যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু

394

ঢাকা,১২ মার্চ, সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল, তাদের ব্যাপারে নতুনভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। সব জেলা প্রশাসক ও কারা কর্তৃপক্ষের কাছে এ ব্যাপারে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বিভিন্ন জেলার আওতাধীন এলাকায় পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ও কমান্ডারের নাম, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের স্থাপিত নির্যাতন কেন্দ্র, জেলা কারাগারে আটক যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের নামসহ বেশ কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তান উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। এবং একাত্তরে গণহত্যার দায় অস্বীকার করায় ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবি আবারও আলোচনায় আসে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান বলেন, পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সহযোগীদের ব্যাপারে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার ও তাদের সহযোগীরা যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগি্নসংযোগ করে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনেক কমান্ডার ও সদস্যকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে আটকে রাখা হয়।

সম্প্রতি পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সহযোগীদের তথ্য চেয়ে তদন্ত শাখার সমন্বয়ক আবদুল হান্নানের সই করা একটি চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি-প্রিজন) দপ্তরে ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে মানবতাবিরোধী ৮ ধরনের অপরাধী সম্পর্কে মোট ২৮ প্রকার তথ্য চাওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার হানাদার সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস্ বাহিনী দেশের সব এলাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে। এ ব্যাপারে ৮ ধরনের তথ্য দিয়ে বলা হয়_ এরা যুদ্ধাপরাধ, হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তর করা, লুণ্ঠন, অগি্নসংযোগ ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের আগে পর্যন্ত এসব অপরাধ সংঘটনকারীদের বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে তথ্যের প্রয়োজনীয়তার কথা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, চিঠি পাওয়ার পর ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। পুলিশ সুপার, বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এক্ষেত্রে অপরাধ সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করতে বলা হয়েছে। উদ্দশ্যমূলক কাউকে না জড়ানোর বিষয়টি বিশেষভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসকদের কাছে যে তথ্য চাওয়া হয়েছে : জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে একাত্তরে জেলার দখলদার সেনাবাহিনী ক্যাম্পের নাম, কমান্ডারের নাম, পদবি, ঠিকানা, স্থায়িত্বকাল, অধিক্ষেত্র, সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পে সেনা সদস্যদের আনুমানিক সংখ্যা ও অন্যান্য বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। কমান্ডার ছাড়া অন্যান্য সিনিয়র অফিসারের নাম, পদবি ও ঠিকানা চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সে সময় জেলা ভিত্তিক আনসার বা রাজাকারদের ক্যাম্পের নাম, স্থায়িত্বকাল, ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাডজুটেন্ট বা কমান্ডারের নাম, ঠিকানা ও বর্তমান অবস্থান (জীবিত অথবা মৃত), সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পের রাজাকারদের তালিকা এবং অধিক্ষেত্রসহ বিস্তারিত বিবরণ চাওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীর স্থাপিত নির্যাতন কেন্দ্রের তথ্য চেয়ে ওই চিঠিতে নির্যাতন কেন্দ্রের নাম, স্থায়িত্বকাল ও নির্যাতিত লোকের সংখ্যা সম্বন্ধে জানতে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই সময় জেলা কারাগারে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আটক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের নাম, ঠিকানা, কর্মস্থল ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে বলা হয়েছে।

আইজি প্রিজনের কাছে যে তথ্য চাওয়া হয়েছে : আইজি প্রিজনের কাছে লেখা চিঠিতে বলা হয়, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শেষে এবং ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তানি সেনা কমান্ডার বা অফিসার ও সদস্যদের অনেককেই গ্রেফতার করে জেলহাজতে আটক রাখা হয়েছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তের স্বার্থে ওই সময়ে আটকদের একটি তালিকা, জেলখানার নাম, মামলা নম্বর ও অন্যান্য তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে।