ভুল সিদ্ধান্ত দ্বারা এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা যাবে না

128

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

মাত্র গতকাল সোমবার অধ্যাপক রেজাউল করিমের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমার অন্য এক কলামে লিখেছি। আজও একই বিষয় নিয়ে লিখতে বসেছি। কারণ এই অব্যাহত বর্বর হত্যাকাণ্ড মনের মধ্যে এক প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ জ্বালা সৃষ্টি করেছে। এ কেমন দেশ, যে দেশে ধর্মের নামে একের পর এক নিরীহ মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়; কিন্তু অপরাধী ধরা পড়ে না, আর ধরা পড়লেও তার বা তাদের বিচার বিলম্বিত হয়!

অধ্যাপক রেজাউল করিম ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনা লোক। গান-বাজনা ভালোবাসতেন। ধর্ম নিয়ে কোনো বিতর্কে জড়াননি। তাহলে তাঁকে কেন অন্যান্য ব্লগারের মতো নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হলো? ক্ষমতাসীন মহলের কেউ কেউ যে বলছেন, ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য লেখার জন্যই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, অধ্যাপক রেজাউল করিমের বেলায় সেই যুক্তিটা খাটে কোথায়? এই হত্যাকাণ্ড তো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়, শুধু ধর্ম নিয়ে আলোচনাকারীরা নয়, দেশের আধুনিক সংস্কৃতিমনা প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার অধিকারী যেকোনো মানুষের জীবন এ দেশে নিরাপদ নয়।

বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সুলতানা কামাল এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলেছেন, যা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘দেশের উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। উন্নয়ন দিয়ে কী হবে, যদি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা না থাকে?’ আমারও প্রশ্ন, এই উন্নয়ন ভোগ করবে কারা? আস্তিক-নাস্তিক-নির্বিশেষে সব নাগরিককে নিরাপত্তাদান একটি আধুনিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে বারবার ব্যর্থ হলে সেই রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে পরিগণিত হয়। এত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরও বাংলাদেশ কি সেই ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে পরিগণিত হতে চায়?

লন্ডনে বসেও খবর পাচ্ছি, রেজাউল করিম হত্যায় সারা দেশ বিক্ষোভে উত্তাল। এই বিক্ষোভ স্বাভাবিক। এই অব্যাহত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দেশের মানুষ নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা দেখছে। দেশের যেকোনো আধুনিক সংস্কৃতিমনা মানুষ এখন ভাবতে পারেন, আজ ঘর থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তিনি ধর্ম সম্পর্কিত বিতর্কে জড়িত না হয়েও ঘাতকদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বলি হতে পারেন, রাষ্ট্র তাঁকে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম।

সুতরাং যাদের সুযোগ-সুবিধা আছে তাদের পক্ষে জীবন রক্ষার জন্য দেশত্যাগই উত্তম কাজ। আর এই দেশত্যাগে ইচ্ছুকদের আশ্রয়দানের জন্য আমেরিকার মতো দেশও তো তার দুয়ার খুলে দেওয়ার কথা বলছে। এভাবে একটা দেশের মুক্তমনা শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে যদি ‘মাস-এক্সোডাস’ শুরু হয়, তাহলে সে দেশটির ভবিষ্যৎ কী? শেষ পর্যন্ত দেশে যারা থেকে যাবে—সেই এক শ্রেণির ধর্মান্ধ মানুষ এবং জামায়াত-শিবিরের লোকজন দিয়ে দেশ চালাতে হবে কি? তাতে দেশে তালেবানি শাসন প্রতিষ্ঠা রোধ করা যাবে কি? এই আশঙ্কা সম্পর্কে আমাদের সুধীসমাজের বিজ্ঞ ব্যক্তিরা কী বলেন?

মাত্র কয়েক দিন আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটির ঘা না শুকাতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিমের এই নৃশংস হত্যা এ কথাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব হয়নি। সন্ত্রাস চেহারা বদল করেছে মাত্র। আগে ছিল প্রকাশ্যে সরকার উত্খাতের সংকল্প নিয়ে রাজপথে পেট্রলবোমা ছুড়ে, বাসে আগুন দিয়ে নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যা। বিএনপি-জামায়াত ছিল এই সন্ত্রাসের হোতা। সরকারের পক্ষে এই সন্ত্রাসের মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে; কিন্তু সন্ত্রাস দমন সম্ভব হয়নি। সন্ত্রাস চেহারা বদলে এখন টার্গেটেড কিলিং শুরু করেছে। উদ্দেশ্য একই—দেশে অরাজকতা সৃষ্টি। শিক্ষিত মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করা। সব শেষে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন এবং মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতাকে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠাদান।

একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী এবং বর্তমানের মুক্তমনা মানুষ হত্যাকারীদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। ১৯৭১ সালে যারা বাংলাদেশে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল, তারা ছিল জামায়াত-শিবিরের লোক। বর্তমানে যারা ব্লগার ও মুক্তমনা মানুষকে হত্যা করছে তারা কাদের লোক? পুলিশ নাকি তাদের পরিচয় ও ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ বগুড়ায় জিয়াউদ্দিন বাবুর হত্যাকাণ্ডে জড়িত যে তিন ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা নিজেদের শিবিরের লোক বলে পরিচয় দিয়েছে। রাজশাহীর অধ্যাপক রেজাউল করিমের হত্যাকারী সন্দেহে যে যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেও শিবিরের লোক বলে পরিচয় জানা গেছে।

