তনু হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল দেশ

109

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ , বুধবার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘণ্টা বন্ধ রাখার কর্মসূচি গণজাগরণ মঞ্চের

দীপন নন্দী, কুমিল্লা থেকে

২৭ মার্চ:কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর খুনিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে সারাদেশ। শুধু তনুর জন্মভূমি কুমিল্লায় নয়; বিক্ষোভ হয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। দেশের বিভিন্ন বিদ্যায়তনে নানা কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে গতকালও শিক্ষার্থীরা নৃশংস ও কাপুরুষোচিত এ ঘটনার নিন্দা আর প্রতিবাদ জানান। দিন যত পার হচ্ছে তনুর খুনিদের বিচার দাবিতে ততই সোচ্চার হচ্ছে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। আন্দোলনকারী বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা গতকাল রোববার দুপুর ১২টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী বিশ্বরোড এলাকা অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। শহরে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। অবরোধে মহাসড়কের দু’পাশে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।

পরে কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য হাজি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ঘটনাস্থলে পেঁৗছে এক সপ্তাহের মধ্যে দোষীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দিলে দুপুর ২টার দিকে অবরোধ উঠিয়ে নেওয়া হয়। গতকাল সকালে ঢাকা থেকে রোডমার্চ বিকেলে কুমিল্লায় পেঁৗছে কান্দিরপাড়ে আন্দোলনরতদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের পর সমাবেশ করে গণজাগরণ মঞ্চ। এ সময় গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে বুধবার সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক ঘণ্টা বন্ধ রাখার ডাক দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে সড়ক অবরোধ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিরাও তনুর খুনিদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।

হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পার হলেও খুনিরা শনাক্ত না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকালও বলেছেন, শিগগিরই তনু হত্যার মূল রহস্য উদ্ঘাটন হবে। এর আগেও অনেক বড় বড় ঘটনার ক্লু শনাক্ত হয়েছে। কুমিল্লার পুলিশ সুপার শাহ মো. আবিদ হোসেন বলেন, জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় নিজের বাসার কাছে খুন হন নাট্যকর্মী তনু। হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তনুর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কর্মচারী ইয়ার হোসেন একটি মামলা করলেও কোনো খুনিকে শনাক্ত কিংবা গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এখন মামলাটি তদন্ত করছে কুমিল্লা জেলা ডিবি পুলিশ।

প্রতিবাদের নাম ‘তনু’:    পোস্টার, ব্যানার- সব জায়গাতেই সোহাগী জাহান তনুর ছবি। শান্ত, সৌম্য মুখাবয়ব এখন প্রতিবাদের প্রতীক। তার হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে উত্তাল তার জন্মভূমি কুমিল্লা। উত্তাল সারাদেশ।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী বিশ্বরোড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল, টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ এবং যান চলাচল বন্ধ করে দেয় কুমিল্লার বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ প্রশাসন এক সপ্তাহের মধ্যে খুনিদের শনাক্ত করার আশ্বাস দেন। এরপর ২টার দিকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। গতকাল দিনভর কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পুরো শহরে যেন প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে রয়েছে। চায়ের আড্ডায় কিংবা ছোটখাটো জটলায় সাধারণ মানুষের আলোচনার বিষয় শুধুই তনু। স্কুলে যাওয়া ছোট্ট মিম কিংবা অশীতিপর গফুর মিয়া- প্রত্যেকের একটাই কথা- বিচার চাই, তনু হত্যার বিচার চাই!

কুমিল্লা সেনানিবাসের সামনে নিশ্চিন্তপুরে কথা হয় স্থানীয় ব্যবসায়ী সামাদ মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ক্যান্টনমেন্টে অনেক বেশি নিরাপত্তা থাকে। সেখানে চাইলেই আমরা ঢুকতে পারি না। কিন্তু সেখানেই একটা ফুলের মতো মেয়ে তনুকে ধর্ষণ ও খুন করা হলো। এ ধরনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এবারই প্রথমবারে মতো এমন ঘটনা ঘটল। ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে আর কখনও এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। তার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ূয়া মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি ক্যান্টনমেন্টে থাকি। এখানে চাইলেই সহজে প্রবেশ করা সম্ভব হয় না। এক গেট থেকে আরেক গেটে যেতেও চেক করা হয়। সেখানে এ ধরনের কাজ মেনে নেওয়া কঠিন। আমি এখনও মানতে পারছি না।’

সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একঘণ্টা বন্ধ রাখার ঘোষণা:    তনুর ধর্ষক ও খুনিদের গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আগামী বুধবার সারাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একঘণ্টা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। ওই দিন দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত ক্লাস, পরীক্ষা ও সব ধরনের দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়। গতকাল রোববার ঢাকা থেকে কুমিল্লা রোডমার্চ শেষে জেলার কান্দিরপাড়ে আন্দোলনরতদের সঙ্গে সংহতি সমাবেশে এ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেন মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।

