হ্যাকার নয়, ব্যাংকের কর্মকর্তারাই চুরি করেছে অর্থ : ১ কর্মকর্তা চিহ্নিত, ১১টি কম্পিউটার ও ল্যাপটপ জব্দ ॥

133

ঢাকা,১৫ র্মাচ : বিপ্লব বিশ্বাস ও সুজন কৈরী : শুধু ৮০০ কোটি টাকা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৯৫১ মিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ইতোমধ্যে ফিলিপিনসের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টিম সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজ করেছে। ফেরত পাওয়া গেছে ৬৮ হাজার ডলার।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনাটি হ্যাকিং নয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুযায়ীই ফেডারেল রিজার্ভ থেকে টাকা স্থানান্তর করার জন্য অ্যাডভাইস পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটারের মাধ্যমেই।
তদন্তকারী দল বলছে, এ কাজে ব্যবহƒত ৪টি ইউজার আইডি শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজনকে শনাক্ত করা গেছে। শনাক্ত হওয়া ব্যক্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপানায় ব্যবহƒত ডিলিং রুমের কর্মকর্তা বলে নিশ্চিত হয়েছেন তারা।
অর্থ আত্মসাতের ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ আরও দুটি দল। আইটির বিষয়টি দেখছে রাকেশ আস্থানা ও সদ্য নিয়োগ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ফায়ার-আই নামক প্রতিষ্ঠান এবং র‌্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করেছে গত রোববার থেকে। এর বাইরেও ৩টি গোয়েন্দাসংস্থা ও পুলিশ ছায়া তদন্ত করছে।
তদন্ত দলের এক কর্মকর্তা বলেছেন, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ। এতে দেশি-বিদেশি চক্রের লোকজন জড়িত রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এ কাজটি করা হয়েছে। দেশি চক্রে প্রভাবশালী মহল জড়িত। তাদের নাম প্রকাশ করা সহজ কাজ নয়। জীবনের ঝুঁকি আছে। আমরা প্রায় নিশ্চিত কারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত। এখন কিছু তথ্যের ক্রস চেক করা বাকি আছে। তারপর আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারব এ চক্রের সদস্যদের ব্যাপারে। তিনটি তদন্ত দলই নিজেদের পাওয়া তথ্য নিয়ে বৈঠক করেছে। একে অন্যকে তাদের ফাইন্ডিংশ (প্রাপ্ত তথ্য) দিয়েছে। ক্রস চেকের মাধ্যমে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে পাওয়া তথ্যগুলো। তবে কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও পায়নি তদন্তকারী দলের সদস্যরা। তারা বলছে, এটা ক্রস বর্ডার (দেশের সীমান্তের বাইরের) অপরাধ হওয়ায় তথ্য নিশ্চিত হতে আরও কিছু সময় লাগবে। তথ্য উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১টি কম্পিউটার ও ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরের কাজে ব্যবহƒত কম্পিউটারের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়েছে। আরও কিছু তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করছে তদন্তকারী দল।
অর্থ চুরির এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের ও ফরেক্স রিজার্ভের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এতে একাধিক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে বেশকিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার কারণে সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেই তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এদিকে ঘটনাটি না জানানোতে ক্ষুদ্ধ হয়েছেন অর্থমন্ত্রী, সচিবসহ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা। এছাড়া দীর্ঘ এক মাস পেরিয়ে গেলেও এত বড় ঘটনায় গঠন করা হয়নি কোনো তদন্ত কমিটি। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম বলেছেন, শীঘ্রই চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার মার্কিন ডলার আÍসাত করে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নিতে পেরেছে এ চক্র। যা বাংলাদেশি টাকায় বাকি ৮৫ কোটি ডলার সরাতে পারেনি ফেডারেল ব্যাংকের সতর্কতার জন্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সচিব এম আসলাম আলম সাংবাদিকদের বলেন, ১০১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৯.৩ মিলিয়ন ডলার শ্রীলংকা থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফিলিপাইন থেকে ৬৮ হাজার ডলার (৫৪ লাখ টাকা) ফেরত আনা গেছে। বাকি টাকা উদ্ধারে ফিলিপাইনের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।
অপর একটি সূত্র বলেছে, বাংলাদেশি এ চক্রের সদস্য কারা তার তদন্তে নেমেছে সরকারের বেশ কয়েকটি সংস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও তদন্ত করছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক আইটি প্রধান রাকেশ আস্তানার তদন্তেও বাংলাদেশের জড়িতদের তথ্য উঠে আসতে পারে। তবে এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে দুই সপ্তাহ। সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছে র‌্যাবের তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও। অন্য আরও দুই শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাও শুরু করেছে তদন্ত। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাসহ কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের রাখা হয়েছে কঠোর নজরদারিতে।
