দুই হাজার গাড়ির কী হবে – মংলা বন্দরে আটকে আছে ৫ বছর

135

শেখ আবদুল্লাহ

মংলা বন্দরে পাঁচ বছর ধরে দুই হাজারের বেশি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দেশের শতাধিক আমদানিকারক এসব গাড়ি আমদানি করেছেন। আমদানির যথার্থতা, সঠিক আমদানি মূল্য নির্ধারণ, ইয়েন-ডলার-টাকার বিনিময় হার নির্ধারণ, অবচয় হার ও পরিমাণ নির্ধারণ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বন্দরের ডেমারেজ বা স্টোরেজ চার্জ নির্ধারণবিষয়ক জটিলতার কারণে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের এসব গাড়ি বন্দরে পড়ে আছে।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যেভাবে এসব গাড়ি খালাস করতে চাইছে, আমদানিকারকরা তা চাইছেন না। আমদানিকারকরা যে মূল্য নির্ধারণ বা যতটা অবচয় সুবিধা চান, এনবিআর তা দিতে রাজি নয়। এ অবস্থায় দুই হাজার গাড়ির ভাগ্যে কী আছে কেউ জানেন না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েক বছর ধরে এসব গাড়ি বন্দর থেকে বের করার বিষয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, অর্থনৈতিকবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, পুরনো গাড়ি

আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডাসহ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বারবার আলোচনা, চিঠি চালাচালি ও বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত হলেও জটিলতা কাটেনি। ফলে ৫ বছর পরে এসেও এসব গাড়ি কী প্রক্রিয়ায় খালাস হবে বা আদৌ আমদানিকারকের অনুকূলে খালাস হবে কি-না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।

এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে  বলেন, মংলা বন্দরে আটকে থাকা গাড়ি খালাসের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকবিষয়ক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত ও শুল্ক আইন প্রযোজ্য হবে। রাজস্ব বোর্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই ব্যবসায়ীরা আইন অনুযায়ী গাড়িগুলো খালাস করে নেবেন। এনবিআর তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। তবে সবশেষে কাস্টমস অ্যাক্ট অনুযায়ী নিলামের ব্যবস্থা করা হবে।’ এদিকে সম্প্রতি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের এক প্রতিবেদনে চার মাসের মধ্যে গাড়িগুলোর ছাড়করণ প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে দিতে সুপারিশ করেছে।

গত বছরের ২ ডিসেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়ক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যেসব গাড়ি আমদানি নীতির শর্ত ভেঙে অর্থাৎ ৫ বছরের বেশি পুরনো গাড়ি আমদানি করা হয়েছে, সেগুলো খালাসের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ক্লিয়ারেন্স পারমিট (সিপি) দিতে পারবে। তবে সেই সিপি ভবিষ্যতে কোনো নজির হিসেবে উল্লেখ করা যাবে না। এনবিআর সিপি ইস্যুর ২০ কার্যদিবসের মধ্যে জরিমানা আরোপ ও শুল্কায়ন করবে। এরপর চার মাসের মধ্যে জরিমানা এবং শুল্ক ও কর পরিশোধ করে আমদানিকারকরা বন্দর থেকে গাড়ি নিতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে গাড়ি খালাস করে না নিলে গাড়িগুলো রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে নিলাম করা হবে। শুল্কায়ন জটিলতার কারণে যেসব গাড়ি আটকে আছে, তার ক্ষেত্রে কাস্টমস অ্যাক্ট ১৯৬৯ অনুযায়ী শুল্ককর নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। আমদানিকারকরা সেই অনুযায়ী পরবর্তী চার মাসের মধ্যে শুল্ক, কর ও অন্যান্য চার্জ পরিশোধ করে গাড়ি খালাসের ব্যবস্থা করবেন। এ সময়ের মধ্যে আমদানিকারকরা গাড়ি খালাস না করলে শুল্ক কর্তৃপক্ষ আইনানুগ পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতামূলক নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করবে। মন্ত্রিসভা কমিটির এই সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য গত ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। এর পর ২৪ ডিসেম্বর আমদানিকারকদের গাড়িগুলো ছাড় করার জন্য চার মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। কয়েকজন আমদানিকারক সমকালকে বলেন, শতাধিক আমদানিকারক কয়েক বছর ধরে এসব গাড়ির আমদানি মূল্যের বিপরীতে ব্যাংক ঋণের সুদ দিয়ে আসছেন। খরচ বেড়ে যাওয়া এবং গাড়িগুলোর বাজার গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে। সম্প্রতি যেসব প্রস্তাব আসছে তা হতাশাজনক। ব্যবসায়ীরা এই সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। আমদানিকারকরা মনে করছেন, গাড়িগুলো এত বেশি সময় ধরে বন্দরে আটকে থাকায় শুল্ক-সংক্রান্ত সাধারণ বিধিবিধান দিয়ে এ জটিলতার সুরাহা হবে না। গাড়ি খালাসের জন্য ‘বেল আউট প্রজেক্ট’ নেওয়া দরকার বলে সমকালকে জানান অন্যতম আমদানিকারক ও বারভিডার সাবেক সভাপতি আবদুল হক।

আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করে ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের এ সংক্রান্ত চিঠিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন আমদানিকারক ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে মংলা বন্দরে ২০৭৯টি গাড়ি আমদানি করেন। এর মধ্যে ১৩৮৭টি কার আর ৬৯২টি মাইক্রোবাস ও অন্যান্য গাড়ি। এর মধ্যে ৫১২টি গাড়ি আছে ৫ বছরের বেশি পুরনো। বাংলাদেশের আমদানি নীতিতে ৫ বছরের বেশি পুরনো গাড়ি আমদানি নিষিদ্ধ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্স পারমিট (সিপি) ছাড়া এসব গাড়ি খালাসের কোনো ব্যবস্থা নেই।

ব্যাপক গাড়িজট সৃষ্টি হওয়ায় একদিকে যেমন বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে মূল্যবান এসব গাড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা সরকার ও ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি বলে বিবেচিত হচ্ছে। আমদানিকারকরা বলছেন, গাড়িগুলো আমদানির সময় এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সব পুরনো গাড়ির শুল্ককর সমান থাকায় স্বাভাবিক শুল্ককর দিয়ে খালাস করা সম্ভব হয়নি। ওই সময়ে আবার নতুন গাড়ির চেয়ে পুরনো গাড়ির শুল্ককর তিন লাখ টাকা বেশি ধরা হয়। যে কারণে শুল্কায়ন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে গাড়িগুলোর খালাস আটকে যায়।

এই শুল্কায়ন জটিলতা দূর করার জন্য আমদানিকারকরা রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেন। এদিকে সময় পার হতে থাকে। বাড়তে থাকে বন্দরের ডেমারেজ বা স্টোরেজ চার্জ। একদিকে পাঁচ বছরের পুরনো গাড়ি, আবার বন্দরে পড়ে থেকে গাড়ির মান কমতে থাকে। এ অবস্থায় গাড়িগুলো খালাসে জোরালো দাবি তোলেন আমদানিকারকরা।

এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদারকে সমস্যাটি যথাযথ তদন্ত করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিতে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বাণিজ্য, নৌপরিবহন, আইন মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা সভা করেন। পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সুপারিশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে একটি প্রতিবেদন দেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এনবিআরকে অনুশাসন দেন প্রধানমন্ত্রী।

ওই বছরের ৩১ মে মংলা বন্দর পরিদর্শনে যান প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান। তিনি সরেজমিন পরিদর্শন করে ৭ জুলাই বিস্তারিত পরিস্থিতি তুলে ধরে গাড়িগুলো দ্রুত ছাড় করার সুপারিশ করে অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, নৌপরিবহনমন্ত্রী, এনবিআর চেয়ারম্যান, বাণিজ্য সচিব ও নৌপরিবহন সচিবকে একটি চিঠি লেখেন।

এরপর ২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর জন্য একটি পরিস্থিতিপত্র তৈরি করেন। যাতে নজিবুর রহমান গাড়িগুলো খালাসে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ অবচয় সুবিধা দেওয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন। এর আগে এসব গাড়িতে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ অবচয় সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ অবচয় সুবিধা দেওয়ায় সরকার ৬৯ কোটি টাকা রাজস্ব কম পাবে বলে উল্লেখ করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। ওই প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী রাজি হয়ে বাণিজ্য ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাজগুলো দ্রুত শেষ করতে এনবিআরকে নির্দেশ দেন। কোনো গাড়ির মূল্য ১০০ টাকা হলে তার ৭০ শতাংশ অবচয় সুবিধার অর্থ হচ্ছে, ওই গাড়ির মূল্য ৩০ টাকা ধরে তার ওপর শুল্ক হিসাব করা হবে।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডা ৭০ শতাংশ অবচয় সুবিধায় রাজি না হয়ে ৯০ শতাংশ অবচয় সুবিধা দাবি করে। ফলে ওই উদ্যোগটিও থেমে যায়। এরপর ৩০ ডিসেম্বর এফবিসিসিআই ৭০ ও ৯০-এর মাঝামাঝি ৮০ শতাংশ অবচয় সুবিধা দিয়ে গাড়িগুলো খালাসের প্রস্তাব দেয়।