তৃতীয় বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ-৩ : মাহমুদ এ রউফ

145

 

বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনীতিক,কমিউনিটি নেতা মাহমুদ এ রউফ দেশে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিতে যুক্তছিলেন। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের  সক্রিয়  কর্মী ও ছাত্রনেতা। সিলেটের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মদনমোহন  কলেজের শিক্ষার্থী  ছিলেন ষাটের দশকের গোড়ার দিকে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে লন্ডনে আসেন ষাটের দশকের  শেষার্ধে। জড়িয়ে পড়েন বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিলেত হয়ে ওঠে তৃতীয় রণক্ষেত্র। মাহমুদ এ রউফ বিলেতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সংঘটিত আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন প্রথম সারির নেতা। তাঁর  লেখনিতে উঠে আসছে  ‘তৃতীয় বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ‘।

বিলেতবাংলা২৪.কম ধারাবাহিক প্রকাশ করছে বিলেতে বাঙালির প্রত্যয়দীপ্ত এই আগুনঝরা দিনের ইতিহাস। প্রতি সপ্তাহে  থাকছে ‘তৃতীয়বাংলায়  মুক্তিযুদ্ধ ‘।-নির্বাহী সম্পাদক।

 

. . . . . .

৩ কিস্তি:

 

১৯৭০সালের ৭ ডিসেম্বর তখনকার পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে যখন আওয়ামীলীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তখন গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতার নীতি অনুযায়ী আওয়ামী লীগই কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করবে। সর্বমোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ পায় ১৬৭ আসন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর দল পিপি পায় মাত্র ৮১টি। কিন্তু দেখা গেল, ভুট্টো সেটা মানতে রাজী নন। তখনকার সামরিক সরকার ভুট্টোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। বুঝতে দেরি হলো না,তারা পরোক্ষভাবে আওয়ামীলীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি নয়।  ফলে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের অবতারণা শুরু হতে থাকে। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেও তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত বা মুলতবি করা হলো। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পূর্ববাংলার জনগণ ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হলো। কারণ আন্দোলন ব্যতীত এই নিলর্জ্জ অবিচারের প্রকৃত জবাব দেওয়ার আর কোনো পথ খোলা ছিলো না।

দেশের জনগণের সাথে সহমর্মী হয়ে ব্রিটেনের সচেতন বাঙালিরাও দেশবাসীকে অনুসরণ করে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে আন্দোলন হঠাত করে সৃষ্টি হয়নি। অনেকদিন থেকেই বিশেষ সতর্কতার সাথে প্রবাসীরা দেশের ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ্য করছিলো। সব সময় প্রত্যেকটা ঘটনাকে খুব মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষন করা হচ্ছিলো। এই ধরনের একটা কিছু হবে তার জন্যে প্রস্তুতিও  নেয়া হচ্ছিলো। যার ফলশ্রুতিতে তখনকার পকিস্তাানি শাসক গোষ্ঠীকে হুঁশিয়ার করে দেয়ার জন্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রর্দশন করে হাই কমিশনারের মাধ্যমে সরকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। বিক্ষোভকারীরা জোর গলায় আওয়াজ তুলেন- তোমার দেশ আমার দেশÑবাংলাদেশ  বাংলাদেশ। যদিও তখন স্বাধীনতা ঘোষণা হয়নি।

২ মার্চ যখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল এহিয়া খান ঘোষণা দেয় যে আগামীকাল ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের  অধিবেশন বসবে না তখন জানা গেল এর প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী ময়দানে জনসভা আহবান করেছেন। সেখানে জাতির ভবিষ্যত করণীয় সম্পর্কে তিনি ঘোষণা দেবেন। দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও লন্ডনে মনে করলাম হয়তো এদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা হবে। আশা ও উতসাহ নিয়ে লন্ডনের ছাত্রজনতা হাইড পার্ক কর্ণারে জমায়েত হলো যাতে এক সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হয়। অধীর অপেক্ষার পর সংগ্রামের ডাক এলো। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম-জয় বাংলা-এই অমোঘ ও ঐতিহাসিক স্বাধীনতার লড়াইয়ের ঘোষণা ও  সিদ্ধান্ত জেনেই সেদিনের মতো ছাত্রজনতা মিছিল করে বাড়ি ফিরে। চলবে