শফিক রেহমানের গ্রেপ্তারের কারণ নিয়ে নানা মত

110

এপ্রিল ১৮, সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেপ্তারের কারণ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। পুলিশ সুনির্দিষ্ট মামলা দেখিয়ে গ্রেপ্তার করলেও বিএনপির নেতারা মনে করছেন, শফিক রেহমানকে যে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, গ্রেপ্তার করার মূল কারণ সেটি নয়। তবে ঠিক কী কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা নিয়ে দলটির নেতাদের মধ্যে নানা আলোচনা আছে।

বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের চাপে রাখতে শফিক রেহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আবার কারও কারও ধারণা, কূটনৈতিক পর্যায়ে শফিক রেহমানের যোগাযোগ থাকায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে সরকারের দুজন মন্ত্রী গতকাল রোববার বলেছেন, সুনির্দিষ্ট মামলায় এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে শফিক তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নির্দোষ প্রমাণিত হলে তিনি ছাড়া পাবেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের কাছে এবং তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সংবাদ সম্মেলনে এ বক্তব্য দেন।

তবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এই গ্রেপ্তার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে এবং তাঁর তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনায় নাম থাকায় তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, এটা আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী বিশ্বাস করেন। আবার তাঁর মতো প্রবীণ সাংবাদিক এমন কাজ করতে পারেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয়ও আছে অনেকের মধ্যে।

গত শনিবার সকালে শফিক রেহমানকে তাঁর ইস্কাটনের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনায় পুলিশ গত বছরের আগস্টে পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। পরে তা মামলায় রূপান্তরিত হয়। সেই মামলায় শফিক রেহমানকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শফিক রেহমানের বাসায় তাঁর স্ত্রীকে দেখতে যান। এ সময় মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, শফিক রেহমানকে রিমান্ডে নেওয়া অমানবিক, এটি কাম্য নয়। যাঁরাই সরকারের বিরোধী মত পোষণ করে, সরকার কোনো না কোনোভাবে তাঁদের গ্রেপ্তার করছে। শফিক রেহমানকে গ্রেপ্তার তারই অংশ।

ডিবি কার্যালয়ে শফিক রেহমান: শফিক রেহমানকে ডিবি কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। গতকাল ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন। মামলার তদন্ত-তদারক কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয়কে আমেরিকায় হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু হয় ২০১১ সালে। এর অংশ হিসেবে ২০১২ সালে জাসাসের (জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠন) সহসভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনের যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বাসায় একটি বৈঠক হয়। এতে মোহাম্মদ উল্লাহ, তাঁর ছেলে রিজভী আহমেদ (সিজার), এফবিআইয়ের এক প্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে শফিক রেহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শফিক রেহমানের পাসপোর্ট জব্দ করা হবে। এ ছাড়া এজাহারে উল্লেখ করা তথ্যগুলো সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিবারের পক্ষ থেকে শফিক রেহমানের ওষুধপত্র ডিবি কার্যালয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

মাহমুদুর রহমানের নামও এসেছে: পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, শফিক রেহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জয়কে হত্যা ও অপহরণের ষড়যন্ত্রে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। আজ সোমবার মাহমুদুর রহমানকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ড চাওয়া হবে।

জানা যায়, মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় তাঁর তিন বছর সাজা হয়েছে। তিনি জেলেও আছেন প্রায় তিন বছর। ৭১টি মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন।

বিএনপিতে গ্রেপ্তার আতঙ্ক: শফিক রেহমান ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র এম এ মান্নানকে গ্রেপ্তারের পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনেকের মধ্যে নতুন করে গ্রেপ্তার-আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, শফিক রেহমান সরাসরি বিএনপির নেতা নন। তবে দলের হয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি করেন, দলের কূটনীতির বিষয়টি যে কমিটি দেখাশোনা করে, তিনি তার আহ্বায়ক। তাঁকে গ্রেপ্তারের পেছনে এ-সংক্রান্ত কোনো কারণ থাকতে পারে। এই নেতা বলেন, যে মামলার কথা বলা হচ্ছে, সেটাতে শফিক রেহমানের সম্পৃক্ততা থাকলে অনেক আগেই তাঁর নাম আসা উচিত ছিল। তাই হঠাৎ কেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো, তা অনেকে বুঝে উঠতে পারছেন না। এ কারণে দলের অনেকে নতুন করে গ্রেপ্তার আতঙ্কে পড়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ওসমান ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির নেতা-কর্মীরা এমন কিছু করেনি, যাতে সরকারকে এমন আচরণ করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে তৃণমূলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন ক্ষুব্ধ। বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি ও কাউন্সিলে বিএনপির নেতা-কর্মী ছাড়াও ক্ষুব্ধ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছে। এসব দেখে শঙ্কিত হয়ে সরকার হয়তো আবার চেপে ধরার কৌশল নিচ্ছে।

শফিক রেহমানের মতো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর দলের অনেকে মনে করছেন, সরকার আবার কঠোর অবস্থানের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিএনপিতে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শফিক রেহমান ও এম এ মান্নানকে গ্রেপ্তারের পর নেতা-কর্মীদের মধ্যে গ্রেপ্তারের আতঙ্ক বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘এত দিন পর কেন শফিক রেহমানের নাম এল?’

শফিক রেহমানের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের প্রতিবাদে গতকাল সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ আয়োজিত এক মানববন্ধনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, যে মামলায় শফিক রেহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেটি হয়েছে অনেক আগে। গ্রেপ্তার করা হলো এখন। এখানে নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্র আছে। প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদন, সংগৃহীত।