কর্মসূচি ঘোষণা করে ইমরান বলেন, ‘বুধবার সারাদেশের সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনে তনু হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের অনুরোধ করছি। খুনিদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাব না।’ সমাবেশ থেকে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের শাস্তি ফাঁসি থেকে যাবজ্জীবন করার যে আইন হয়েছে, তা ফাঁসিতে সংশোধন, যৌন নিপীড়নবিরোধী আইন কার্যকর করারও দাবি জানান ইমরান।

ইমরান আরও বলেন, সেনাবাহিনীর হাতে রক্তের দাগ আমরা কোনোভাবেই দেখতে চাই না। আমরা চাই না আমাদের গৌরবের সেনাবাহিনী বিশ্বের কাছে কোনোভাবে হেয়প্রতিপন্ন হোক। তনুর মামলা তদন্তে সিভিল প্রশাসনকে সেনাবাহিনী শতভাগ সহায়তা করবে, আমরা তাই কামনা করছি। আমাদের আন্দোলন কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। এই আন্দোলন ধর্ষকের বিরুদ্ধে।

সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ইমরান হাবীব রুমন, ভাস্কর রাসা, মঞ্চের সংগঠক জীবনানন্দ জয়ন্ত প্রমুখ। কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের এ সমাবেশে নানা শ্রেণী-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেয়। সমাবেশ নির্বিঘ্ন করতে কান্দিরপাড় পূবালী চত্বর সংযোগস্থল লাকসাম রোড, চকবাজার, পুলিশ লাইন ও ভিক্টোরিয়া কলেজ ডিগ্রি শাখা রোডে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। এ ছাড়া সমাবেশে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুরো নগরীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি জোরদার করা হয়।

এর আগে গতকাল সকাল ১০টায় শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে গণজাগরণ মঞ্চের রোডমার্চ। এর শুরুতে ইমরান এইচ সরকার বলেন, সারাদেশ আজ ?তনু হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। এই হত্যার বিচার দাবিতে কুমিল্লার সাধারণ মানুষের যে আন্দোলন তাকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করা এবং আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। হত্যা-ধর্ষণের মাধ্যমে দেশে যে পরিস্থিতির তৈরি করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের আজকের রোডমার্চ। খুন করেও খুনিরা দিনের আলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর বিপরীতে জনগণ কিছুই করতে পারছে না। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনগণেরও দায়িত্ব আছে, সে বার্তা আমরা মানুষের কাছে নিয়ে যাব।

ছয়টি বাসে করে জাগরণ মঞ্চ এ রোডমার্চ যাত্রা করে। যার সামনে পিকআপ ভ্যানে থাকা মঞ্চের কর্মীরা সারা পথ স্লোগান দিতে থাকেন। তারা বলেন, ‘ক্যান্টনমেন্টের ভয় দেখিয়ে, দমিয়ে রাখা যাবে না’, ‘ক্যান্টনমেন্টে বোন মরে, সেনারা কী করে’, ‘আমরা তনুর বোন-ভাই, তনু হত্যার বিচার চাই’। এ ছাড়াও ছিল কর্মীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। রোডমার্চ থেকে প্রথমে চিটাগাং রোডর শিমরাইলে পথসভা করা হয়। এরপর কাঁচপুর, গৌরীপুর, চান্দিনার মাধাইয়া, চান্দিনা বাজার, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের সামনে, নিমসার বাজার ও আলেখার চর মহাসড়কে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে বিকেল সোয়া ৩টায় কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ১০০ গজ দূরে ইস্টার্ন ট্রেডিং করপোরেশন ফিলিং স্টেশনের সামনে সমাবেশ হয়। তনু হত্যার বিচার দাবির সমাবেশ হলেও ক্যান্টনমেন্টের সামনে এটাই প্রথম সমাবেশ বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড জামে মসজিদের সামনে পেঁৗছলে রোডমার্চে অংশগ্রহণকারীরা নামলে সেখানে সাময়িক উত্তেজনা দেখা দেয়। তখন পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ইমরান এইচ সরকারসহ নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ফটকের বাইরে চলে আসেন। আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার সোলায়মান মিয়া সমকালকে বলেন, ক্যান্টনমেন্টের সামনের এ এলাকায় গাড়ির প্রচুর চাপ ছিল, সে জন্য তাদের সামনের দিকে সমাবেশ করতে বলা হয়েছে।

এখনও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি:  কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের মেধাবী ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের সাত দিন পার হলেও এখনও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। এতে হত্যার কারণ নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। অনেক প্রশ্নের উত্তরও মিলছে না ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। এদিকে গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তনুর বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন কুমিল্লা-৬ আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। এ সময় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার উপস্থিত ছিলেন।   দৈনিক সমকাল