অপরদিকে, হ্যাকারদের কাছ থেকে উদ্ধার করা টাকার একটি অংশ আবারও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে জমা করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় পাচার করা হ্যাকারদের ২০ মিলিয়ন ডলার সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জব্দ করে। পরে বাংলাদেশকে তা ফেরত দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যার ১৯ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলার ফেরত পায়। যা পুনরায় নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যাকিং সম্পন্ন করার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই জেনেছে কীভাবে অর্থ স্থানান্তরের অনুরোধ পাঠানো ও অনুরোধের পরের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এসব কাজ ঢাকা থেকেই বাংলাদেশিদের পক্ষেই করা সম্ভব। আইটি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছে, কোনো ম্যালওয়ারের বা কম্পিউটার ভাইরাস পাঠিয়ে যদি হ্যাকিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হতো তাহলে কোনো নির্দিষ্ট সময় পর তা বন্ধ হয়ে যেত না। এখনও অটোমেটিকভাবেই অর্থ স্থানান্তরের অনুরোধ পাঠানো হতে থাকত। কিন্তু তা যেহেতু তা হচ্ছে না, সুতরাং অভ্যন্তরীণ কোনো না কোনো ব্যক্তি এর মধ্যে জড়িত।
তাদের মতে, সুইফট কোডে কোনো ইন্টারনেট কানেকশনের প্রয়োজন পড়ে না। তাই এটাতে ম্যালওয়ার বা ভাইরাস পাঠিয়ে হ্যাক করাও অসম্ভব। সুইফট কোড ইন্ট্রানেটের (আভ্যন্তরীণ) মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যা ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ব্যাংকের সার্ভার রুমের কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত হতে পারেন অথবা তাদের পরিচিত যে কোনো ব্যক্তি হতে পারেন। যেই করুক না কেন, সাভার রুমের কোনো কম্পিটারে ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ (পেন ড্রাইভ বা মেমোরি কার্ড) লাগিয়ে সার্ভার রুমের বাইরে থেকে অর্থ চুরি করা হয়েছে। যেটাকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন বটনেট।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, হ্যাকিংয়ের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তিনটি আইডি ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ আইডিগুলোর মাধ্যমে ফিলিপাইনের হ্যাকাররা টাকা পেমেন্টের অর্ডার দেয়। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক বাংলাদেশের কাছে পেমেন্টের বিষয়ে জানতে মেইল করে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি। উত্তর না দেওয়ায় একদিন পর তারা টাকা পেমেন্ট দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের মাধ্যমে ওইসব আইডি ব্যবহƒত হয়। যেসব কর্মকর্তা ওইসব আইডি ব্যবহার করতেন তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেমেন্টের বিষয়ে জানতে মেইল আসার কথাও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কিছু জানানো হয়নি। শ্রীলঙ্কা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সে দেশে পাচার হওয়া অর্থ জব্দ করে ও বাংলাদেশ ব্যাংককে জানায় তারপরই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই বিভাগের একাধিক কর্মকর্তাই এখন নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও যাবতীয় সম্পদেরও খোঁজ নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিভাগের তিন কর্মকর্তা গত এক বছরে ইউরোপ ও আফ্রিকাসহ একাধিক দেশে কয়েকবার সফর করেছেন। তাদের সফর নিয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার তদন্ত, করণীয় ও অগ্রগতি নিয়ে গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের চার ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, আবু হেনা মো. রাজী হাসান, এস কে সুর চৌধুরী ও নাজনীন সুলতানার সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলম। বৈঠকে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রাজী হাসান বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ডিউ ভিলিজেন্সের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে পেমেন্টের বিষয়ে যেসব অ্যাডভাইস গেছে, তার কিছু অ্যাডভাইসের বিষয়ে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও জানতে চেয়েছিল। যে পাঁচটি অ্যাডভাইসের বিপরীতে পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে তার বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো অ্যাডভাইস দেওয়া হয়নি জানিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের কাছে বলা হলে বাকি অ্যাডভাইসগুলো তারা আটকে দেয়। যার জন্য বেশির ভাগ অ্যাডভাইসের পেমেন্ট স্টপ করা হয়। এখন আমরা এ বিষয়গুলো নিয়েই তদন্ত করছি। তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে। তিনি আরও বলেন, হ্যাকিংয়ে ঘটনাটি কোন পর্যায়ে হয়েছে বিষয়টি তদন্তাধীন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হয়েছে না বাইরে থেকে হয়েছে তা তদন্তের বিষয়। আমরা এফবিআইয়ের সম্পৃক্ততা আশা করছি। কারণ এফবিআইয়ের সাইবারবিষয়ক একটি শক্তিশালী ইউনিট আছে। বিশ্বব্যাপী কোথায় কী হচ্ছে তা তদন্ত করার ক্যাপাসিটি তাদের আছে। আমাদের বোর্ডসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা যথাযথ প্রক্রিয়াতে এগোচ্ছি। সম্পাদনা : বিশ্বজিৎ দত্ত, আমাদের সময়.কম : ১৫/০৩/২০১৬