উফশীর গুণে মাছে-ভাতে পরাণদহ

93

 

আবদুল বায়েস

শুধু মুখ দেখে যে পুরো স্বাস্থ্য চেনা যায় না এ কথাটা বহুকাল পূর্বে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ পলস্যামুয়েলসন সম্ভবত সে কথাটাই একটু ঘুরিয়ে বলেছেন তার বিখ্যাত ‘ইকোনমিকস’ বইয়ের সূচনায়। বইটিতে যে কয়েকটা ভুলের প্রতি তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন তার একটি হচ্ছে, ‘ফ্যালাসি অব কম্পোজিশন’- যার অর্থ শরীরের একটা বিশেষ অঙ্গকে সমস্ত শরীর হিসেবে ধরে নেওয়া। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়ই এ ভুলটা করা হয়ে থাকে বলে বোধ হয় তার এই সাবধানবাণী। আমরাও অনেকটা ওই ধরনের ভুল পথে হাঁটছিলাম; কিন্তু ভাগ্য ভালো যে তা হয়নি। ঘটনাটা তা হলে খুলেই বলি।

 

দেশে তখন রাজনৈতিক হট্টগোল- যান ও প্রাণ জ্বালানোর প্রচেষ্টা। এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হলো, এবারের ওর‌্যাল হিস্ট্রির আসর বসবে সাতক্ষীরা জেলার পরাণদহ গ্রামে। সাতক্ষীরার কথা শুনেই তো বুক ধুকধুক করে উঠল। তারাশঙ্করের ভাষায় যাকে বলে, ‘চক্ষু দুইটা ছানাবড়ার মতো বিস্টম্ফারিত।’ এর কারণটাও কারও অজানা থাকার কথা নয়। মাত্র কিছুদিন আগে সাতক্ষীরা শহর তথা আশপাশের গ্রামে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটেছিল, যার জের এখনও থাকতে পারে বলেই আতঙ্কের সূত্রপাত। বন্ধুদের ভ্রুকুঞ্চিত জিজ্ঞাসা :’সাতক্ষীরা যাবেন? জানেন তো… সাবধান, দেখেশুনে…।’ অবশেষে দোয়াদরুদ পড়তে পড়তে অভীষ্ট গ্রামের দিকে রওনা হলাম। ওখানে গিয়ে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলাম, সাতক্ষীরা সম্পর্কে যে ধারণা দেওয়া ছিল তা নিতান্তই একটা ‘ফ্যালাসি অব কম্পোজিশন’; সাতক্ষীরার সব জায়গায় যেমন লবণাক্ত পানির চিংড়ি হয় না, তেমনি ঘটে না জীবনকাড়া রাজনৈতিক হানাহানিও।

 

দুই. আজকাল গ্রামবাংলার উন্নয়ন সংক্রান্ত ডিসকোর্সে উচ্চফলনশীল ধান (উফশী) কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। উফশী ধান-তাড়িত উন্নয়নের জয়গান সর্বত্র; ভাবটা এমন যে উফশী মানেই উন্নয়ন। তাই ভাবলাম উফশী দিয়ে গ্রামের বিবর্তন বৃত্তান্ত শুরু করলে মন্দ হয় না। এখানে উফশী ধান আসে আশির দশকে এবং প্রথম ধানের জাত ‘চান্দিনা’। তার আগে মূলত এক ফসলি জমির প্রাধান্য ছিল; খানাগুলোর খোরাক আসত প্রধানত আমন মৌসুমে উৎপাদিত ধান থেকে। শুকনো মৌসুমে করা কিছু রবিশস্য দিয়ে খানার ভোগ ও হাতের খরচ মিটত। ওর‌্যাল হিস্ট্রিতে যোগ দেওয়া গ্রামবাসী, যাদের মধ্যে আছেন দিনমজুর, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ইউপি সদস্য, কৃষক- উফশীর উষালগ্ন নিয়ে বেশ মজার গল্প শোনালেন। আশির দশকে উন্নত বীজ আসার পরপর এই গ্রামে নাকি দুটি মত দানা বাঁধে :একটি সম্ভাবনার ও অন্যটি সর্বনাশের। কেউ ভেবেছে আগত উন্নত বীজ সম্ভাবনাময় এবং আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে হাজির হয়েছে। অপরপক্ষের চিন্তা ছিল প্রকৃতির পানি বাদ দিয়ে মাটির নিচের পানিতে ধান ফলানো সর্বনাশা একটা কাজ এবং এতে আল্লাহর গজব নাজিল হতে পারে। সুতরাং সনাতন ধান হোক সবার সহায়। এদিকে দিন যেতে থাকে এবং ঘড়ির কাঁটাও ঘুরতে থাকে। সময়ের বিবর্তনে ‘নেসিসিটি ইজ দ্য মাদার অব ইনভেনশন’ কথার পথ ধরে ‘গজবতত্ত্ব’ হার মানতে বাধ্য হয় ‘নেয়ামত-তত্ত্বে’র কাছে।