তাহলে এই ধৃত ব্যক্তিদের পুলিশ রিমান্ডে নিয়েও কেন তাদের কাছ থেকে ঘাতকদের নেটওয়ার্কের খবর জানা যাচ্ছে না? পুলিশ ধুয়া তুলেছে, ঘাতকদের একে অন্যের সঙ্গে জানাজানি না থাকায় একজনকে ধরে অন্যদের খবর পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রেই তো ঘাতকদের দলীয় পরিচয় পাওয়া গেছে, তারা জামায়াত-শিবিরের লোক। রাজপথে নিরীহ মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারার সন্ত্রাস ব্যর্থ হওয়ায় এখন তারা টার্গেটেড কিলিংয়ের পথ ধরেছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের প্রতিশোধ গ্রহণও এই সন্ত্রাস সৃষ্টির আরেকটি বড় কারণ।

এই সন্ত্রাসের সঙ্গে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকদের একটা বড় অংশের নেপথ্য যোগাযোগ আছে। আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অন্ধকারে পথ না হাতড়ে দেশময় জামায়াত-শিবিরের আস্তানাগুলোর ওপর যদি ভালোভাবে নজর রাখে এবং কিছু চিহ্নিত মসজিদ-মাদ্রাসাসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রাবাসের কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি নিয়ে আকস্মিক তল্লাশি চালায়, তাহলে এই ঘাতকরা যতই পরস্পর বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হোক, তারা অনেকে ধরা পড়বেই। তাদের অনেক ঘাঁটিও আবিষ্কৃত হবে।

মনে করা হতে পারে, বাংলাদেশের ব্লগার ও মুক্তমনা মানুষ হত্যাকারীরা বুঝি ‘ইনভিজিবল ম্যান’। তারা মোটেই ‘ইনভিজিবল ম্যান’ নয়। তারা আমাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ। আমাদের মতোই তাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন আছে। সর্বোপরি আছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষতা। এই সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং তাদের বিচার ও দণ্ডের আওতায় আনা সম্ভব।

অবশ্য এই সন্দেহভাজন ঘাতকদের যদি শক্তিশালী রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আশ্রয় থাকে, তাহলে অন্য কথা। এ ক্ষেত্রে এই ঘাতকদের ধরার ব্যাপারে কেবল পুলিশকে দায়ী করে লাভ নেই। অনেকেই সন্দেহ করে, সাগর-রুনি হত্যা থেকে শুরু করে তনু হত্যার মামলা যে এগোতে পারছে না তার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী মহলের চাপ। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায়ও একই ব্যাপার ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্লগার হত্যা ও টার্গেটেড কিলিংয়ের হোতাদের পেছনেও যদি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের পৃষ্ঠপোষকতা থাকে, তাহলে সমস্যা বাড়ে। শর্ষের মধ্যেই যদি ভূত থাকে, অর্থাৎ ক্ষমতাসীন মহলের মধ্যেই যদি এই ধরনের ‘আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা’ থাকেন, তাহলে আরো ভয়ের কথা।

আমার ধারণা, সরকার একটি ভুল সিদ্ধান্তের ওপর বসে থাকায় এই টার্গেটেড কিলিং বন্ধ করতে পারছে না এবং কিলারদেরও ধরতে পারছে না। এই সিদ্ধান্তটি হলো, এক শ্রেণির ব্লগার ধর্মের অবমাননাকর লেখাজোখা করায় তার প্রতিক্রিয়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এই সিদ্ধান্তটি সঠিক নয়। হত্যাকারীরা ধর্মান্ধ বলে পরিচিত। কিন্তু তারা ধর্মপ্রেমিক নয়, ধার্মিক নয় এবং ধর্মের জন্যও এই হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে না। এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক ও অভিসন্ধিপ্রসূত। ধর্মকে সেই অভিসন্ধি পূরণে ব্যবহার করা হচ্ছে মাত্র।

এই অভিসন্ধি মূলত জামায়াত ও শিবির এবং তাদের স্প্লিন্টার্স গ্রুপগুলোর। আইএসের নামকে এখানে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে আইএসের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকতে পারে। ১৯৭১ সাল থেকে এই রাজনৈতিক অভিসন্ধি পূরণের জন্য জামায়াত ও জামায়াতের সহযোগী গ্রুপগুলো গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যায় শরিক হয়েছে এবং বর্তমানেও হত্যার রাজনীতিতে জড়িত রয়েছে। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে ওয়াহাবি মতবাদভিত্তিক (প্রকৃত ইসলাম নয়) মধ্যযুগীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা।

সুতরাং বর্তমানের টার্গেটেড কিলিং দমন এবং কিলারদের যুদ্ধাপরাধীদের মতো শাস্তি দেওয়া বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ। এই সংগ্রামে জয়ী হতে না পারলে শুধু গণতান্ত্রিক সরকার নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার মতো অবস্থার উদ্ভব হতে পারে। বর্তমান সরকার যেন সাম্প্রতিক এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে ধর্মের অবমাননার জন্য ধর্মান্ধদের প্রতিহিংসামূলক বিচ্ছিন্ন কাজ বলে মনে না করে। এটা একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধবিরোধী চক্রগুলোরই প্রলম্বিত চক্রান্তের জাল। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের একটা যোগসূত্র হয়তো স্থাপিত হয়েছে।

দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক সমাজের অস্তিত্ব রক্ষায় বৃহত্তম সংগ্রামের অংশ হিসেবেই এই টার্গেটেড কিলিং বন্ধ করা এবং কিলারদের ঘাঁটি সমূলে উচ্ছেদ করার দায়িত্ব হাসিনা সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে দেশের উন্নয়নের জন্য তারা যত কাজই করুক, সব উন্নয়ন ব্যর্থ হবে এবং সেই সঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক অস্তিত্বও ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন হবে।

লন্ডন, সোমবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৬