‘তৃতীয়বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ ‘-৭ : মাহমুদ এ রউফ

142

বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনীতিক,কমিউনিটি নেতা মাহমুদ এ রউফ দেশে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিতে যুক্তছিলেন। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের  সক্রিয়  কর্মী ও ছাত্রনেতা। সিলেটের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মদনমোহন  কলেজের শিক্ষার্থী  ছিলেন ষাটের দশকের গোড়ার দিকে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে লন্ডনে আসেন ষাটের দশকের  শেষার্ধে। জড়িয়ে পড়েন বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিলেত হয়ে ওঠে তৃতীয় রণক্ষেত্র। মাহমুদ এ রউফ বিলেতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সংঘটিত আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন প্রথম সারির নেতা। তাঁর  লেখনিতে উঠে আসছে  ‘তৃতীয় বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ‘।

বিলেতবাংলা২৪.কম ধারাবাহিক প্রকাশ করছে বিলেতে বাঙালির প্রত্যয়দীপ্ত এই আগুনঝরা দিনের ইতিহাস। প্রতি সপ্তাহে  থাকছে ‘তৃতীয়বাংলায়  মুক্তিযুদ্ধ ‘।-নির্বাহী সম্পাদক।

 

 

কিস্তি-৭

কিন্তু পরের দিন ২৮ মার্চ ‘পূর্ববাংলা হাউসে‘ দেখা গেল আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব অনুপস্থিত। জানা গেল ব্রিকলেনে আওয়ামী লীগের ততকালিন সাধারণ সম্পাদক জনাব তৈয়বুর রহমানের ট্রেভেলস এজেন্সিতে বসে একটা কমিটি করে ফেলেছেন। কমিটির নাম- কাউন্সিল ফর দ্যা পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ ইন ইউকে।

খবর পেয়ে পূর্ব বাংলা হাউসের সভা থেকে ৭জনকে পাঠানো হলো। দেখা গেল আওয়ামীলীগের দ্বারা গঠিত কমিটিতে ২১ জন সদস্য রয়েছেন। (১১ জন লন্ডন থেকে ও ১০ জন ব্রিটেনের অন্যান্য শহর থেকে নেওয়া হবে।) যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব গাউস খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় নতুন কমিটির কর্মকর্তা হচ্ছেনÑ সভাপতি জনাব গাউস খান, সেক্রেটারি জনাব তৈয়বুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব আতাউর রহমান খান, কোষাধ্যক্ষ জনাব আবদুল হামিদ। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার জন্য ২৯ মার্চ পর্যন্ত সভা মুলতবি ঘোষণা করা হয়।

পূর্ববাংলা হাউস এর সভা থেকে যে ৭ জন প্রতিনিধি পাঠানো হলো তাদের মধ্যে আমীর আলী, সাখাওয়াত  হোসেন, শেখ আবদুল মান্নান, হাবিব রহমান,নিখিলেশ চক্রবর্তী, আবদুল কুদ্দুস ও মেসবাহ আহমেদ। মাহমুদ এ রউফও তাদের সাথে ব্রিকলেনের সভায়  যোগ দেন। কিন্তু ৭ জনের অর্ন্তভুক্ত নন। এই ৭ প্রতিনিধি ব্রিকলেনের সভায় উপস্থিত হলে কমিটি গঠনের সংবাদ তাদের দেয়া হয়। তবে আন্দোলনে ঐক্যের খাতিরে ঐ কমিটিকে সর্বদলীয় করার উদ্দেশ্যে এই ৭জনকে (১১+১০) মোট ২১ জনের কমিটির অর্ন্তভুক্ত করা হবে বলে জানানো হয়। কার্যত, তাই হলো। পূর্বের সিদ্ধান্ত মতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার জন্য ২৯ মার্চ সভার তারিখ নির্ধারিত হয়।  এই বর্ধিত কমিটির সভার স্থান ঠিক করা হয়  পশ্চিম লন্ডনের মহাঋষি রেস্টুরেন্টে। সেখানে ভবিষ্যত কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হবে।

জানা প্রয়োজন যে, আমীর আলী,সাখাওয়াত হোসেন, শেখ আবদুল মান্নান বুদ্ধিজীবীদের সাথে কাজ করতেন। কিন্তু তাদের কোনো দলীয় সম্পর্ক ছিলো না। ফলে সুযোগ পেলেই তারা সম্পর্ক ও দল বদল করতেন। বিশেষ করে শেখ আবদুল মান্নান সুবিধা নেয়ার জন্য সবদিকেই যাতায়াত করতেন। এমনকি প্রয়োজন বোধে জনসভায় কান্নাকাটি করেও  নেতা কর্মীদের সহানুভুতি পাওয়ার চেষ্টা করতেন। আওয়ামী লীগের কাছে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাল্পনিক আত্মীয় সেজেও ফায়দা উঠাতে দ্বিধাবোধ করেননি। অথচ আমাদের বন্ধুদের  কাছে গিয়ে অবস্থা বেঁধে বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে  কটুকথা বলে আওয়ামীলীগ বিরোধী সাজতে চেষ্টা করেছেন। তার আসল উদ্দেশ্য হলো, ছলেবলে কৌশলে নেতৃত্বের ভাগ নেয়া। তিনি ডানপন্থী ও বামপন্থী উভয় দিকেই থাকতে চাইতেন। নীতির ব্যাপারে কোনো সঠিক অবস্থান ছিলো না। শেখ মান্নান আওয়ামী লীগের সাথে যখন থাকতেন তখন আওয়ামী লীগার ও ন্যাপের লোকের কাছে এসে ভাব দেখাতেন ন্যাপের খুবই খাঁটি সমর্থক। যার ফলে কেউই তাকে বিশ্বাসে নিতে পারেননি। কিন্তু কথা বলার তার বিশেষ গুণ ছিলো বলে তাকে আন্দোলনের সামনের কাতারেই রাখা হয়েছিলো। নীতিবানদের সাথে কথা বলার এরকম  লোকও প্রয়োজন। যেহেতু কথাবার্তায় বেশ ভালো ছিলেন সেহেতু প্রত্যেক সভায়ই অনেকে তাকে সম্মান করতো। এই সুযোগ নিয়ে ২৭ মার্চের পূর্ব লন্ডনের সভায় সভাপতি জনাব গাউস খান শেখ মান্নানকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এমনকি কমিটির সেক্রেটারি করার  মনস্থ  হয়তো করেছিলেন। কিন্তু পরের দিন ২৮ মার্চ যখন আওয়ামী লীগের মনোনীত কমিটি ২১জন  সদস্যদের সাথে পূর্ববাংলা হাউসের মনোনীত ন্যাপ ও অন্যদের ৭ সদস্য যুক্ত হয়ে বর্ধিত আকারের কমিটি হলো তখন আর শেখ মান্নানের ব্যাপারে  আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট কোনো গুরুত্ব দিলেন না। পরে  যখন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী আসলেন তখন এই সর্বদলীয় কমিটি ভেঙে দেওয়ার ব্যাপারে  শেখ মান্নানের ভূমিকা খুবই লক্ষণীয় ছিলো। চলবে।