 

তিন. এই গ্রামে উফশী ধান উচ্ছ্বাসের জন্ম দিয়েছে। তবে উদীয়মান উদ্বেগের কারণে কৃষকের কপালে পড়া ভাঁজ লুকানো থাকে না। খুব সম্ভবত ২০০০ সালের দিকে আর্সেনিকের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সমালোচকদের মতে, আর্সেনিক সমস্যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ সৃষ্টির অবধারিত ফসল। আর্সেনিক বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্ষণশীলদের ‘গজবতত্ত্ব’ কল্কে পেতে শুরু করে। তবে ভাগ্য ভালো যে, যত মুশকিল তত আসান। সরকার, দাতাগোষ্ঠী ও এনজিওদের সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় আর্সেনিকমুক্ত পানির কল ও বেশ কয়েকটা গভীর নলকূপ বসিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। গুটিয়ে যায় ‘গজবতত্ত্ব’। বর্তমানে গ্রামটি সম্পূর্ণ আর্সেনিকমুক্ত; যদিও আর্সেনিকের সেই ভূত কখনও কখনও স্বপ্নে তাড়া করে বেড়ায়। মাটির উর্বরতা শক্তি নিয়ে উদ্বেগ আছে; তবে রাসায়নিক সারের প্রাপ্তি নিয়ে কোনো ঝুট-ঝামেলা নেই। কারণ, এই গ্রামে ৬ জন ডিলার আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সবাই যথাসময়ে যথেষ্ট পরিমাণ সারের জন্য বেশি দাম দিতে প্রস্তুত। ইদানীং সারের ব্যবহার বেড়েছে মাটির উর্বরতার শক্তি ধরে রাখার জন্য; আবার অত্যধিক সারের ব্যবহার উর্বরতা শক্তি হ্রাস করে ফলনমাত্রা নিম্নমুখী করেছে। অবশ্য এ ধারণার সঙ্গে একমত নয় অনেকে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, কৃষক বেশি ফলন পাওয়ার জন্য ধানের জাত বদল করছে। সুতরাং ফলনমাত্রা না কমে বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সারা বছর ফসলে আবৃত থাকার ফলে চারণভূমির অভাব ঘটছে এবং জৈব সারের অভাব দেখা দিয়েছে; যেমন- বর্তমানে এই গ্রামের মাত্র ১০ ভাগ কৃষক জমিতে জৈব সার ব্যবহার করে থাকে। অপরদিকে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগ কম বড় নয়।

 

চার. পরাণদহ গ্রামে শুকনো মৌসুম যদি হয় ভাতের বড়াই, তা হলে আমন মৌসুমে হবে মাছ-ভাতের লড়াই। এখানে আমন মৌসুমে ৭৫ শতাংশ জমিতে উফশী এবং ২৫ শতাংশ জমিতে স্থানীয় জাতের ধান হয়। এক সময় ছিল যখন এই মৌসুমে স্থানীয় জাতের ধান ছিল প্রধান আকর্ষণ। এখন বৃষ্টির মৌসুমে মাঠজুড়ে থাকে জামাইবাবু, স্বর্ণা, জটবালাম, নাজিরশাইল ইত্যাদি জাতের ধান। তবে জামাইবাবুর প্রতি সবার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। জামাইবাবুর বাড়ি ভারতে, তার ফলনমাত্রা বিঘাপ্রতি ১০-১২ মণ এবং এর ভাত খেতেও ভালো। ভারত থেকে এসে জামাইবাবু শ্বশুরবাড়ি পরাণদহের মানুষের মন জয় করে জামাই আদর পাচ্ছে। স্বর্ণাও ভারত থেকে আসা এবং জামাইবাবুর মতো প্রায় সমগুণসম্পন্ন। আনন্দের খবর আরও যে, এই গ্রামে এখনও কিছু কিছু সনাতন জাতের ধান আবাদ হচ্ছে এবং এর পেছনে কারণগুলো মোটামুটি এ রকম- ক. কিছু সনাতন জাত বর্ষায় ডুবে গেলেও বেঁচে থাকতে পারে; খ. কোনোটি বন্যার পর লাগালেও কিছু ফসল দেয় এবং গ. কোনো জাত থেকে ঐতিহ্যবাহী মুড়ি ও চিড়া ভালো হয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে সার ও কীটনাশক থেকে মুক্তি। আসল কথা, সীমান্তের খুব কাছে বলে পরাণদহ অন্য কিছু সুবিধা পায়; যেমন- ওপারের কৃষি সংক্রান্ত জ্ঞান এবং ধানের বীজ অতি সহজে সীমান্ত রক্ষীর চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে আসে। আর তাই বোধ হয় বলা হয় যে, জ্ঞান কখনও দেয়াল তুলে ঠেকানো যায় না। এই গ্রামের পাশে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের গরুর হাট, যে হাটে সিংহভাগ গরু ভারত থেকে আসে। পরাণদহের মানুষ মনে করে, কৃষকদের সহায়তায় ওপার বাংলায় যেমন কর্মসূচি আছে, বাংলাদেশে তা নেই। এই গ্রামের কিছু পরিবারের দুই জায়গাতেই বসত আছে- ফুরসত পেলে টুকটাক উছিলায় টুক করে চলে যায় আবার চলে আসে। নিয়ে যায় কিছু দ্রব্য, বিনিময়ে আসে বিশাল জ্ঞান।

