আইসিসির আচরণ সন্দেহজনক! বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নানা প্রশ্ন

105

 

সারা বছরই ক্রিকেট হচ্ছে। কেউ হাত বাঁকা করে, কেউ হাত সোজা করে বল করছেন। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল-আইসিসি’র চোখে পড়ছে না। সারা বছর তারা যেন ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়। একটা বিশ্বকাপ সামনে এলেই তাদের সেই ঘুম ভাঙে। আর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় বোলারকে ‘সন্দেহজনক’ বলে ঘোষণা করেন তাদের আম্পায়াররা। এতে ওই বোলার সত্যি সত্যি অবৈধ বোলিং করুন আর নাই করুন; বিশ্বকাপটিতে তার পারফরম্যান্স পড়ে যায় সংশয়ের মুখে।

 

এবার এই ধারাবাহিকতার শিকার হলেন বাংলাদেশের তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানি। আইসিসির এই আচরণকে ‘সন্দেহজনক’ না বলাটাই বিস্ময়কর। যদিও মুখ ফুটে দায়িত্বশীল কেউ এতদিন কথাটা বলছিলেন না। শাস্তির ভয় না পেয়ে, তথাকথিত নিয়মের ধার না ধেরে এবার বাংলাদেশের কোচ হাতুরুসিংহেই কথাটা বলে ফেললেন, ‘তাদের যদি আমার বোলারদের নিয়ে সন্দেহ থাকে, আমারও তাদের (আইসিসির) অ্যাকশন নিয়ে সন্দেহ আছে।’

 

বোলিং অ্যাকশন নিয়ে আইসিসির কর্মকাণ্ড ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে সন্দেহ ও আপত্তি বছর খানেক ধরেই চলছে। এই সন্দেহটা প্রবল বিতর্ক হিসাবে সামনে নিয়ে এসেছিল ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া (ইউডব্লিউএ)। বোলিং অ্যাকশন বিষয়ে একসময় আইসিসির প্রধান ভরসা ছিল ইউডব্লিউএ। তবে বছর খানেক ধরে তারা বারবার বলার চেষ্টা করছে, আইসিসির বর্তমান বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষা অত্যন্ত দুর্বল, ত্রুটিপূর্ণ ও আপত্তিকর।

 

আইসিসির কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স। গত বছর দেড়েক ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন এক পরাশক্তি হয়ে উঠেছে। ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে সিরিজ হারানো বা এশিয়া কাপের ফাইনালে চলে আসার মতো ঘটনায় বদলে গেছে খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষা। সেই সাথে খেলোয়াড়দের এই পারফরম্যান্সেই বদলে যাচ্ছে বাণিজ্যেরও অনেক সমীকরণ। বাংলাদেশ শুধু ক্রিকেটে নয়, নিজেদের শক্তিতে এক ঈর্ষণীয় ক্রিকেট বাজারে পরিণত হয়েছে।

 

আইসিসির বিরুদ্ধে এই সন্দেহ একেবারে ঝড়ের আকার ধারণ করেছিল ২০১৫ আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে আগে। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে পাকিস্তানের সাঈদ আজমল, বাংলাদেশের সোহাগ গাজী, শ্রীলঙ্কার সচিত্র সেনানায়েকে, নিউজিল্যান্ডের কেন উইলিয়ামসনের নিষিদ্ধ হওয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের সুনীল নারিন ও পাকিস্তানের মোহাম্মদ হাফিজের বোলিং অ্যাকশন সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হওয়ায় শুরু হয় ঝড়। অনেকের অভিযোগ, কোনো একটা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এটা করা হয়েছে।

 

প্রথমত এই বোলাররা দীর্ঘদিন ধরে বল করলেও এমন সব সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে কোনো না কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের আগে আগে; যাতে ওই বোলারের সংশ্লিষ্ট বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা কমে যায়। মজার ব্যাপার হলো, যেসব বোলারকে সন্দেহ করা হচ্ছে, তারা অনেকেই বৈধ বলে পরে স্বীকৃতিও পাচ্ছেন; কিন্তু বিশ্বকাপ মিস করছেন। এ ছাড়া আইসিসির ‘বিগ থ্রি’ নামে পরিচিত তিনটি দেশ—ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের কোনো উল্লেখযোগ্য বোলার কখনোই পরীক্ষার জন্য সন্দেহের তালিকায় আসছেন না। ফলে মাঠের বাইরে খেলা হচ্ছে, এমন সন্দেহও তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি বোলিং অ্যাকশন নিয়ে আইসিসির ‘অবৈজ্ঞানিক’ অবস্থান নিয়েও আছে বিপুল অভিযোগ।

 

