছ থেকে ১০ লাখ পাউন্ড চাঁদা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। একইভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে বুঝিয়েছিলাম, পাসপোর্ট প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। তাই পাসপোর্টের সহজ প্রাপ্যতা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে। উনি এক সপ্তাহে জরুরি পাসপোর্ট এবং এক মাসের মধ্যে সাধারণ আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট সরবরাহ নিশ্চিত করেছিলেন। উপমহাদেশের অন্য কোনো রাষ্ট্রে এত দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া যায় না।

১৯৮০ সালে জিয়ার গড়া প্রথম জাতীয় মহিলা উন্নয়ন কমিটির দুই পুরুষ সদস্যের আমি অন্যতম ছিলাম, আর এই কমিটিই প্রাথমিকে ৫০ শতাংশ মহিলা শিক্ষক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ছাত্রী নেওয়ার সুযোগ করেছিল, যা কার্যকর হয়েছিল এরশাদ আমলে। আমি বিটিভিতে একবার বলেছিলাম, সমাজতন্ত্রের আদর্শ ছাড়া কাটা খালে পানি আসবে না। জিয়াকে দিয়ে আমি ধূমপান নিষিদ্ধ করাতে পারিনি। তিনি হাস্যোচ্ছলে বলতেন, আপনার কমিউনিস্ট বন্ধুরাই ধূমপান ও মদপান করেন বেশি।

প্রথম আলো: মির্জা ফখরুল বৈধতার একটি সিল পেলেন, তিনি এখন ভারমুক্ত হয়েছেন, এটা কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলো?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: না। কাউন্সিলের মাধ্যমে উন্মুক্ত সভায় নির্বাচিত হলে তিনি যে শক্তি পেতেন, সেটার অর্জন থেকে এখন তিনি বঞ্চিত হলেন। ফলে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

প্রথম আলো: অসাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমি এক অসাধারণ ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশে বড় হয়েছি। মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আমার পৈতৃক ও মাতুলালয় ঘিরে সহাবস্থান করছেন। আমার বাবা পালি অধ্যয়ন করেছেন। তাঁর শিক্ষক ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেন, বাবা বিখ্যাত কবি নবীন চন্দ্র সেনের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেছিলেন। ব্রিটিশ যুগের বিপ্লবী দস্তিদার পরিবারের সদস্যরা আমাদের বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন।

প্রথম আলো: আইএস, আল-কায়েদা ও জঙ্গিবাদ সম্পর্কে কী বলবেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: পুলিশ তার কর্তব্য পালন করছে না বলেই দেশে আজ এসব নৈরাজ্য চলছে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: ধন্যবাদ।