শুভ জন্মদিন স্যার ফজলে হাসান আবেদ

77

গোলাম সারওয়ার

 

ফজলে হাসান আবেদ নিভৃতচারী, আত্মমুখীন, প্রচারবিমুখ ও মিতবাক এক কর্মবীর। তিনি নিজেকে ছায়াময় অচেনায় কিছুটা আড়ালে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সম্ভবত আত্মপ্রচারে অনীহার কারণেই গণমাধ্যমের সঙ্গে তার যোগাযোগও ‘নিবিড়’ নয়। আমরা অবশ্য এর বিপরীত চিত্রটি দেখতেই অভ্যস্ত। আজ তিনি ৮১-তে পা দেবেন।

দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০০৯ সালে ব্রিটেনের রানী তাকে ‘নাইটহুড’ খেতাব দিয়েছেন। তাই তিনি এখন ‘স্যার’ ফজলে হাসান আবেদ। তার এই সম্মানে আমরা গর্বিত, সন্দেহ নেই। তবে বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি মানুষের অশেষ ভালোবাসার যে গৌরবময় আসনে সমাসীন হয়েছেন, তার মূল্য অন্য যে কোনো স্বীকৃতির চেয়েও অধিক। ব্যাংক, আড়ং-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রাণপুরুষ ফজলে হাসান আবেদ সম্প্রতি একটি হোটেলে আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় তার অভ্যাসসুলভ মৃদুলয়ের এক বক্তৃতায় তার স্বপ্নের কথা বলছিলেন।

অনুষ্ঠানটিতে নানা পেশার বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন। তাদের সামনে তিনি দারিদ্র্য জয়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও তরুণদের পাশে ব্র্যাক কীভাবে দাঁড়িয়েছে তার অতিসংক্ষিপ্ত একটি চিত্র তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে টেলিফোনে মানি ট্রান্সফার ‘বিকাশ’-এর অনন্যসাধারণ ভূমিকার কথাও বলেন।

‘হাঁসের দল জলের বুকে সাঁতার কেটে বেড়ায়। শুভ্র সাদা বক মৌনী অবস্থান নিয়ে মাছের আশায় বসে থাকে। নদীর পাড়ে পাড়ে ছোট ছোট পল্লী। নদীর বিরামহীন জলধারার মতোই সেই পল্লীতে নিরন্তর বয়ে চলে মানুষের জীবনধারা।’ রবীন্দ্রনাথের ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি’র মতোই শাল্লা-দিরাইয়ের গ্রাম। ১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শাল্লা-দিরাইতে ব্র্যাকের জন্ম। এখানেই তার কর্মক্ষেত্রের সূচনা। ভাটি অঞ্চলের এই নিভৃত গ্রামের একটি স্থিরচিত্র তুলে ধরা হয়েছে ‘ব্র্যাক :উন্নয়নের একটি উপাখ্যান’ শীর্ষক গ্রন্থে। ‘সুনামগঞ্জ জেলার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে শাল্লা ও দিরাই থানার বিস্তীর্ণ ভাটি এলাকা। অসংখ্য হাওর-বাঁওড় আর নদীনালা এ অঞ্চলের ভূ-বিন্যাসে ভিন্ন রকম দৃশ্যপট মেলে ধরেছে। দিগন্তে যতদূর চোখে দেখা যায়, শুধু জল আর জল। তারই মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে নদী।’

 

ফজলে হাসান আবেদ প্রবর্তিত ‘ব্র্যাক’ বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থা, আমাদের গর্ব। ব্র্যাকের কর্মীসংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় ছিল ৬৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আবেদের চিন্তা-চেতনা, পরিশ্রমের সোনালি ফসল ব্র্যাক। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশের বিপন্ন মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে তিনি এই ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সূচনা করেন। দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জীবনমান উন্নয়নে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে বিশাল কর্মযজ্ঞে নিবেদিত ব্র্যাক। আমরা আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে ব্র্যাক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পদচিহ্ন রেখেছে। ব্র্যাকের কর্মপরিধি এখন পাকিস্তান, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, তানজানিয়া, দক্ষিণ সুদান, ফিলিপাইন, হাইতিসহ বহু দেশে। ক্ষুদ্রঋণ প্রসঙ্গে যে পরিসংখ্যান উল্লেখ না করলেই নয়, তাহলো_ ব্র্যাক ৪০ লাখ ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতার মধ্যে ১৯০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। গ্রহীতার ৯৫ ভাগই নারী। ঋণ ফেরতের হার ৯৮ শতাংশ।

