‘রায় ঘোষণার ৬ মাসের মধ্যে সই করতে হবে’

105

বিলেতবাংলা ডেস্ক,৩ এপ্রিল:  ব্যতিক্রর্মী (এক্সেপশনাল) মামলার রায় ছাড়া অন্য যেকোন মামলায় রায় ঘোষণার ছয় মাসের মধ্যে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের ওই রায়ে স্বাক্ষর করাসহ ৪০ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ এই নির্দেশনা দেন। ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জামিন জালিয়াতির অভিযোগে হাইকোর্টের সাবেক অতিরিক্ত বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানের অপসারণের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশ বহাল রেখে দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই পর্যবেক্ষণসহ এই নির্দেশনা দিয়েছেন আপিল বিভাগ।

গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১০৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের আচারণবিধি সংক্রান্ত বিষয়ে ৪০টি নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রায় বা আদেশ প্রদানে বিলম্ব কোনো অবস্থাতই গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যতিক্রমী মামলা ব্যতীত কোনো মামলায় রায় ঘোষণার ছয় মাস পর রায়ে স্বাক্ষর করা যাবে না। বিচারপতিগণ যতদূর সম্ভব সভা-সমিতি, বিবাহ ও অন্যান্য সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে যোগদান হতে বিরত থাকার চেষ্টা করবেন এবং যে সকল সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান করলে তাহাদের সঙ্গে মামলায় জড়িত পক্ষগণ তথা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ হতে পারে, এরূপ আচার অনুষ্ঠানে তিনি যোগদান করা হতে অবশ্যই বিরত থাকবেন।

এতে আরও বলা হয়, বিচারপতিকে অন্যান্য সাধারণ ব্যক্তি হতে স্বতন্ত্রভাবে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে সচেষ্ট হওয়া উচিত। এছাড়া বিচারপতিগণ কখনও কোনো অবস্থাতেই মামলার কোনো পক্ষ, আইনজীবী ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির নিকট হতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো উপহার বা উপঢৌকন গ্রহণ করবেন না বা অন্য কোনো সাহায্য নিজের বা পরিবারবর্গের কাহারও জন্য গ্রহণ করবেন না।

বিচারপতির রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রসঙ্গে নির্দেশনায় বলা হয়, বিচারপতিগণ সকল দল ও মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে থাকবেন এবং কখনও দলগত কারণে প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য প্রভাবিত হবেন না। কোনো ব্যক্তি বিচারপতিকে প্রভাবিত করতে পারেন বা সুপারিশ করতে পারেন, এমন কোনো ধারণা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ দেওয়া বিচারপতিগণের উচিত হবে না। প্রত্যেক বিচারপতিকে স্মরণ রাখতে হবে, বিচারালয় একটি পবিত্র স্থান। আদালতে ধৈর্যের সঙ্গে ভাবগম্ভীর পরিবেশ রক্ষা করে মামলার শুনানিকার্য পরিচালনা করতে হবে। বিচারপতিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে আদালতের কোনো স্থানে আইন ও নীতিবিরোধী বা আদালতের মর্যাদাহানিকর কোনো কার্যকলাপ সংগঠিত না হতে পারে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, বিচরপিতগণ জনসমক্ষে রাজনৈতিক দলসমূহের ঊর্ধ্বে থাকবেন। তাহাদের কথাবার্তা বা আচার আচরণ যেন কোনো দল বা মতাদর্শের পক্ষে বা বিপক্ষে না যায়। বিচারপতিরা কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা প্রদান করবেন না বা রাজনৈতিক দল বা রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রতিষ্ঠানের সভায়, প্রচারণায় বা কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবেন না। রাজনীতি সম্পর্কিত বা বিতর্কিত কোনো বিষয়ের ওপর গণমাধ্যমে কিছু বলবেন না বা লিখবেন না।

মামলার আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের আচরণ বিধিমালা একটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। বিচারপতি শাহিদুর রহমানের মামলায় আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণে আরও কিছু আচরণবিধি যুক্ত করেছেন।’

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০৩ সালের এপ্রিলে হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান সৈয়দ শাহিদুর রহমান। ওই বছরই নাসিম সুলতানা কণা নামের এক নারী ঘুষের বিনিময়ে জামিন করানোর একটি অভিযোগ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির তখনকার সভাপতি রোকন উদ্দিন মাহমুদের কাছে করেন। ২০০৩ সালের ১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ আইনজীবীদের এক সমাবেশে বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন।

এ বিষয়ে তদন্তের জন্য রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে নির্দেশ দেন। এরপর ২০০৩ সালের ৬ ডিসেম্বর সাবেক প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের জুডিশিয়াল কাউন্সিল তার যাবতীয় কার্যক্রমকে ‘প্রকাশযোগ্য নয়’ বলে ঘোষণা করেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানকে অপসারণ করতে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করেন। ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমদের আদেশ অনুসারে বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানকে অপসারণের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

এই আদেশের বিরুদ্ধে বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমান হাইকোর্টে রিট করলে ২০০৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট তার অপসারণের আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে পরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। এরপর ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণসহ বিচারপতি শাহিদুর রহমানকে অপসারণের প্র্রজ্ঞাপন বহাল রেখে রায় দেন। সম্প্রতি আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণসহ পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করলে তা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি অবসরের পর রায়ে স্বাক্ষর করা নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। গত ১৮ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ওই পদে তার নিয়োগের বর্ষপূর্তিতে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে বাণী দেন। বাণীতে তিনি অবসরের পর রায়ে স্বাক্ষর করা সংবিধান পরিপন্থি বলে উল্লেখ করেন। এ নিয়ে তখন বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরইমধ্যে বিচারপতিদের আচরণ বিধিমালার বিষয়ে পর্যবেক্ষণসহ রায় প্রকাশ করা হলো।