 

একটু আগে বলেছি, পরাণদহে আমন মৌসুমে মাছ-ভাতের জন্য লড়াই হয়। ইদানীং এই মৌসুমে ভূমি-ব্যবহারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে বলে শোনা যায়। অনেকে অনেকটা বাধ্য হয়ে ধান বাদ দিয়ে মাছ চাষের দিকে ঝুঁকছে। কারণ ক্রমবর্ধিষ্ণু জলাবদ্ধতার জন্য অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধানের চেয়ে মাছে লাভ বেশি। এক বিঘা জমি ভাড়া দিলে ৩০০০-৪০০০ টাকা, তা-ও বাড়িতে বসে। ইদানীং দেদার মাছের ঘের বানিয়ে মিষ্টি পানিতে বিভিন্ন মাছের চাষ করা হচ্ছে; যেমন- রুই, কাতলা, গলদা চিংড়ি, মৃগেল, তেলাপিয়া, সিলভার কার্প, কই ইত্যাদি। আগেও যে মাছ চাষ হয়নি তা নয়। তবে এখনকার মতো বিস্তৃত, বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হয়নি। এসব মাছ কালবিলম্ব না করেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আবার মৌসুমের ফলমূল, শাকসবজি ও মাছ এখান থেকে ঝেঁটিয়ে চলে যায় রাজধানীতে, যখন মফস্বল পরাণদহ তথা সাতক্ষীরা নিরুপায় চোখে চেয়ে থাকে। মাছ চাষ থেকে যেমন আয় হয়, তেমনি দেহে প্রোটিন যায় অর্থাৎ মাছে-ভাতে পরাণদহ গ্রাম। কেউ বলতেই পারে যে, ‘গভীর জলের মাছ’ বলে পরাণদহের মানুষ এমনি করে এক ঢিলে দুই পাখি মারে।

 

তবে মাছ নিয়ে তাদের মাথাব্যথাও কম নয়। একে তো ধানের উৎপাদন কমে যাচ্ছে; অপরদিকে জলাবদ্ধতা ও মাছে ব্যবহৃত উপকরণ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বাঁশতলা থেকে প্রবাহিত খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার জন্য নাকি যত অনাসৃষ্টি। এই খালকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে বহু দেনদরবার হয়েছে; প্রতিশ্রুতিও পাওয়া গেছে প্রচুর। তবে রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি যে না রাখার জন্যই তা মানুষ টের পায় ভোটের পর। এত কিছুর পরও বলা যায় যে, উফশী ধান, শাকসবজি ও মাছ নিয়ে সারা বছর ব্যস্ত থাকছে পরাণদহের মানুষ- মাটিতে যাদের মঙ্গল নিহিত।

 

পাঁচ. সারাদিন গনগনে কিরণ ছিটিয়ে মাথার ওপরে থাকা সূর্য অস্তায়মান প্রায়। আমাদেরও যাওয়ার পালা। প্রাণ জুড়ানো পরাণদহ ছেড়ে মন যেন কিছুতেই যেতে চাইছে না; ‘তবু যেতে দিতে হয় তবু চলে যায়’। গ্রাম ছেড়ে গাড়ি চলল শহর পানে, যে শহরের ইতিকথা গ্রামের মতো নয়: ‘ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যথা। এখানে আকাশ নেই, এখানে বাতাস নেই; এখানে অন্ধ গলির নরকে মুক্তির আকুলতা…।’ তারপরও মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে চায়- দুঃখটা ওখানেই।

লেখক:  অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়