 

ফজলে হাসান আবেদের এক স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান আড়ং। গ্রামবাংলার কারুশিল্পীদের পণ্য বিপণনের উদ্দেশ্যে ১৯৭৮ সালে ‘আড়ং’ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। এখন পোশাকে সুরুচির নামই হলো আড়ং। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি শিক্ষার জানালা সবার জন্য অবারিত করাও ব্র্যাকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে ফজলে হাসান আবেদ সমকালকে বলেছেন, শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত যারা তাদের পাশে আমরা দাঁড়িয়েছি। তাদের কেউ যখন ব্র্যাক কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর দিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে হেঁটে যায় তখন তৃপ্তিতে বুক ভরে ওঠে। আমরা গর্বিত নাগরিক তৈরির জন্য কাজ করছি; এটাই আমাদের শিক্ষা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। ব্র্যাক স্কুল থেকে বের হয়ে আসা ৩৪ লাখ শিক্ষার্থীর অনেকেই এখন চীন ও জাপানে পড়াশোনা করছে।

 

গত ছ’বছর ধরে ব্র্যাক ব্যাংক ও সমকাল যৌথভাবে ‘ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান করছে। দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার হিসেবে এটি গুণীজনের প্রশংসা অর্জন করেছে। ফজলে হাসান আবেদের বিশেষ আগ্রহের কারণেই ‘ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার’-এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। একজন পরিপূর্ণ ফজলে হাসান আবেদকে নানা মাত্রায় বিশ্লেষণ করেছে বিশ্ব গণমাধ্যম। ভারতের সবুজ বিপ্লবের নায়ক এমএস স্বামীনাথন ফজলে হাসান আবেদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছেন, আবেদ একজন কুশলী চিন্তাবিদ ও সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টা।

 

২০১০ সালের জানুয়ারিতে সমকাল ফজলে হাসান আবেদের নাতিদীর্ঘ একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিল। এই সাক্ষাৎকারে তিনি তার কর্মজীবন, বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে তার চিন্তাভাবনা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। সমকাল প্রশ্ন করেছিল_ আপনার সৃজনশীল নেতৃত্ব নানা ক্ষেত্রে। এর মধ্যে কোনটিকে আপনি সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন? তার জবাব :কাজের সুযোগ সৃষ্টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের আয় বাড়াতে হবে। এ জন্য শিক্ষার প্রসার জরুরি। শিক্ষার অভাবে যেন আমাদের উত্তরসূরিরা দারিদ্র্যপীড়িত না থাকে সে জন্য শিক্ষা সম্প্রসারণে আমার গোটা সংগঠন নিয়ে কাজ করছি। তিনি এ কথাও স্পষ্ট করে দেন যে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেই বিদেশে ব্র্যাক তার কার্যক্রম চালাচ্ছে। আফগানিস্তানের মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ দেশেও ব্র্যাকের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং অনেক ব্র্যাক কর্মীকে সরকারবিরোধীরা অপহরণ করেছে। এরপরও সেখানে ব্র্যাকের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়নি। একজন কর্মবীর মানুষের কর্মযজ্ঞে কখনও ইতিরেখা টানা যায় না। তাই ফজলে হাসান আবেদ বলেন, আমাদের অনেক কাজ এখনও অসম্পন্ন। আমরা তাই থেমে থাকব না।

 

কীর্তিমান পুরুষ ফজলে হাসান আবেদ তার বিশাল কর্মযজ্ঞের অনেক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে_ র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার, ইউনেস্কো নোমা পুরস্কার, ইউনিসেফ মরিস পেট পুরস্কার, প্রথম ক্লিনটন গ্গ্নোবাল সিটিজেন পুরস্কার, বিশ্ব স্বাস্থ্য পুরস্কার, ক্লিনটন গ্গ্নোবাল সিটিজেন পুরস্কার। আমাদের বিশ্বাস, ফজলে হাসান আবেদ একদিন বিশ্বের সেরা পুরস্কারটিও পাবেন।

 

প্রিয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উদৃব্দতি দিয়ে ফজলে হাসান আবেদের উদ্দেশে বলব :

 

মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও

 

মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও

 

এসে দাঁড়াও ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও

 

মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাদের পাশে এসে দাঁড়াও।

 

শুভ জন্মদিন, স্যার ফজলে হাসান আবেদ।