আইসিসির বিপক্ষে অভিযোগকে আরো উস্কে দেয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২০ বছর ধরে আইসিসির বোলিং অ্যাকশন বিষয়ক ব্যাপারাদি দেখভাল করা প্রতিষ্ঠান ইউডব্লিউএ। এই প্রতিষ্ঠানের একাধিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, আইসিসি বর্তমানে যে পদ্ধতিতে ও যে রকম অস্বচ্ছতার সঙ্গে বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পরীক্ষাগুলো করছে তা হাস্যকর, সন্দেহজনক ও ত্রুটিপূর্ণ! এ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরেই আইসিসির টানাপড়েন চলছিল। তারই চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত বছরের মার্চে। যখন ইউডব্লিউএ দাবি করে যে তারা আইসিসির পাশ থেকে সরে যাচ্ছে। এই টানাপড়েনের এক পর্যায়ে পরস্পরের বিপক্ষে আইনজীবী নিয়োগের মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছিল।

 

এরপর থেকে আইসিসি বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষার দায়িত্ব দেয় কার্ডিফ, ব্রিসবেন ও চেন্নাইয়ের তিনটি ল্যাবরেটরিকে। ইউডব্লিউএ দাবি করেছে, এই তিনটি পরীক্ষাগারে তাদের পুরানো পদ্ধতি নিয়ে যেভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাতে কিছুতেই সঠিক ফলাফল পাওয়া সম্ভব না। ইউডব্লিউএ মূলত চারটি পয়েন্টে আইসিসির বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক সমালোচনা করেছে—১. বল ছাড়ার মুহূর্তটি বর্তমানে ভুলভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে; যার ফলে স্পিনারদের ফলাফল আমুল বদলে যাচ্ছে, ২. অ্যাকশন পরীক্ষার মার্কার ভুল জায়গায় লাগানো হচ্ছে, ৩. কনুইয়ের বাঁকা হওয়া ও সোজা হওয়া দুটোরই ভূমিকা বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না এবং ৪. ত্রিমাত্রিকের বদলে এখনও দ্বিমাত্রিক ফুটেজ ও ছবিই ব্যবহার করা হচ্ছে।

 

পাশাপাশি ইউডব্লিউএ-এর গবেষকরা দাবি করছেন, নতুন এই পরীক্ষাগারগুলোতে অনভিজ্ঞ ও স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী দ্বারা যেসব পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে, তাতে ভুল থেকে যাওয়ার আশঙ্কাই প্রবল। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় ও বোর্ডকে যে অল্প সংখ্যক ফুটেজ ও ছবি সরবরাহ করা হচ্ছে, তাতে কিছুতেই স্বচ্ছতা প্রকাশ পাচ্ছে না বলে গবেষকদের ধারণা।

 

ইউডব্লিউএ’র সহযোগী অধ্যাপিকা জ্যাকুলিন অ্যালডারসন তখনই বলেছিলেন, ‘অবশ্যই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ত্রিমাত্রিক ছবি ছাড়া স্পিনারদের বল ছাড়ার মুহূর্ত নির্ধারণ করা সম্ভব না, একজন স্পিনার হাতের যে কোনো জায়গা থেকে বল ছাড়তে পারে, আঙুল দিয়েই ছাড়তে হবে এমন কোনো কথা নেই। ফলে কোনোভাবেই অটোমেটেড ট্র্যাকার দিয়ে যন্ত্রে বোঝা সম্ভব না যে কখন সে বল ছাড়লো।’ এই পয়েন্টে তিনি সাঈদ আজমলের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ‘২০০৯ সালে আমরা সাঈদ আজমলের যে টেস্ট করেছিলাম, সেখানে বল ছাড়ার মুহূর্তটা ১-২টা ফ্রেম পরে বা ০.০০৪ থেকে ০.০০৮ সেকেন্ড পরে হলেই তার অধিকাংশ ডেলিভারি অবৈধ হয়ে যেত।’ তারা মনে করছেন দ্বিমাত্রিক ছবি ও ফুটেজের ব্যবহার করে যে পরীক্ষা হচ্ছে, তা মাঠে বোলারকে চোখে দেখে রায় দেয়ার মতোই ব্যাপার। এ ছাড়া বর্তমান পদ্ধতিতে কনুই ভাঁজ করা ও সোজা করার সমন্বয়টাও ঠিকমতো বোঝা হচ্ছে না।

 

ইউডব্লিউএ-এর এই দাবির পর অবশ্য নিজেদের ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে আইসিসি দাবি করেছে, তারা কোনো বোলারকে আঞ্চলিকতার কারণে লক্ষ্যে পরিণত করছে না। একই সঙ্গে যে তিনটি পরীক্ষাগারে বর্তমানে পরীক্ষা চলছে তাদের যথেষ্ট যোগ্য বলে দাবি করেছে আইসিসি।